খালেদা জিয়া
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া রাজনৈতিক জীবনে যেমন ছিলেন আপসহীন, তেমনি মহান মুক্তিযুদ্ধেও ছিলেন অকুতোভয়। দেশকে ভালোবেসে তিনি মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই রেখেছিলেন অবদান। মুক্তিযুদ্ধের এক পর্যায়ে তাঁকেও বন্দিত্ব জীবন কাটাতে হয়। সেখানেও তিনি আপস করেননি, ভীত হয়ে পড়েননি। অবুঝ দুই সন্তানকে নিয়ে তিনি একা লড়েছেন যুদ্ধের সেই বিভীষিকাময় দিনে।
১৯৭১ সালের মার্চে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরুতে মেজর জিয়াউর রহমানকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে স্থানান্তর করা হয়। জিয়া পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। নিজের পরিবারকে অরক্ষিত অবস্থায় রেখে জিয়াকে এগিয়ে যেতে হয়। একদিন জিয়া তাঁর সৈন্যদের নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন সেই বাড়ির পাশ দিয়ে, যেখানে তাঁর স্ত্রী ও দুই ছেলে ছিলেন। তখন লেফটেন্যান্ট শমসের মবিন চৌধুরী জানতে চেয়েছিলেন তাঁর (জিয়ার) পরিবারকে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন আছে কিনা। জিয়া উত্তর দিয়েছিলেন, ‘যদি আমার কমান্ডে থাকা ৩০০ সৈন্য তাদের পরিবারের কথা না ভেবে এগিয়ে যেতে পারে, সে ক্ষেত্রে আমিও আমার পরিবারের কথা ভাবতে পারি না।
আত্মগোপনে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়-
জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং যুদ্ধে যাওয়ার পর অনিশ্চিত অবস্থা বিরাজ করায় খালেদা জিয়া আত্মগোপনে চলে যান (বেগম খালেদা জিয়া ও বাংলাদেশ: রুহুল আমিনের লেখা বই)। সেখানে লেখক আরও বলেন, খালেদা জিয়া প্রায় দুই মাস চট্টগ্রামে ছিলেন; কিন্তু অবস্থার অবনতি হওয়ায় আত্মগোপনে থাকা তাঁর জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। এ ছাড়া তাঁর চেহারা সহজেই শনাক্তযোগ্য হওয়ায় একই জায়গায় দীর্ঘদিন পালিয়ে থাকা দুষ্কর হয়ে ওঠে। তিনি চট্টগ্রামের বাইরে কোথাও সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বড় বোন খুরশিদ জাহান হকের সঙ্গে যোগাযোগ করে খালেদা জিয়া ১৯৭১ সালের ১৬ মে চট্টগ্রাম থেকে লঞ্চে নারায়ণগঞ্জে পৌঁছান।
নারায়ণগঞ্জ লঞ্চঘাটে পৌঁছানোর পর খুরশিদ জাহান হক ও তাঁর স্বামী মোজাম্মেল হক একটি জিপে রেড ক্রস চিহ্ন সেঁটে দিয়ে নারায়ণগঞ্জ যান। সেখান থেকে রাতে ঢাকার খিলগাঁওয়ের বাসায় ওঠেন। সে অবস্থায় তাঁর মুক্ত জীবন ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। প্রায় ১০ দিন ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নেওয়ার জন্য চেষ্টা করার পর তাঁর অবস্থান পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শনাক্ত করতে পারে।
মোজাম্মেল হক তখন ধানমন্ডিতে তাঁর এক চাচার বাসায় খালেদা জিয়াকে রাখার কথা ভাবলেন। সেখান থেকে তাঁকে আনা হয় পাকিস্তান ভূতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগের সহকারী পরিচালক মুজিবুর রহমানের বাসায়। মুজিবুর রহমান পরামর্শ দেন সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় খালেদা জিয়াকে একই বিভাগের প্রকৌশলী এস কে আব্দুল্লাহর বাড়িতে আত্মগোপনে রাখা সুবিধাজনক হবে। খালেদা জিয়া ৩ জুন ওই প্রকৌশলীর বাসায় চলে যান।
ঝামেলা ও ক্রমাগত নজরদারিতে থাকার শঙ্কায় মোজাম্মেল হক ও খুরশিদ জাহান হক ধানমন্ডির শঙ্করে এক চাচার বাসায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
খালেদা জিয়াকে লেখা জিয়ার চিঠি-
মুক্তিযুদ্ধের সময় গ্রিন রোডে মোজাম্মেল হকের এক বন্ধুর বাসায় খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে চিঠি পাঠিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। মোজাম্মেল হক খবরটি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। চিঠিতে অনুরোধ ছিল: ‘আমি কাউকে পাঠাচ্ছি। দয়া করে পুতুলকে (খালেদা জিয়া) তার সঙ্গে পাঠান।
মোজাম্মেল হক চিঠিটির সত্যতা যাচাই করতে সেটি মুজিবুর রহমানের বাসায় খালেদা জিয়ার কাছে পাঠিয়েছিলেন, কারণ শুধু তিনিই জিয়ার হাতের লেখা চিনতেন। জিয়ার হাতে লেখা চিঠিটি ভারত থেকে ড. হুমায়ুন আবদুল হাই সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার-
খালেদা জিয়াকে ১৯৭১ সালের ২ জুলাই এম আব্দুল্লাহর সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি সবসময় বাসার ভেতরে থাকতেন। যেদিন খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়, সেদিন ভোরে তিনি বাড়ির বাগান দেখতে গিয়েছিলেন। হঠাৎ তিনি খেয়াল করলেন বাড়িটি ঘিরে ফেলা হয়েছে। গ্রেপ্তার করে দুই ছেলেসহ তাঁকে পুরোনো সংসদ ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাদের ঢাকা সেনানিবাসের ভেতরের একটি বাসায় বন্দি রাখা হয়।
পাকিস্তানি বন্দিদশা থেকে মুক্তি-
পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের সময় জিয়া সিলেটের শমশেরনগরে ছিলেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার নির্দেশে বিমানে খালেদা জিয়া ও তাঁর দুই ছেলেকে ঢাকা থেকে শমশেরনগরে নিয়ে যাওয়া হয়। মেজর চৌধুরী খালেকুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন অলি আহমদ তাঁকে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানান। তাদের একটি স্থানীয় বিশ্রামাগারে রাখা হয়েছিল। খালেদা জিয়াকে শমশেরনগরে নিয়ে যাওয়ার তারিখ এবং তারা সেখানে কত দিন অবস্থান করেছিলেন, তা নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। তারিখগুলো যথাযথভাবে মনে করতে না পারলেও ঘটনার পরম্পরা খালেদা জিয়ার স্মরণে ছিল।
