ছবি: বাসস
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে সারাদেশে নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে সরকার। ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভোটের আগে, ভোটের দিন ও পরবর্তী সময়জুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মাঠে নেমেছে প্রায় ১০ লাখ সদস্য। লক্ষ্য—শান্তিপূর্ণ, বিশ্বাসযোগ্য ও বিঘ্নমুক্ত ভোটগ্রহণ।
দেশের ৩০০টি আসনের মধ্যে একটি আসনে প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ভোট স্থগিত থাকলেও বাকি আসনগুলোতে প্রায় ১২ কোটি ৭৫ লাখ ভোটারের জন্য স্থাপিত প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্র ও আনুমানিক ২ লাখ ৬০ হাজার ভোটকক্ষ ঘিরে তৈরি করা হয়েছে বহুস্তর নিরাপত্তা বলয়। মহানগর, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও দুর্গম অঞ্চলসহ স্পর্শকাতর কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি সতর্কতা জারি রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, সহিংসতা ও নাশকতার বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। “নির্বাচনী পরিবেশ বিঘ্নিত করার যেকোনো চেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে”—সতর্ক করে তিনি বলেন, প্রয়োজনে নিরাপত্তা বাহিনী ভোটকেন্দ্রেও প্রবেশ করতে পারবে। সীমান্তে নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক কনটেন্ট পর্যবেক্ষণ জোরদার করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষে রিয়েল-টাইম মনিটরিং, দ্রুত সাড়া দেওয়ার প্রস্তুতি ও যোগাযোগ কাঠামো পর্যালোচনা করা হয়েছে। রাজধানীর নিউ মার্কেট ও মোহাম্মদপুর থানা পরিদর্শনে মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি দেখে কর্মকর্তাদের সতর্ক, নিরপেক্ষ ও পেশাদার থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
মাঠে কারা কতজন?
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মোতায়েনকৃত বাহিনীর মধ্যে রয়েছে—
১ লাখ সেনাসদস্য
৫ হাজার নৌবাহিনী
৩ হাজার ৭৩০ বিমানবাহিনী
৩৭ হাজার ৪৫৩ বিজিবি
৩ হাজার ৫০০ কোস্ট গার্ড
১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ পুলিশ
৯ হাজার ৩৪৯ র্যাব
৫ লাখ ৬০ হাজার আনসার ও ভিডিপি
৪৫ হাজার ৮২০ চৌকিদার ও দফাদার
পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহরুল আলম বলেছেন, “জনআস্থা পুনরুদ্ধারে পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা দেখাতে হবে।” সাইবার গোয়েন্দা কার্যক্রম ও সোশ্যাল মিডিয়া পর্যবেক্ষণেও জোর দেওয়া হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার এস এম সাজ্জাত আলী আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে বলেন, রাজনৈতিক আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে ত্রুটিমুক্ত নির্বাচন নিশ্চিত করাই অগ্রাধিকার।
কৌশলগত টহল ও সীমান্ত সুরক্ষা
বিজিবি রাজধানীসহ বড় শহরের স্পর্শকাতর এলাকায় বিশেষ টহল শুরু করেছে। মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী জানান, ৪৮৯ উপজেলায় ৩৭ হাজারের বেশি সদস্য মোতায়েন এবং ৬১ সীমান্ত উপজেলায় বিজিবির একক দায়িত্ব থাকবে। হেলিকপ্টার, ড্রোন, কে-৯ ইউনিট ও কুইক রেসপন্স টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। মিয়ানমার সীমান্তে রোহিঙ্গা-সংক্রান্ত ঝুঁকি, চোরাচালান ও অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
উপকূলীয় ও নদীবেষ্টিত অঞ্চলেও কড়াকড়ি। কোস্ট গার্ড ১৮ জানুয়ারি থেকে দায়িত্ব পালন করছে; ভোলা, নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর, খুলনা, চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, কক্সবাজার, বরিশাল ও পটুয়াখালীসহ ৬৯ ইউনিয়নের ৩৩২ কেন্দ্র পাহারায় রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ সদস্যের ১০০ প্লাটুন। সারাদেশে ৪২ হাজার ৭৬৬ কেন্দ্রে আনসার-ভিডিপির ৫ লাখ ৬০ হাজার সদস্য দায়িত্বে আছেন।
সব বাহিনীকে নিয়ে গঠন করা হয়েছে কেন্দ্রীয় আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেল; জরুরি সেবা ৯৯৯-এর অধীনে বিশেষ দল সার্বক্ষণিক সহায়তায় থাকবে। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে এলাকা-ভিত্তিক অভিযান, চেকপোস্ট ও মোবাইল টহল অব্যাহত থাকবে।
কর্তৃপক্ষের আশা, এই বহুমাত্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ভোটাররা স্বাধীনভাবে, নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন—উৎসবমুখর পরিবেশেই সম্পন্ন হবে দেশের অন্যতম বৃহৎ গণতান্ত্রিক আয়োজন।
