বৃহস্পতিবার, ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

“নবাবপুরে শতবর্ষের ট্রাস্টে লুটের ছায়া, অন্নের থালা ফাঁকা, সম্পদের হিসাব অদৃশ্য—কারা গিলছে জনহিতের ভাণ্ডার?

নিজস্ব প্রতিবেদক
ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৬ ৮:২৩ অপরাহ্ণ
Link Copied!

পুরান ঢাকার ব্যস্ততম বাণিজ্যকেন্দ্র নবাবপুর—যেখানে প্রতিদিন অর্থনীতি আর মানুষের জীবনচক্র ঘুরে চলে অবিরাম। সেই এলাকারই শতবর্ষী জনহিতকর প্রতিষ্ঠান মদন-মোহন অন্ন ছত্র ট্রাস্ট আজ নিজ অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে। ১৯২৪ সালে অনাথ ও অসহায়দের জন্য প্রতিষ্ঠিত এই ট্রাস্ট এখন কোটি টাকার লোপাটের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ। অভিযোগ উঠেছে—সেবার আড়ালে একটি সংঘবদ্ধ চক্র বছরের পর বছর ধরে ট্রাস্টের সম্পদ গিলে খাচ্ছে, আর দরিদ্র মানুষের থালায় কমছে ভাত।

সম্পদের পাহাড়, কিন্তু হিসাবের খোঁজ নেই-
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, এক সময় ট্রাস্টের অধীনে ছিল ১৯টি বাড়ি ও ৭/৮টি মার্কেট। এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র কয়েকটিতে। নবাবপুর সড়কের ১২২, ১৬৭, ১৯২, ১৯৩ ও ১৯৪ নম্বর হোল্ডিংয়ে রয়েছে পাঁচটি বহুতল মার্কেট ও আবাসিক ভবন। পাশাপাশি ইসলামপুর সড়কের ৫১/এ নম্বর হোল্ডিংয়ে ১০ তলা বাবুলী ইসলামপুর কমপ্লেক্স এবং ওয়াইজঘাট সড়কের ৩/২ নম্বর হোল্ডিংয়ে ১১ তলা বাবুলী স্টার সিটি—দুটি বড় বাণিজ্যিক-আবাসিক ভবন।
সূত্র বলছে, এসব সম্পদ থেকে মাসে অর্ধকোটি টাকার বেশি ভাড়া ওঠে; তবে বাস্তবে অঙ্কটি কোটি ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু সেই অর্থ ট্রাস্টের হিসাবে জমা না হয়ে ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাসে হারিয়ে যাচ্ছে—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।

নিয়ন্ত্রণে ‘অদৃশ্য’ বোর্ড, সামনে তিন মুখ-
অভিযোগের তীর মূলত তিনজনের দিকে—শিবুল, পরিমল ও বিশ্বজিৎ। পরিমল নামমাত্র ম্যানেজার হলেও অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত। এই সুযোগে সিইও বিশ্বজিৎ ও হিসাবরক্ষক শিবুল কার্যত ট্রাস্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন বলে অভিযোগ।
অন্যদিকে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য তপন পালও অসুস্থতায় নিষ্ক্রিয়। ফলে নিয়ম অনুযায়ী বার্ষিক অডিট রিপোর্ট উপস্থাপন না হওয়ায় আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।

গোপন আম-মোক্তারনামা ও ফ্ল্যাট বাণিজ্যের অভিযোগ উঠলেও দৃশ্যত কোন ব্যবস্থা নেই।
সরেজমিন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্তারা গোপনে বাবুলী ডেভলপার কোম্পানি লিমিটেড-কে ব্যাপক ক্ষমতাসম্পন্ন আম-মোক্তারনামা দিয়ে ভবন নির্মাণ ও ফ্লোর বিক্রির অধিকার দেন।
১১ তলা ভবনের ৪র্থ থেকে ১১তম তলা পর্যন্ত ৫৬টি ফ্ল্যাট এবং নিচতলা থেকে ৩য় তলা পর্যন্ত বাণিজ্যিক ফ্লোর বিক্রি করে প্রায় ৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একইভাবে ইসলামপুরের ১০ তলা ভবনের গোপন চুক্তিতে ৬০ কোটি টাকার মধ্যে ৩০ কোটি টাকা সংশ্লিষ্টদের পকেটে গেছে—এমন দাবি সূত্রের।
অভিযোগ আরও গুরুতর—নির্মাণ প্রতিষ্ঠান মাসে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে ভবনগুলোকে বছরের পর বছর “নির্মাণাধীন” দেখিয়ে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।

অনাথদের থালায় কমছে ভাত-
একসময় যেখানে প্রতিদিন শতাধিক অনাথ-অসহায় মানুষ ডাল-ভাত-ভাজি পেতেন, এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৪০–৫০ জনে। সম্প্রতি খাবার বিতরণে উপস্থিত থেকেও ৮২ জনের বেশি মানুষকে খাবার পেতে দেখা যায়নি।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—শতকোটি টাকার সম্পদ থাকা সত্ত্বেও উপকারভোগী কমে গেল কেন? অন্ন ছত্রে অন্নের অভাব তৈরি হলো কীভাবে?

দুদক তদন্ত ও প্রভাবের অভিযোগ-
অভিযোগ যায় দুর্নীতি দমন কমিশন-এ। তদন্তও শুরু হয়। তবে স্থানীয়দের দাবি, প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ ও কিছু ‘গৃহপালিত’ গণমাধ্যমকর্মীর তদবিরে তদন্ত থমকে যায়। বিশ্বজিৎ ও শিবুলের বিরুদ্ধে একাধিক পাসপোর্ট এবং ভারতে সম্পদ গড়ার অভিযোগও উঠেছে, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তা নিশ্চিত হয়নি।

বক্তব্য মেলেনি অভিযুক্তদের-
অভিযোগের বিষয়ে জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও শিবুল ও বিশ্বজিৎ ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের দাবি—“অন্নের নামে লুট বন্ধ হোক”
শতবর্ষী এই ট্রাস্টের অস্তিত্ব এখন প্রশ্নের মুখে। স্থানীয়দের জোর দাবি—দ্রুত নিরপেক্ষ অডিট, পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
অনাথ-অসহায়দের কণ্ঠে একটাই আবেদন—
“যারা অন্নের নামে সম্পদ লুটছে, তাদের বিচার চাই।”
এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়। নবাবপুরের মানুষ অপেক্ষায়—অন্ন ছত্র কি আবার তার মানবিক ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনবে, নাকি লুটপাটের অন্ধকারেই হারিয়ে যাবে শতবর্ষের ইতিহাস?

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
নগর-মহানগর সর্বশেষ