দীর্ঘদিনের জল্পনা–কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বরখাস্ত করা হয়েছে যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের আলোচিত কর্মচারী অফিস সহকারী হোসাইন মো. ইসহাক মিল্টনকে। তবে তাকে ঘিরে যে জালিয়াতি ও অনিয়মের বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে, তার মূল হোতারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে—এমনটাই অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
গত ৪ মার্চ ডাকাতি মামলার আসামিকে বাঁচাতে তৎপর জিএম এইচআর – ডিপো ইনচার্জ” শিরোনামে প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পরপরই নড়েচড়ে বসে কর্তৃপক্ষ। তার পরদিন ৫ মার্চ তড়িঘড়ি করে মানবসম্পদ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. মাসুদুল ইসলাম এবং বাঘাবাড়ি ডিপো ইনচার্জ আবুল ফজল মো. সাদেকিনের সমন্বয়ে দৈনিক হাজিরাভিত্তিক কর্মচারী ইসহাক মিল্টনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
উল্লেখ্য, মিল্টন প্রায় এক মাস সতের দিন কারাগারে থাকার পরও চাকরিতে যোগ দেন। অথচ এত বড় জালিয়াতির ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠলেও মানবসম্পদ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক এবং সংশ্লিষ্ট ডিপো ইনচার্জের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো তদন্ত কমিটি পর্যন্ত গঠন করা হয়নি। ফলে প্রতিষ্ঠানজুড়ে দ্বৈত নীতির অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে।
ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু মাসুদুল ইসলাম
২০২৩ সালের ২৭ এপ্রিল যমুনা অয়েলের জিএম (এইচআর) পদে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটিতে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেন মো. মাসুদুল ইসলাম। অভিযোগ রয়েছে—তার ইশারাতেই পরিচালিত হয় কোম্পানির অধিকাংশ প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড।
বিতর্ক আরও গভীর হয়েছে তার বহুমুখী দায়িত্বকে ঘিরে। বর্তমানে তিনি একসঙ্গে পালন করছেন—
*মহাব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ)
*মহাব্যবস্থাপক (বিপণন)
কোম্পানি সচিব
*বিটুমিন সরবরাহ কমিটির দায়িত্ব অর্থ বিনিয়োগ কমিটির আহ্বায়ক
এমনকি একসময় ব্যবস্থাপনা পরিচালকের রুটিন দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। অথচ মার্কেটিং বা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নেই—এমন অভিযোগও উঠেছে। তবু তার প্রভাব ও ক্ষমতায় কোনো ভাটা পড়েনি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
পুরনো অভিযোগ, অমীমাংসিত তদন্ত যমুনা অয়েলের একটি ২০১৬ সালের অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে মাসুদুল ইসলামের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়। তখন তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হলেও বাস্তবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বরং উল্টো সময়ে সময়ে তার প্রভাব আরও বেড়েছে।
২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর থেকে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের রুটিন দায়িত্ব পালন করেন। সেই সময়ই তিনি ডিপো অপারেশন ইনচার্জ শেখ জাহিদ আহমেদকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করেন—যাকে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে “বিতর্কিত কর্মকর্তা” হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।
ছুটি জালিয়াতির বিস্ফোরক অভিযোগ- চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি তিন সিবিএ নেতাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু তাদের বরখাস্তের নথিপত্র ঘেঁটে বেরিয়ে এসেছে এক বিস্ময়কর তথ্য।
অভিযোগ রয়েছে— যেসব নেতা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ছিলেন, তাদের নামেই পরে অফিসে ছুটির আবেদন জমা পড়ে এবং সেই আবেদন আবার অনুমোদনও করা হয়।
সংশ্লিষ্টদের দাবি— এই ছুটির আবেদনপত্রে স্বাক্ষর জাল করে নিজেই আবেদন তৈরি এবং অনুমোদন দেন জিএম এইচআর মাসুদুল ইসলাম।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে— জেলখানায় থাকা অবস্থায় তারা ছুটির আবেদন করলেন কীভাবে?
পদোন্নতিতে টাকার খেলা? যমুনা অয়েলের ভেতরে পদোন্নতি ও বদলির ক্ষেত্রেও অভিযোগ উঠেছে অনিয়মের। ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট তার স্বাক্ষরে পদোন্নতি পাওয়া কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী— কিছু কর্মকর্তা দীর্ঘদিন অফিসে অনুপস্থিত থেকেও পদোন্নতি পেয়েছেন।
তেল গায়েব, বদলি প্রতিবাদকারীর- ফতুল্লা ডিপোতে প্রায় ৩ লাখ ৭৫ হাজার লিটার ডিজেল উধাও হওয়ার ঘটনায় একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সেই তদন্তে ডিপোর অফিসার (অপারেশন) ইমরান হোসেন নানা অনিয়মের তথ্য তুলে ধরেন। অভিযোগ রয়েছে—এই প্রতিবাদের জেরেই ২৪ নভেম্বর ২০২৫ তাকে বদলি করে দেওয়া হয়।
কোটি টাকার ক্ষতির তদন্ত- ২০১৫ সালে শ্রমিক অংশগ্রহণ তহবিলের অর্থ ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করার কারণে প্রায় ৪ কোটি ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। ২০১৬ সালের তদন্ত প্রতিবেদনে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হলেও সেই সুপারিশও কার্যকর হয়নি। সেই ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের একজন ছিলেন মাসুদুল ইসলাম।
সম্পদের পাহাড়- ১৯৯৬ সালে চাকরি শুরু করা মাসুদুল ইসলামের বিরুদ্ধে এখন অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী তার রয়েছে—
চট্টগ্রামের হালিশহরে ফ্ল্যাট, চউক আবাসিক প্রকল্পে দুটি প্লট, একটি ডেইরি ফার্ম, শেয়ারবাজারে বিপুল বিনিয়োগ। এছাড়া গাড়ি কেনার জন্য নেওয়া ঋণের টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
প্রশ্নের মুখে যমুনা অয়েল- এদিকে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন—
একজন নিম্নপদস্থ কর্মচারীকে বরখাস্ত করেই কি শেষ হবে সব দায়?
নাকি তদন্তের মুখোমুখি হবেন ক্ষমতাধর কর্মকর্তারাও?
যমুনা অয়েল কোম্পানির ভেতরে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-ইসহাক মিল্টন কি শুধু বলির পাঁঠা?
