বুধবার, ৪ঠা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বনলতা ল্যান্ডমার্কে অন্ধকারের জাল: শেয়ার দখল, কোটি টাকার লেনদেন ও ‘হুমকির রাজনীতি’—কার স্বার্থে নীরবতা ?

নিজস্ব প্রতিবেদক
মার্চ ৪, ২০২৬ ৩:১১ অপরাহ্ণ
Link Copied!

রিয়েল এস্টেট খাতে উচ্চাভিলাষী সূচনার পর আজ প্রশ্নের মুখে বনলতা ল্যান্ডমার্ক লিমিটেড। শেয়ার বণ্টনে অনিয়ম, গ্রাহকের কোটি কোটি টাকার হিসাবহীনতা, একই প্রকল্পের নামে পৃথক কোম্পানি খোলা, অডিটে বাধা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ—সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুকেন্দ্র দাস।

শেয়ার দখলের অভিযোগ : বিনা পুঁজিতে’ ৩ হাজার শেয়ার, কোম্পানির চেয়ারম্যান আহম্মদ আলী খান ফেরদৌস স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দায়ের করা লিখিত অভিযোগে দাবি করেছেন—২০১৮ সালের ১৩ আগস্ট প্রলোভন দেখিয়ে সুকেন্দ্র দাস প্রথমে ১২০০ শেয়ার গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রতিকূলতার কারণে চেয়ারম্যান দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকাকালে আরও ১৮০০ শেয়ার নিজের নামে নিয়ে মোট ৩০০০ শেয়ারের নিয়ন্ত্রণ নেন—কোনো পুঁজি বিনিয়োগ ছাড়াই।
অভিযোগে বলা হয়, ব্যাংক হিসাবও এককভাবে এমডির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ৩১ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে অনুষ্ঠিত এক্সট্রা অর্ডিনারি জেনারেল মিটিংয়ে আর্টিকেল সংশোধনের মাধ্যমে ব্যাংক পরিচালনার ক্ষমতা এমডির হাতে তুলে দেওয়া হয়—যেখানে কোরাম পূরণ হয়নি এবং চেয়ারম্যানকে অবহিত করা হয়নি বলে অভিযোগ।

২৮ কোটি টাকার লেনদেন—কিন্তু জমি কোম্পানির নামে নয় : অভ্যন্তরীণ অডিট সূত্রের দাবি—চলমান প্রায় ২১৮ জন গ্রাহকের কাছ থেকে বুকিং ও কিস্তি বাবদ ২৮ কোটির বেশি টাকা গ্রহণ করা হয়েছে। অথচ কোম্পানির নামে পর্যাপ্ত জমির দলিল বা বায়নার প্রমাণ নেই। অডিট পর্যবেক্ষণে আরও উঠে আসে—১৭টি দলিলের মধ্যে ১৬টি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ব্যক্তিগত নামে এবং মাত্র একটি চেয়ারম্যানের নামে।
প্রশ্ন উঠছে—গ্রাহকের অর্থ কি ব্যক্তিগত সম্পদে রূপান্তরিত হয়েছে ? একইসঙ্গে প্রায় ৫.৫৫ কোটি টাকার ব্যয়ের ক্ষেত্রে বোর্ড রেজুলেশন বা যথাযথ ভাউচার অনুপস্থিত থাকার অভিযোগও রয়েছে।

একই প্রকল্পের নামে আলাদা কোম্পানি ! “বনলতা রিভারগেট টাউন” প্রকল্পের নাম ব্যবহার করে পৃথক কোম্পানি খোলার অভিযোগ রয়েছে। চেয়ারম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের নামের সঙ্গে মিল রেখে “বনলতা রিভারগেট টাউন লিমিটেড” নামে নতুন প্রতিষ্ঠান গঠন করা হয়।
এছাড়া “গাডওয়াল হোল্ডিংস লিমিটেড” নামে আরেকটি কোম্পানি একই অফিস ঠিকানায় পরিচালিত হয়েছে বলে অভিযোগ। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা—এতে গ্রাহক বিভ্রান্তির সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং অর্থ স্থানান্তরের পথ সহজ হয়েছে।
অডিটে বাধা ও ফাইল গায়েব!
অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৯–২০২১ সময়কালের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই। অডিট চলাকালে নির্ধারিত কক্ষে তালা ভাঙা, গুরুত্বপূর্ণ ফাইল গায়েব হওয়া এবং অডিট টিমকে বাধা দেওয়ার ঘটনাও উল্লেখ রয়েছে। যদি এসব অভিযোগ সত্য হয়, তবে এটি কেবল আর্থিক অনিয়ম নয়—বরং প্রমাণ নষ্টেরও ইঙ্গিত বহন করে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ, থানায় জিডি : চেয়ারম্যান আহম্মদ আলী খান বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। পাশাপাশি বনানী থানা-এ সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং ১৬৪, তারিখ ০৩/০১/২০২৬) করেন। জিডিতে তিনি অভিযোগ করেন—হিসাব চাইতে গেলে তাঁকে হুমকি দেওয়া হয় এবং ‘খুন করে লাশ গুম’ করার ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়।
এছাড়া কোম্পানির এইচআর ও অ্যাকাউন্টস কর্মকর্তা শারমীন আক্তারও পৃথকভাবে জিডি (নং ৭৩৮, তারিখ ০৮/০১/২০২৬) করেন। তিনি অভিযোগ করেন—অফিসে তাকে হুমকি ও মারধরের চেষ্টা করা হয়েছে, ফলে তিনি মানসিকভাবে আতঙ্কিত।

ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধি: গাড়ি ও পূর্বাচল প্লট : অভিযোগে আরও বলা হয়েছে—কোম্পানির অর্থ ব্যবহার করে বিলাসবহুল গাড়ি ক্রয় এবং পূর্বাচলে প্লট কেনার তথ্য পাওয়া গেছে। যদিও এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক তদন্ত এখনো সম্পন্ন হয়নি।

এমডির নীরবতা উচকে দেয় অপরাধের চিহ্ন : উল্লিখিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সুকেন্দ্র দাসের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রশ্নগুলোর উত্তর কে দেবে ?
২৮ কোটির বেশি গ্রাহক অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে ? কেন অধিকাংশ জমির দলিল ব্যক্তিগত নামে ? একই প্রকল্পের নামে পৃথক কোম্পানি খোলার উদ্দেশ্য কী ? অডিটে বাধা ও নথি গায়েব হওয়ার দায় কার ? ভয়ভীতি ও হুমকির অভিযোগের পেছনে কী সত্য লুকিয়ে আছে ?
রিয়েল এস্টেট খাতে সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ বিনিয়োগের সঙ্গে জড়িত এমন অভিযোগের নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।

(পরবর্তী পর্বে: গ্রাহকদের সরাসরি অভিযোগ, আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ, বোর্ডের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা বিশ্লেষণ।)

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।