দেশের প্রাণিসম্পদ খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক করিডোরে এখন ঘুরপাক খাচ্ছে একের পর এক নিয়োগ বিতর্ক, কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ এবং প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ছায়া। আর এই বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছেন অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডাঃ মোঃ বয়জার রহমান।
৪৮৩ ভেটেরিনারি ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট: প্রশ্নের মুখে নিয়োগ প্রক্রিয়া
ফেব্রুয়ারি ২০২৬—৪৮৩টি ভেটেরিনারি ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট পদে নিয়োগ। প্রশাসনিক তদারকির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন ডাঃ বয়জার রহমান। অভিযোগ উঠেছে, নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলের প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি— যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় অসঙ্গতি,
মেধাতালিকা প্রণয়নে স্বচ্ছতার ঘাটতি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে পক্ষপাতিত্ব। অধিদপ্তরের ভেতরে বিষয়টি নিয়ে চাপা ক্ষোভ থাকলেও প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলতে চাইছেন না।
৬০০ নিয়োগে আর্থিক লেনদেনের ছায়া- এর আগেও প্রায় ৬০০ কর্মচারী নিয়োগকে ঘিরে ওঠে গুরুতর অভিযোগ। দাবি করা হয়, নিয়োগ বোর্ডের সদস্যদের মধ্যে আর্থিক সুবিধা বণ্টন হয়েছে। সম্মানী ভাতার নামে বিপুল অর্থ উত্তোলন এবং প্রভাব খাটিয়ে পছন্দের প্রার্থীদের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠে আসে।
যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এসব অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি, তবুও প্রশাসনিক মহলে এ নিয়ে নানা গুঞ্জন অব্যাহত রয়েছে।
২১ কোটি টাকার ভ্যাকসিন প্রকল্প: তদন্তে ধীরগতি
ক্ষুরা রোগ নির্মূল কর্মসূচির আওতায় ভ্যাকসিন ক্রয় প্রকল্পে প্রায় ২১ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগও আলোচনায় আসে। তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহে বিলম্বের কথা জানা গেছে। প্রশাসনিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
‘ডেইরি উন্নয়ন’ প্রকল্পে ১১৫ ড্রাইভার: ৩ থেকে ৫ লাখ টাকার দর?
‘প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন’ প্রকল্পের অধীনে ১১৫ জন ড্রাইভার নিয়োগ নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪
ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষা: ১২–২৬ এপ্রিল ২০২৫
চূড়ান্ত নিয়োগ: ৫ মে ২০২৫
পরীক্ষাগুলো অনুষ্ঠিত হয় সাভারে অবস্থিত বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট-এ।
নিয়োগ কমিটির সভাপতি ছিলেন ডাঃ বয়জার রহমান। অভিযোগ—মাথাপিছু ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। ১১৫ পদের বিপরীতে প্রায় ১০ কোটি টাকার বেশি লেনদেনের গুঞ্জন রয়েছে।
অভিযোগে যাদের নাম এসেছে— প্রশাসনিক কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক সরদার, রনজিৎ কুমার, অফিস সহায়ক আব্দুল কাদের।
এছাড়া ব্যবহারিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়েও অনেককে মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি উঠেছে। প্রায় ১৩০০ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩৫১ জনের নাম প্রাথমিকভাবে প্রকাশ এবং শেষ পর্যন্ত ১১৫ জনের চূড়ান্ত নিয়োগ—প্রক্রিয়াটি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
নিয়োগ বোর্ডে কারা ছিলেন? এই নিয়োগ কমিটিতে আরও ছিলেন— প্রকল্প পরিচালক ডা. মো. জসিম উদ্দিন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ-এর পরিদর্শক মুহাম্মদ অহিদুর রহমান, বাংলাদেশ ভেটেরিনারি কাউন্সিল-এর ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ডা. গোপাল চন্দ্র বিশ্বাস।
পিইসি শাখার প্রধান ডা. মো. হাবিবুর রহমানের
অভিযোগ রয়েছে, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট পুরো প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করেছে।
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ-ডাঃ বয়জার রহমানের পদোন্নতিও বিতর্কের বাইরে নয়। একাধিক সূত্রের দাবি, প্রশাসনিক যোগ্যতার পাশাপাশি রাজনৈতিক সুপারিশও তার অবস্থান শক্তিশালী করেছে। যদিও এ বিষয়ে তার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রতিবাদ ও জবাবদিহিতার দাবি-
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র সমন্বয়কদের কয়েকজন জানিয়েছেন, সরকারি নিয়োগে অনিয়ম মেনে নেওয়া হবে না। তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন।
প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে পুরো কাঠামোর বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
প্রশ্ন এখন একটাই—অভিযোগগুলো কি কেবল গুঞ্জন, নাকি সত্যিই প্রশাসনের অন্দরমহলে চলছে কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য?
ডাঃ বয়জার রহমানকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ততদিন পর্যন্ত বিতর্কের আগুনে পুড়তেই থাকবে দেশের প্রাণিসম্পদ প্রশাসন।
এসব অনিয়মের বিষয়ে জানতে চেয়ে ডাঃ ফয়জার রহমান এর মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোনকল গ্রহণ করেননি। খুদে বার্তা পাঠানো হলে কোনো জবাব মেলেনি।
