গেন্ডারিয়ার বস্তিতে আকস্মিক অভিযান, আটক ৬ | ভিডিওতে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে প্রতিমন্ত্রীকে ‘ধর ধর’ বলতে দেখা যায় | বৈধ অস্ত্রের প্রকাশ্য প্রদর্শন ও ব্যক্তিগতভাবে অভিযান পরিচালনা নিয়ে আইনজ্ঞদের প্রশ্ন। অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
নিজের নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-৬ আসনে মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে পিস্তল হাতে দেখা গেল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে। শনিবার বিকেলে গেন্ডারিয়ার রেললাইন-সংলগ্ন একটি বস্তিতে অভিযান চালানোর ভিডিও নিজ ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশ করেন তিনি। ভিডিওতে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে তাঁকে ‘এই ধর ধর ধর…’ বলতে শোনা যায়। তাঁর পাশ থেকে একজনকে ‘একেবারে গুলি করে দেব’ বলতেও শোনা যায়।
প্রতিমন্ত্রীর এ অভিযান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মাদকবিরোধী অভিযানে ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্র প্রকাশ্যে প্রদর্শন, আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে আচরণ এবং একজন প্রতিমন্ত্রীর সরাসরি অভিযান পরিচালনার আইনগত এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বস্তিতে অভিযান, আটক ছয়
শনিবার বিকেল সোয়া ৫টার দিকে ইশরাক হোসেন তাঁর ফেসবুক পেজে অভিযানের ভিডিও প্রকাশ করেন। এতে দেখা যায়, নিজের নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-৬ আসনের গেন্ডারিয়া থানার ৪৫ নম্বর ওয়ার্ডে রেললাইন-সংলগ্ন একটি বস্তিতে মাদকের আস্তানায় আকস্মিক অভিযান চালাতে যান তিনি।
গাড়ি থেকে নেমে পিস্তল উঁচিয়ে প্রতিমন্ত্রীকে চিৎকার করতে দেখা যায়। এ সময় তাঁর সঙ্গে থাকা দেহরক্ষীরা কয়েকজনকে ধাওয়া করে ধরার চেষ্টা করেন। ভিডিওতে একজন দেহরক্ষীকে এক ব্যক্তিকে লাথি মারতেও দেখা যায়।
গেন্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান মনির গণমাধ্যমকে জানান, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন ছয়জনকে আটক করে থানায় ফোন দেন। পরে পুলিশ সদস্যরা গিয়ে তাঁদের থানায় নিয়ে আসেন।
ওসি বলেন, আটক ব্যক্তিদের কাছে সাদা পাউডারজাতীয় পদার্থ পাওয়া গেছে। সেগুলো হেরোইন কি না, পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
পিস্তল হাতে অভিযানের কথা অস্বীকার এপিএসের
প্রতিমন্ত্রীর পিস্তলের লাইসেন্স আছে কি না, তা জানতে তাঁর এপিএস আরিফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমকাল। তিনি বলেন, ‘তিনি তো পিস্তল হাতে নয়; লাঠি নিয়ে অভিযানে গেছেন।
প্রতিমন্ত্রীর নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওতে পিস্তল দেখা গেছে—এ কথা জানালে আরিফুল ইসলাম প্রতিবেদককে বলেন, ফোন দিয়েছেন কেন? আপনার মাথা ঠিক আছে।
প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্রের লাইসেন্স এবং অভিযানে সেটি ব্যবহারের বৈধতা সম্পর্কে তাঁর পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
আইন নিজের হাতে নেওয়ার এখতিয়ার আছে কি?
একজন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী নির্বাহী বিভাগের নীতিনির্ধারক হলেও সরাসরি মাঠপর্যায়ে পুলিশি অভিযান পরিচালনা কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিশেষ ক্ষমতা সংবিধান বা ফৌজদারি কার্যবিধি তাঁকে দিয়েছে কি না, তা নিয়ে আইনজ্ঞদের প্রশ্ন রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহারসংক্রান্ত নীতিমালায় বৈধ অস্ত্রের অপব্যবহার, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হয়রানি নিষিদ্ধ করার বিধান রয়েছে। তবে এ ঘটনায় প্রযোজ্য নীতিমালার সঠিক সংস্করণ ও ধারা এবং অস্ত্রের লাইসেন্সের শর্ত যাচাই করা প্রয়োজন।
উচ্চ আদালতের আইনজীবী তাওহীদুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ‘আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা-২০২৫’-এর ২৫ (ক) ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি নিজের লাইসেন্সের বিপরীতে নেওয়া অস্ত্র শুধু আত্মরক্ষার জন্য বহন ও ব্যবহার করতে পারবেন। অন্যের ভীতি বা বিরক্তি তৈরি হতে পারে, এমন ক্ষেত্রে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না।
তিনি আরও বলেন, ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনের ২১ ধারা অনুযায়ী, লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গের অপরাধে অনূর্ধ্ব ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড, অনূর্ধ্ব ৫০০ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
তবে এ ঘটনায় প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্রের লাইসেন্সের শর্ত কী ছিল এবং তাঁর কর্মকাণ্ডে কোনো শর্ত ভঙ্গ হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও আইনগত মূল্যায়নের বিষয়।
‘অভিযানে প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্র প্রদর্শন না করাই ভালো’
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মুহাম্মদ নুরুল হুদা গণমাধ্যম কে বলেন, আইন অনুযায়ী মূলত আত্মরক্ষার প্রয়োজনে বৈধ অস্ত্র প্রদর্শন করা যেতে পারে। কোনো অভিযানে গিয়ে একজন প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্র প্রদর্শন না করাই ভালো।
তিনি বলেন, ‘কারণ, তার নিরাপত্তার জন্য তো পুলিশ থাকার কথা। সেক্ষেত্রে নিজের অস্ত্র প্রদর্শনের প্রয়োজনীয়তা দেখি না।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে ফোন করা হয় এবং হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠানো হয়। তবে তিনি সাড়া দেননি।
‘ঢাকা-৬ আসনকে মাদকমুক্ত না করা পর্যন্ত অভিযান চলবে’
অভিযান শেষে ইশরাক হোসেন বলেন, ঢাকা-৬ আসনকে মাদকমুক্ত না করা পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে। মাদক কারবারিরা যে দলেরই হোক, তাঁদের ছাড় দেওয়া হবে না। এমনকি তাঁর নিজ দলের কেউ মাদক কারবারে জড়িত থাকলে তাঁর শাস্তি আরও বড় হবে।
এলাকাবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, এলাকায় যারা মাদক বিক্রি করে, তাদের স্থান আমার এই ঢাকা-৬ আসনে নেই। আমার এই এলাকা থেকে মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হয়েছে। সারা বাংলাদেশে অভিযান চলবে, দেশের কোথাও মাদকের জায়গা হবে না।
আসনটিকে মাদকমুক্ত করতে অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি এলাকাবাসীর সহযোগিতাও চেয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
মাদকবিরোধী অভিযান ও আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য পাওয়া গেলেও প্রতিমন্ত্রীর আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স, অভিযানে অস্ত্র প্রদর্শনের আইনগত ভিত্তি এবং আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো স্পষ্ট নয়।
