জাতীয় নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে তিন দিনের ব্যবধানে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তি করতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর অংশ হিসেবে আজ শুক্রবার জাপানের রাজধানী টোকিওতে দেশটির সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) সই হচ্ছে। এর দুই দিন পর আগামী সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্টা শুল্কসংক্রান্ত একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, জাপানের সঙ্গে ইপিএ সই করতে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর পৌনে ২টায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে টোকিওর উদ্দেশে রওনা হন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। জাপানের রাজধানী টোকিওতে আজ বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টায় বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) সই হওয়ার কথা রয়েছে। এটি হবে কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি।
গত ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী এই কর্মসূচিতে অংশ নিতে টোকিওতে আগে থেকেই রয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) অনুবিভাগের প্রধান আয়েশা আক্তার, যুগ্ম সচিব ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ, উপসচিব মাহবুবা খাতুন মিনু এবং সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ হাসিব সরকার।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান সমকালকে বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পরও জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার ধরে রাখতেই এই ইপিএ সই করা হচ্ছে। তিনি বলেন, জাপান বর্তমানে বিনিয়োগের জন্য অনুকূল গন্তব্য খুঁজছে। সরকার আশা করছে, এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়বে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ইপিএ কার্যকর হলে প্রথম দিন থেকেই তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। বিপরীতে শুরুতে জাপানের ১ হাজার ৩৯টি পণ্য বাংলাদেশের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। এরপর ছয় থেকে আট বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে আরও ২ হাজার ৭০২টি জাপানি পণ্য শুল্ক ছাড়ের আওতায় আসবে। একপর্যায়ে উভয় দেশে মোট ৯ হাজার ৩৫৪টি পণ্যে কোনো শুল্ক থাকবে না। এর মধ্যে বাংলাদেশি পণ্যের সংখ্যা ৭ হাজার ৪৩৬টি।
তবে জাপানের গাড়ি এই চুক্তির আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে না। স্থানীয়ভাবে গাড়ি উৎপাদনে জাপানি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইপিএর আওতায় কয়েক ধাপে শুল্ক ছাড় দিতে হবে বাংলাদেশকে। সর্বশেষ পর্যায়ে সব পণ্যে শুল্ক ছাড় কার্যকর হলে বছরে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তবে এই চুক্তি না হলে এলডিসি উত্তরণের পর জাপানের বাজারে শুল্ক সুবিধা হারিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
বর্তমানে এশিয়ায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য জাপান। দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ বছরে প্রায় ২০০ কোটি ডলার, যার বেশির ভাগই তৈরি পোশাক। অন্যদিকে জাপান থেকে আমদানি ১৮০ কোটি থেকে ২৭০ কোটি ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ইপিএ কার্যকর হলে একদিকে রপ্তানি বাড়বে, অন্যদিকে শিল্পাঞ্চলে জাপানি বিনিয়োগ বাড়বে। এতে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। শুল্ক সুবিধার পাশাপাশি এই চুক্তিতে সেবা খাত, বিনিয়োগ, কাস্টমস প্রক্রিয়া ও মেধাস্বত্ব অধিকার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ইপিএর আওতায় বাংলাদেশ জাপানের জন্য ৯৭টি সেবা উপখাত উন্মুক্ত করবে, আর জাপান বাংলাদেশের জন্য খুলে দেবে ১২০টি উপখাত।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি সোমবার
বাংলাদেশের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্ক ইস্যুতে ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একটি পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর হতে যাচ্ছে। আগামী সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে এ চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে।
এ সম্পর্কিত দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে সরাসরি উপস্থিত থাকছেন না বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ওয়াশিংটনে গিয়ে অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। তাদের উপস্থিতিতে অনলাইনে চুক্তিতে সই করবেন বাণিজ্য উপদেষ্টা।
যুক্তরাষ্ট্র সফরকারী বাংলাদেশ দলের প্রধান হচ্ছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব খাদিজা নাজনীন। দলের অন্য সদস্যরা হলেন–যুগ্ম সচিব ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ ও মুস্তাফিজুর রহমান, সিনিয়র সহকারী সচিব শেখ শামসুল আরেফীন এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কমিশনার রইছ উদ্দিন খান।
সূত্র জানায়, বাণিজ্য উপদেষ্টা ইতোমধ্যে এই চুক্তিতে সই করেছেন। তাঁর সই করা কপি ওয়াশিংটনে নিয়ে যাবে প্রতিনিধি দল। আগামী সোমবার অনলাইনে যুক্ত থাকবেন বাণিজ্য উপদেষ্টা ও সচিব। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে চুক্তিতে সই করবেন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিয়েসন গ্রিয়ার।
গত আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর পাল্টা শুল্কের হার কমিয়ে ২০ শতাংশ করলেও এ বিষয়ে কোনো চুক্তি হয়নি। পরে এই হার আরও কমানো এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা দিয়ে উৎপাদিত পোশাক রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা আদায়ে আলোচনা হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন শুল্কহার প্রায় ১৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এসব সুবিধা পেতে বাংলাদেশকে কিছু ছাড় দিতে হচ্ছে।
