হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও যুদ্ধ বন্ধের চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর আগে বেশকিছু জটিলতা আছে। প্রতীকী ছবি
বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে যেন এক নাটকীয় অধ্যায়—কখনো আগুনের মতো তীব্র, আবার কখনো শান্তির নরম পরশে ভেজা। বৈঠকের টেবিল থেকে যে উত্তেজনার সূচনা, তা রূপ নেয় ভয়াবহ যুদ্ধে; আর সেই যুদ্ধের মাঝেই হঠাৎ থমকে দাঁড়ানো—অস্ত্রবিরতির ক্ষণিক বিরতিতে যেন বিশ্ব খুঁজছে স্বস্তির নিঃশ্বাস।
মাত্র ৩৯ দিনের সংঘাতে প্রাণ ঝরেছে ৩ হাজার ৭৯৯ জনেরও বেশি মানুষের। সেই রক্তাক্ত বাস্তবতার মধ্যেই এসেছে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা। কিন্তু শান্তির এই ঘোষণা যেন ঠিক ততটাই ভঙ্গুর, যতটা ভোরের শিশির—কারণ, যে কারণগুলোকে কেন্দ্র করে এই সংঘাতের জন্ম, সেগুলো এখনো জড়িয়ে আছে দ্বন্দ্ব আর অবিশ্বাসের জালে।
মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ঘোষণা দিয়েছেন, ইসলামাবাদে শুরু হতে যাওয়া বৈঠকে এসব জটিল প্রশ্নের সমাধান খোঁজা হবে। তবে মনে রাখতে হয়—ওমানের মধ্যস্থতায় আলোচনার মাঝেই যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, সেই ইতিহাস এখনো সতর্ক করে দেয়, কূটনীতির পথ সবসময়ই সরল নয়।
এই সংঘাতের কেন্দ্রে এখন পারমাণবিক কর্মসূচির চেয়েও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে হরমুজ প্রণালি—মাত্র ২২ মাইল প্রশস্ত একটি জলপথ, অথচ বিশ্ব অর্থনীতির শিরায় রক্তস্রোতের মতো প্রবাহিত জ্বালানি সরবরাহের মূল সেতু। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরানের পাল্টা পদক্ষেপে এই প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের বাজারে নেমে আসে অস্থিরতা।
অস্ত্রবিরতির শর্তে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে সম্মত হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। একইসঙ্গে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। তবে এই সমঝোতা যেন এক সূক্ষ্ম সুতোয় বাঁধা—যেখানে যেকোনো সময় ছিঁড়ে যেতে পারে আস্থার বন্ধন।
ইরান ইতোমধ্যে একটি ১০ দফা পরিকল্পনা দিয়েছে, যাকে ট্রাম্প ‘কার্যকর’ বললেও বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। তেহরানের দাবি—হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই থাকবে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চলবে, এবং সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন আগে থেকেই এসব শর্তকে ‘অসম্ভব’ বলে এসেছে।
এখানেই শেষ নয়—মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, জব্দকৃত সম্পদ ফেরত দেওয়া, এবং ইরানের মিত্রদের ওপর হামলা বন্ধ করার মতো দাবিগুলো এই আলোচনাকে আরও কঠিন করে তুলেছে। যেন প্রতিটি দাবি একেকটি কঠিন প্রাচীর, যার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে আপোষের সম্ভাবনা।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে ইসরায়েলের অবস্থান। তারা স্পষ্ট জানিয়েছে, লেবানন এই যুদ্ধবিরতির আওতায় পড়বে না। ফলে হিজবুল্লাহকে ঘিরে চলমান সংঘাত থামার কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। একদিকে শান্তির আহ্বান, অন্যদিকে যুদ্ধের ধ্বনি—দুটি বিপরীত সুরে বাজছে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান বাস্তবতা।
ইসলামাবাদের বৈঠককে সামনে রেখে বিশ্ব তাকিয়ে আছে—এটি কি সত্যিই একটি চূড়ান্ত চুক্তির পথ খুলবে, নাকি আবারও নতুন করে উত্তেজনার সূচনা হবে? কারণ, যুক্তরাষ্ট্র এখনো এই আলোচনায় অংশগ্রহণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।
হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ঘোষণায় তেলের দাম কিছুটা কমেছে, আমদানিনির্ভর দেশগুলো পেয়েছে সাময়িক স্বস্তি। কিন্তু এই স্বস্তি কতদিনের—তা নির্ভর করছে কূটনৈতিক টেবিলে নেওয়া সিদ্ধান্তের ওপর।
সবশেষে একটাই প্রশ্ন থেকে যায়—এই যুদ্ধ কি সত্যিই শেষের পথে, নাকি এটি কেবল একটি বিরতি, যেখানে ভালোবাসার মতো শান্তির আকাঙ্ক্ষা আর ক্ষমতার নির্মম বাস্তবতা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে?
সময়ের উত্তরে লুকিয়ে আছে সেই সত্য।
