বৃহস্পতিবার, ৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

‘প্রাণিসম্পদ প্রকল্পে ভয়াবহ লুটপাটের অভিযোগ, *মেচিংগ্রান্টের নামে ভুয়া প্রতিষ্ঠানে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ: ডিপিডি হারুনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ*

নিজস্ব প্রতিবেদক
ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৬ ১২:৫২ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

প্রাণিসম্পদ খাতে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প (এলডিডিপি)–এ ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। প্রকল্পটির উপ-প্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি) ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ–এর বিরুদ্ধে মেচিংগ্রান্টের নামে অস্তিত্বহীন ও ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধান ও মাঠপর্যায়ের তদন্তে উঠে এসেছে, প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ, বিল অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাট করা হয়েছে।
অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানে ২ কোটি ৬১ লাখ টাকা বরাদ্দ!
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ময়মনসিংহের ত্রিশালে ‘কেসি এগ্রো’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নামে মেচিংগ্রান্ট হিসেবে প্রায় ২ কোটি ৬১ লাখ টাকা সরকারি ভর্তুকি বরাদ্দ দেওয়া হয়। অথচ মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠানটির কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এই বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঘুষ ও কমিশন হিসেবে ডিপিডি ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ গ্রহণ করেছেন। কাজ সম্পন্ন না করেই বিল উত্তোলনের জন্য জাল বিল-ভাউচার, ভুয়া অগ্রগতি প্রতিবেদন এবং প্রশাসনিক যোগসাজশ ব্যবহার করা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
৪ হাজার ২৮০ কোটি টাকার প্রকল্প, অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আওতায় বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পটি দেশের ৬১টি জেলায় (পার্বত্য জেলা ব্যতীত) পরিচালনার জন্য ৪২৮০.৩৬৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমোদিত হয়।
২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি শুরু হওয়া প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় মেয়াদ বাড়িয়ে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত করা হয়।
দীর্ঘ সময় ও বিপুল অর্থ বরাদ্দের পরও প্রকল্পের বিভিন্ন উপাদানে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না থাকায় সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন ও সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছে।
মিষ্টির দোকানে ডেইরি ফার্ম! ফিড মিলের নামে ভূয়া প্রতিষ্ঠান
ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন জেলায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। রংপুর সদর উপজেলায় ডেইরি ফার্মের নামে একটি মিষ্টির দোকানে অনুদান দেওয়ার অভিযোগ ওঠে, যা প্রকল্প নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
একই এলাকায় ফিড মিলের নামে অনুদানপ্রাপ্ত একটি প্রতিষ্ঠানের কোনো বাস্তব অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ তদন্তে এসব ঘটনায় প্রায় ৫ কোটি টাকার অনিয়মের প্রমাণ মিললেও আজ পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ব্যাকডেট আবেদন, জাল কাগজপত্র ও প্রশাসনিক ছত্রছায়া
প্রকল্পের মেচিংগ্রান্ট নীতিমালা অনুযায়ী আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে প্রস্তাবিত বাজেটের অন্তত ৬০ শতাংশ নিজস্ব বিনিয়োগ করতে হয়। কিন্তু বিভিন্ন জেলায় অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অধিকাংশ সুবিধাভোগী এই শর্ত পূরণ না করেই ভুয়া কাগজপত্র ও জাল বিল-ভাউচার তৈরি করে অনুদান উত্তোলন করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা পর্যায়ে তদন্তে বাতিল হওয়া আবেদনগুলো ব্যাকডেট করে পুনরুজ্জীবিত করা হয়, যা প্রধান কার্যালয়ে ডিপিডি ড. হারুনের সহযোগিতায় উৎকোচের বিনিময়ে অনুমোদন পায়।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে স্পষ্ট: মাঠে কোনো কাজের আলামত নেই
সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেসি এগ্রোর নামে বরাদ্দ দেওয়া অর্থের বিপরীতে মাঠপর্যায়ে কোনো অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি বা উৎপাদন কার্যক্রমের আলামত পাওয়া যায়নি। তবুও নিয়মিতভাবে বিল অনুমোদন ও অর্থ ছাড় দেওয়া হয়েছে, যা প্রশাসনিক যোগসাজশ ছাড়া সম্ভব নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক পরিচয় বদল, প্রভাব অটুট
সূত্রগুলোর দাবি, চাকরিজীবনের শুরুতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকলেও সময়ের পরিবর্তনে ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ ভিন্ন রাজনৈতিক বলয়ে নিজেকে মানিয়ে নেন। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিএনপি-পন্থী দুই প্রভাবশালী কর্মকর্তার সমর্থনে তার ক্ষমতা ও প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ ‘হাস্যকর’ দাবি ডিপিডির
অভিযোগ প্রসঙ্গে ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ বলেন,
“যার মনে যা চাই, তাই লিখছে। চুক্তি অনুযায়ী যতটুকু কাজ হয়েছে, ততটুকু বিলই দেওয়া হয়েছে।”
অন্যদিকে প্রকল্প পরিচালক ড. মো. মোস্তফা কামাল বলেন,
“অনিয়ম হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে অতীত অভিজ্ঞতায় তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলেও ব্যবস্থা না নেওয়ায় এই আশ্বাস নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
কৃষি অর্থনীতিবিদ ও খাতবিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের অনিয়ম অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীর আস্থা নষ্ট হবে, ক্ষতিগ্রস্ত হবেন প্রকৃত কৃষক ও উদ্যোক্তারা, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হুমকি।
সব মিলিয়ে, ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদকে ঘিরে ওঠা এই অভিযোগগুলো শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতির নয়—এটি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের তদারকি ব্যবস্থার গভীর দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ছাড়া এই খাতকে দুর্নীতিমুক্ত করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এসব অনিয়মের বিষয়ে মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ এর মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোনকল গ্রহণ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে খুদেবার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
বিশেষ খবর সর্বশেষ