মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার নিস্তব্ধ ভোর—চারদিকে কুয়াশার চাদর, আর তার মাঝেই লুকিয়ে ছিল এক শিহরণ জাগানো সত্য। স্থানীয়দের সতর্ক নজর আর সাহসী ধাওয়ায় ফাঁস হয়ে গেল এক ভয়ংকর প্রতারণার গল্প। জবাই করা ১৩টি ঘোড়া ফেলে পালিয়ে গেল অবৈধ মাংস ব্যবসায়ী চক্রের সদস্যরা, রেখে গেল রক্তমাখা এক নির্মম দৃশ্য।
গজারিয়া উপজেলার আনারপুরা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন পল্লী বিদ্যুৎ সাব-স্টেশনের পেছনের একটি পরিত্যক্ত ঘর—যেখানে এতদিন নিঃশব্দে চলছিল নিষ্ঠুরতার আয়োজন। সেখান থেকেই উদ্ধার করা হয় জবাই করা ঘোড়াগুলো। শুধু তাই নয়, মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা একটি জীবন্ত ঘোড়াকেও বাঁচিয়ে আনেন স্থানীয়রা—যেন এক নিঃশব্দ আর্তনাদ ফিরে পেল জীবনের আলো।
স্থানীয়দের ধারণা, এই ১৩টি ঘোড়া থেকে প্রায় ৩০ মণ মাংস পাওয়া যেত—যা হয়তো প্রতারণার মোড়কে গরুর মাংস হিসেবে ছড়িয়ে পড়ত শহরের নানা হোটেলে। এক ভয়ংকর ছলনার গল্প, যেখানে বিশ্বাসকে জবাই করা হচ্ছিল প্রতিদিন।
প্রত্যক্ষদর্শী তোফাজ্জল মিয়াজীর কণ্ঠে এখনো কাঁপন—
গত ছয় মাস ধরে এলাকায় অদ্ভুত সব কার্যক্রম চলছিল। সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছিল। অবশেষে বুধবার ভোরে আমরা ওত পেতে তাদের ধরে ফেলি। কিন্তু তিতাস ও রাজিবসহ কয়েকজন আমাদের চোখের সামনেই পালিয়ে যায়।
আরেক বাসিন্দা নাজমুল হোসেন জানান এক গোপন রহস্যের ধারাবাহিকতা— প্রতি রোববার ও বুধবার গভীর রাতে গাড়ি আসত। সকালে পড়ে থাকত রক্ত আর হাড়। পরে বুঝলাম, ঘোড়া জবাই করে সেই মাংস গরুর মাংস বলে বিক্রি করত তারা। প্রমাণ লুকাতে সবকিছু মাটির নিচে চাপা দিত।

ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও, ততক্ষণে চক্রের সদস্যরা অদৃশ্য। গজারিয়া থানার ওসি মো. হাসান আলী জানিয়েছেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। অপরাধীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হবে।
এদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান স্পষ্ট করে বলেন, পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১১’ অনুযায়ী ঘোড়া জবাই সম্পূর্ণ অবৈধ। ঘটনাস্থলে কাউকে না পাওয়ায় তাৎক্ষণিক মোবাইল কোর্ট পরিচালনা সম্ভব হয়নি, তবে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জবাই করা ঘোড়াগুলো প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে মাটিতে পুঁতে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—যেন সেই ভয়ংকর স্মৃতি আর না ছড়ায়।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই নিষ্ঠুরতার পেছনে থাকা মানুষগুলো কি ধরা পড়বে?আর কতদিন এভাবে প্রতারণার অন্ধকারে ডুবে থাকবে আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা?
ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা এখন একটাই দাবি তুলেছেন—দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
