পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর খসড়া ভেটিংয়ের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে গতকাল সোমবার আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এর আগে ৪ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ খসড়টির অনুমোদন দিয়েছে।
এদিকে স্বাধীন, নিরপেক্ষ, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত হয়ে পুলিশ কমিশন দায়িত্ব পালন করতে পারবে কিনা, তা নিয়ে বাহিনীর বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের অনেকে প্রশ্ন তুলছেন। তারা বলছেন, যেভাবে অধ্যাদেশ হচ্ছে তাতে পুলিশ আগের মতো আমলা ও রাজনীতিনির্ভর থাকবে। সাধারণত কমিশনের কাছে প্রবিধান প্রণয়নের ক্ষমতা থাকে। অন্যদিকে বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা সরকারের কাছে। এখানে দুটিই সরকারের কাছে রাখা হয়েছে। এটি স্বাভাবিকভাবে কমিশন পরিচালনা করতে অন্তরায় হবে।
এদিকে পুলিশ কমিশনের সদস্য বাছাই কমিটির সদস্য সংখ্যা সাতজন করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইন উপদেষ্টার নেতৃত্বে গঠিত একটি কমিটি পুলিশ কমিশনের খসড়া তৈরি করে। সেখানে বলা হয়েছিল, বাছাই কমিটির সদস্য হবে পাঁচজন। তারা হলেন– স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী; জাতীয় সংসদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি; সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতি; বিচারক হিসেবে যার অভিজ্ঞতা ১০ বছরের কম নয়; মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব এবং রাষ্ট্রপতি মনোনীত পুলিশি-কার্যক্রম, মানবাধিকার সংরক্ষণ বা সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়ে কমপক্ষে ১০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন নাগরিক প্রতিনিধি।
আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো সুপারিশে বলা হয়, বাছাই কমিটির সাত সদস্যের মধ্যে থাকবেন প্রধান বিচারপতির মনোনীত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারপারসন, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জাতীয় সংসদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্জাতীয় সংসদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির মনোনীত সরকার ও একজন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য। এই কমিটিতে থাকবেন স্বরাষ্ট্র সচিব ও বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান।
গতকাল রাতে অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার কল্যাণ সমিতির সভাপতি এম আকবর আলী সমকালকে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশ বাহিনীতে শৃঙ্খলা আনার লক্ষ্যে স্বাধীন পুলিশ কমিশনের গঠনের দাবি ছিল। আমরা চেয়েছিলাম রাজনীতি ও আমলা নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত পুলিশ। ১৬৪ বছর এই দুই শক্তি পুলিশ নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছে। তাই পুলিশ বারবার রাজনৈতিক দলের লাঠিয়াল বাহিনী হয়ে উঠেছে। এখন যেভাবে কমিশন হচ্ছে তাতে পুলিশ আরও সমস্যায় পড়বে। পুলিশের ওপর হস্তক্ষেপের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে। যদিও চেয়েছিলাম স্বাধীন কমিশন এই বাহিনীর চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।
বর্তমান ও সাবেক একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা গণমাধ্যম কে বলেন, স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের খসড়া তৈরি করতে উপদেষ্টা পরিষদের একাধিক সদস্য, স্বরাষ্ট্র ও পুলিশ সদরদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা বৈঠক করেন। সেখানে যেসব সুপারিশ করা হয় তার বেশ কিছু বিষয় খসড়া থেকে বাদ দেওয়া হয়। আবার কিছু বিষয় নতুনভাবে যুক্ত করা হয়েছে। উপদেষ্টাদের সমন্বয়ে বৈঠকের পরও পুলিশকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রভাব বলয়ের বাইরে রাখার মতো অবস্থায় নেওয়া যায়নি।
পুলিশ মহাপরিদর্শক নিয়োগের ব্যাপারে বলা হয়েছে– সততা, মেধা, দক্ষতা, জ্যেষ্ঠতা, সন্তোষজনক দায়িত্ব পালনের ভিত্তিতে পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত অতিরিক্ত মহাপরিদর্শকের নিচে নন, এমন তিনজন কর্মকর্তার নাম প্যানেল আকারে পাঠিয়ে সুপারিশ আকারে পাঠাবে কমিশন। তবে এই তিনজন থেকে কাউকে নিয়োগ করা হবে কিনা এমন কোনো স্পষ্ট কথা বলা নেই।
তবে প্রাথমিক খসড়ায় বলা হয়েছিল, কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে পুলিশ মহাপরিদর্শক নিয়োগ দেবে সরকার। কমিশন তিনজন কর্মকর্তার নাম প্রস্তাব করবে। দায়িত্ব গ্রহণের তারিখ থেকে দুই বছর পুলিশ মহাপরিদর্শক তার পদে থাকবেন।
উপদেষ্টা কমিটির প্রস্তাবে ৯ সদস্যের পুলিশ কমিশন গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সেখানে বলা হয়, পুলিশ কমিশনের প্রধান হবেন– আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত একজন বিচারপতি। সদস্য থাকবেন ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল থেকে দুজন সংসদ সদস্য এবং সাবেক একজন পুলিশ মহাপরিদর্শক। এ ছাড়া সদস্য হবেন সচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা, গ্রেড-১ মর্যাদার অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত আইজিপি, বিচার বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তা, কমপক্ষে ২০ বছর হাইকোর্টে কাজ করেছেন এমন আইনজীবী ও একজন মানবাধিকারকর্মী। এরপর সংশোধিত খসড়ায় সাত সদস্যের পুলিশ কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে।
তবে এখন যে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে, তাতে বলা হয়, কমিশনের সদস্য হবে পাঁচজন। চেয়ারম্যান হবেন সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত একজন বিচারক। এ ছাড়া থাকবেন– সরকারের জাতীয় বেতন স্কেলের গ্রেড-১ পদমর্যাদার (জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাজের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন) নিচে নন এমন একজন কর্মকর্তা। গ্রেড-১ পদমর্যাদার অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত আইজিপি। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মরত বা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। মানবাধিকার উন্নয়ন বা বাস্তবায়নে কিংবা সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ন্যূনতম ১৫ বছর কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানবাধিকারকর্মী।
