সময়টা প্রায় দুপুর। ঢাকার বাতাসে তখনও শীতের আমেজ। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনের সবুজ ঘাসে জমে আছে শিশির। জুতা খুলে খালি পায়ে সেদিকে এগিয়ে গেলেন দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফেরা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নিচু হয়ে এক মুঠো মাটি তুলে নিলেন হাতে। তখন কোনো স্লোগান ছিল না, কোনো বক্তৃতাও নয়– ছিল শুধু নীরবতা। ছিল দীর্ঘ অপেক্ষার পর নিজ দেশের মাটি ছুঁয়ে দেখার নিঃশব্দ আবেগ। লন্ডন থেকে ফিরে গতকাল বৃহস্পতিবার তারেক রহমান পা রাখলেন দেশের মাটিতে। তাঁকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দর থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত পথে পথে ছিল জনস্রোত।
নির্বাসনের দীর্ঘ অধ্যায় শেষে গত বুধবার মধ্যরাতে লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশ বিমানের একটি নিয়মিত ফ্লাইটে দেশের উদ্দেশে রওনা দেন তারেক রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। তাঁকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-২০২ উড়োজাহাজটি গতকাল সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। যাত্রাবিরতি শেষে এটি ঢাকার দিকে রওনা হয়। বেলা ১১টা ৩৯ মিনিটে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণ করেন তারেক রহমান, তাঁর স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান ও মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। সেখানে দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।
বিমানবন্দরে নামার পরই আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ছিল আনন্দ ও উত্তেজনা। ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া শেষে বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে প্রবেশ করলে সেখানে তাঁকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানান বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এরপর দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কুশল বিনিময় ও আলিঙ্গন করেন তারেক রহমান।
ভিআইপি লাউঞ্জে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান, সালাহউদ্দিন আহমেদ, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু প্রমুখ। নেতাদের সঙ্গে কথা বলার সময় তারেক রহমান আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
শাশুড়ির ফুলের মালা-
ভিআইপি লাউঞ্জেই তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করতে আসেন তাঁর শাশুড়ি সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানু। তিনি একটি সোফায় বসে ছিলেন। তারেক রহমান কাছে এলে তিনি ফুলের মালা পরিয়ে বরণ করে নেন। পরে দুজন কুশল বিনিময় করেন। এ সময় জাইমা রহমান নানিকে জড়িয়ে ধরে কুশল বিনিময় করেন। সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানুর সঙ্গে সোফায় বসে তাঁর মেয়ে, মেয়ের জামাই ও নাতনি কিছুক্ষণ কথা বলেন।
খালি পায়ে দেশের মাটিতে-
ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া শেষে বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে এসে হঠাৎ খোলা জায়গায় জুতা খুলে খালি পায়ে দেশের মাটি ও শিশিরভেজা ঘাস স্পর্শ করেন তারেক রহমান। এ সময় সামান্য মাটি হাতে নিয়ে মাতৃভূমির স্পর্শ নিতে দেখা যায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে। দলীয় সূত্র জানায়, খালি পায়ে মাটি স্পর্শ করার বিষয়টি পরিকল্পনায় ছিল না। হঠাৎ বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে সামনে থাকা ফুল বাগানের ভেতরে চলে যান। সেখানে ঘাস ও কিছু গাঁদা ফুলের গাছ রয়েছে। তারেক রহমান খালি পায়ে দাঁড়ান। তিনি নিচু হয়ে এক মুঠো মাটি নিয়ে তা পরম মমতায় নাড়াচাড়া করেন।
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ফোনালাপ-
বিমানবন্দরেই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন তারেক রহমান। তিনি প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেন। তারেক রহমানের নিরাপত্তার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এসব ব্যবস্থার জন্য তিনি নিজের ও পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ জানান। বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সৌজন্য ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের অংশ হিসেবে এ ফোনালাপ হয়েছে।
