আনোয়ার হোসেন শিকদার ছবি: সংগৃহীত
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে আর্সেনিকমুক্ত ও নিরাপদ পানি পৌঁছে দেওয়ার মহৎ উদ্দেশ্যে শুরু হয়েছিল প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার ‘সমগ্র বাংলাদেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প’। ২০২০ সালে একনেক অনুমোদিত এই মেগা প্রকল্প আজ পরিণত হয়েছে ভয়াবহ দুর্নীতি, টেন্ডার কারসাজি ও কমিশন বাণিজ্যের এক অন্ধকার সাম্রাজ্যে—এমন অভিযোগে তোলপাড় প্রকল্প সংশ্লিষ্ট মহল। আর এই সিন্ডিকেটের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) এস্টিমেটর প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন সিকদারের নাম।
৪০ হাজার টাকার বেতনে ‘কোটিপতি জীবন’!
ডিপিএইচই সূত্র জানায়, ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তা হিসেবে আনোয়ার সিকদারের সরকারি মূল বেতন মাত্র ১৬ হাজার টাকা; ভাতা-ইনক্রিমেন্টসহ মাসিক আয় সর্বোচ্চ ৪০ হাজারের আশেপাশে। অথচ অভিযোগ—ঢাকায় তিনটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, কোটি টাকার সম্পদ, দামি গাড়ি, গ্রামে বিশাল জমি ও বাড়ি, এমনকি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ—সব মিলিয়ে তিনি যেন এক ‘ছদ্মবেশী শিল্পপতি।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে— মোহাম্মদপুর পিসিকালচার হাউজিংয়ে স্ত্রীর নামে কোটি টাকার ফ্ল্যাট, ধানমন্ডি ৬ নম্বরে যৌথ নামে বড় ফ্লোর, সাভারে পাঁচতলা ভবন,
প্রায় ৪০ লাখ টাকার ব্যক্তিগত গাড়ি,
এতেই শেষ নয়—টাঙ্গাইলে প্রায় ১০ বিঘা জমি ও বিলাসবহুল বাড়ি, গোপালগঞ্জে পাইপ ফ্যাক্টরিতে বিনিয়োগ, এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও ঘুরছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
টেন্ডারের ‘গোপন রেট’ ফাঁস, কমিশনের পাহাড়!
প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা—প্রাক্কলন ও কারিগরি শর্ত নির্ধারণ—নিয়ন্ত্রণ করেন আনোয়ার সিকদার। অভিযোগ, তিনি আগে থেকেই পছন্দের ঠিকাদারদের কাছে টেন্ডারের গোপন রেট ফাঁস করে দেন। বিনিময়ে মোটা কমিশন—যা পরে সম্পদ ও বিনিয়োগে রূপ নেয়।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেন, “টেন্ডার খোলার আগেই ঠিক হয়ে যায় কে কাজ পাবে।” ফলে প্রতিযোগিতা বলতে কিছুই থাকছে না।
স্ত্রীর নামে ঠিকাদারি, নিজেই ‘কন্ট্রোলার’!
সরকারি বিধি অনুযায়ী, চাকরিজীবী কর্মকর্তা নিজে বা পরিবারের নামে ঠিকাদারি ব্যবসা করতে পারেন না। কিন্তু অভিযোগ—স্ত্রীর নামে লাইসেন্স নিয়ে আনোয়ার নিজেই প্রকল্পের কাজ নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাঁর সিন্ডিকেটভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোই পাচ্ছে বড় বড় প্যাকেজ।
গোপালগঞ্জে ১৫ কোটি টাকার টেন্ডার নিয়ে তোলপাড়
সম্প্রতি ১৫ কোটি টাকার সোলার প্যানেল টেন্ডারে ‘সালেক সোলার লিমিটেড’কে কাজ পাইয়ে দিতে শর্ত এমনভাবে সাজানো হয়—অন্যদের অংশ নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
আরেক টেন্ডারে সর্বনিম্ন দরদাতাদের বাদ দিয়ে প্রায় ৯% বেশি দরে ‘মনির ইঞ্জিনিয়ারিং’কে কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া—যেখানে সরকারের অতিরিক্ত ৪ কোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা।
পার্বত্য অঞ্চলেও একই কৌশল অবলম্বন করছেন এ অভিযুক্ত কর্মকর্তা। খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের টেন্ডারেও একই সিন্ডিকেটের দাপট। কারিগরি শর্ত এমনভাবে সাজানো হয়েছে—স্থানীয় ঠিকাদাররা বাদ পড়ে যায়, আর নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো একের পর এক কাজ পেয়ে যায়।
নির্বাহী প্রকৌশলীরাও ‘চাপের মুখে’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা জানান, পিডি অফিসের নির্দেশ মানতেই হয়। টেন্ডার আহ্বানের আগেই নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের রেট ঠিক করা থাকে। গোপালগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়েজ আহমেদ বলেন, পিডি অফিস যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছে, আমি সেভাবেই টেন্ডার করেছি।
দুদকের অভিযোগ, তবুও বহাল তবিয়তে!
আনোয়ার সিকদারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে একাধিক অভিযোগ ও চার্জশিট থাকার পরও কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেই। সংশ্লিষ্টদের দাবি—প্রভাবশালী মহলের ‘অদৃশ্য ছত্রচ্ছায়া’ তাঁকে রক্ষা করছে।
পুরনো প্রকল্পেও একই অভিযোগ-
আর্সেনিক প্রকল্প ও ৩৭ পৌরসভা পানি সরবরাহ প্রকল্প—সব জায়গাতেই তাঁর বিরুদ্ধে লুটপাটের অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু প্রতিবারই শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ায় সিন্ডিকেট আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ।
নিজের মুখেই স্বীকারোক্তি!
অভিযোগের বিষয়ে আনোয়ার সিকদার বলেন, আমার স্ত্রীর নামে ঠিকাদারি লাইসেন্স আছে। আমি ভাইয়ের সঙ্গে কিছু কাজ করেছি। তবে প্রশাসনিক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বক্তব্যই চাকরিবিধি লঙ্ঘনের ইঙ্গিত দেয়।
ডিপিএইচইর প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল আউয়াল বলেন, সরকারি চাকরি করে ঠিকাদারি করার সুযোগ নেই। প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মানুষের পানি প্রকল্প, নাকি দুর্নীতির স্মারক?
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা—নিরাপদ পানি প্রকল্প দুর্নীতির কবলে পড়লে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ। বিশুদ্ধ পানির স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে, আর হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন হবে প্রশ্নবিদ্ধ।
দাবি উঠেছে জরুরি তদন্তের–স্থানীয় ঠিকাদার ও প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি— বিতর্কিত টেন্ডার বাতিল।
স্বচ্ছ পুনরায় দরপত্র আহ্বানের দাবি তুলেছেন নেটিজেনরা। এছাড়াও আনোয়ার সিকদার ও তাঁর সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি ধীরে ধীরে জোরালো অবস্থান, নচেৎ,নিরাপদ পানি প্রকল্প” ইতিহাসে থেকে যাবে উন্নয়নের নয়—দুর্নীতির এক কলঙ্কিত স্মারক হিসেবে।