বিমানবন্দর-পূর্বাচল : সোয়া তিন ঘণ্টার পথ, দুপুর ১২টা ৪১ মিনিটে বিমানবন্দর এলাকা ছাড়েন তারেক রহমান। লাল-সবুজ রঙের একটি বাসে করে তিনি রওনা দেন পূর্বাচলের তিনশ ফুট সড়কে গণসংবর্ধনা মঞ্চের উদ্দেশে। বাসটিতে লেখা ছিল ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। বাসের সামনের অংশে দাঁড়িয়ে পুরো পথে তিনি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান।
বিমানবন্দর থেকে মঞ্চের দূরত্ব প্রায় চার কিলোমিটার। এ রাস্তা পেরিয়ে গণসংবর্ধনার মঞ্চে পৌঁছাতে তিন ঘণ্টা ১৫ মিনিট লেগেছে তারেক রহমানের। রাস্তায় অগণিত মানুষের শুভেচ্ছা ও ভালোবাসায় সিক্ত হন তিনি।
বিপুল জনসমাগমের কারণে তারেক রহমানের গাড়িবহর ধীরগতিতে এগোয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা পথজুড়ে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা দিয়ে গাড়িবহরকে এগিয়ে নেন। বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে গাড়িবহর মঞ্চের কাছাকাছি পৌঁছালেও ভিড়ের কারণে আর সামনে এগোনো সম্ভব হয়নি। এরপর তিনি হেঁটে সভামঞ্চে ওঠেন। তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরের আশপাশের সড়ক ও পূর্বাচলে সমবেত হয়েছিলেন লাখ লাখ নেতাকর্মী।
তিনশ ফুট সড়কে সকাল থেকেই সারাদেশ থেকে নেতাকর্মীরা আসতে শুরু করেন। অনেকে আগের দিন বিকেল থেকে সংবর্ধনাস্থলে অবস্থান করছিলেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মহানগরীর বিভিন্ন স্থান পরিণত হয় নজিরবিহীন জনসমুদ্রে। তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না সকাল ১০টার আগেই। বিমানবন্দর থেকে আসার পথে ছাড়াও পূর্বাচল, যুমনা ফিউচার পার্ক থেকে রূপগঞ্জ কাঞ্চন ব্রিজ পর্যন্ত কানায় কানায় ভরে যায় দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে। ভিড়ের কারণে শত শত নেতাকর্মী অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাদের তাৎক্ষণিক মেডিকেল ক্যাম্পে নিয়ে যান স্বেচ্ছাসেবীরা। এদিকে দৃষ্টিনন্দন করে তৈরি করা মঞ্চের আশপাশে গড়ে তোলা হয়ে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়। ১৬ কিলোমিটার সড়কজুড়ে টাঙানো হয় মাইক।
ফেসবুকে পোস্ট: সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা-
স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন সামাজিক মাধ্যমেও সক্রিয় ছিলেন তারেক রহমান। ভোর ৫টা ১৫ মিনিটে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ‘ফেরা’ শিরোনামে একটি পোস্ট দেন। পোস্টের সঙ্গে তিনি নিজের একটি ছবি যুক্ত করেন। পরে দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে চারটি ছবি শেয়ার করে লেখেন, ‘সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা।’
বিকেল সোয়া ৩টার দিকে আরেকটি পোস্টে তিনি লেখেন, ‘হে সার্বভৌম শক্তির মালিক আল্লাহ্! আপনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা প্রদান করেন এবং যার থেকে ইচ্ছা ক্ষমতা কেড়ে নেন; যাকে ইচ্ছা আপনি সম্মানিত করেন আর যাকে ইচ্ছা আপনি হীন করেন। কল্যাণ আপনারই হাতে। নিশ্চয়ই আপনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।’
‘জেবু’ও ফিরেছে, তারেক রহমানের সঙ্গে একই ফ্লাইটে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় ঢাকায় আনা হয়েছে তাঁর আদরের পোষা বিড়াল ‘জেবু’কে। এর আগে বিবিসি বাংলার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান জানিয়েছিলেন, বিড়ালটি মূলত তাঁর মেয়ে জাইমার হলেও এখন পরিবারের সবার আদরের সদস্য হয়ে গেছে।
সবাইকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন-
অভ্যর্থনা জানাতে আসা বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী সংগঠনের নেতাকর্মী ছাড়াও দেশবাসী, সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব, পুলিশ, অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী ও গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের তিনি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।
