রোববার দুপুরে নেতাকর্মীদের নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেন পরাজিত বিএনপি প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসা। ছবি: সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে উত্তরের জনপদ রংপুর। বিশেষ করে রংপুর-৪ (পীরগাছা-কাউনিয়া) আসনের নির্বাচনী ফলাফল এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে পরাজিত প্রার্থীর ক্ষোভ এক নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
রোববার দুপুরে নেতাকর্মীদের নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেন পরাজিত বিএনপি প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসা। নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি এক চরম অনাস্থা প্রকাশ করে তিনি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসানকে অভিশাপ দেন।
অভিযোগ জানাতে গিয়ে এমদাদুল হক ভরসা জেলা প্রশাসককে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আমার অভিশাপ থাকল। আল্লাহ আপনার বিচার করবে। আমার বউ-বাচ্চাকে কাঁদিয়ে, আমাকে কাঁদিয়ে আমার ভোট ছিনতাই করেছেন। আপনার ছেলেমেয়েও রাস্তায় রাস্তায় কান্না করবে।’ যদিও সেই সময় জেলা প্রশাসককে অনেকটা নিশ্চুপ থাকতে দেখা গেছে। এই আবেগঘন ও নাটকীয় মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে এবং নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়।
রংপুর-৩, রংপুর-৪ ও রংপুর-৬ আসনে পুনরায় ভোট গণনার দাবিতে সকাল থেকেই জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন বিএনপি প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকসহ সাধারণ ভোটাররা। বিক্ষোভকারীরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে ‘ভোট চোর’ স্লোগান দেন এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।রংপুর-৪ আসনের পরাজিত প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসা অভিযোগ করেন, ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর মাধ্যমে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী আখতার হোসেনকে বিজয়ী করা হয়েছে। তাঁর দাবি, ভোটের দিন বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত প্রতিপক্ষ প্রার্থী মব সৃষ্টি করে প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় ফলাফল নিজের পক্ষে নিয়েছেন।
উল্লেখ্য, এ আসনে এনসিপির আখতার হোসেন ১ লাখ ৪৯ হাজার ৯৬৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। এমদাদুল হক ভরসা পেয়েছেন ১ লাখ ৪০ হাজার ৫৬৪ ভোট। জয়ের খুব কাছাকাছি থাকা সত্ত্বেও এই পরাজয়কে তিনি মেনে নিতে পারছেন না।
একই সুর শোনা গেছে রংপুর-৩ ও রংপুর-৬ আসনের প্রার্থীদের কণ্ঠে। রংপুর-৩ (সদর) আসনের প্রার্থী সামসুজ্জামান সামু জানান, তারা নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় আন্দোলন শুরু করেছেন এবং ভোট পুনর্গণনার দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ ছাড়বেন না। এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ১ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন, যেখানে সামসুজ্জামান সামু পেয়েছেন ৮৪ হাজার ৫৭৮ ভোট।
রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনের বিএনপি প্রার্থী সাইফুল ইসলাম এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলেছেন। তিনি জানান, তাঁর আসনে ৫ হাজার ৪৫২টি ভোট বাতিল করা হয়েছে, যার বেশির ভাগ ছিল ধানের শীষ প্রতীকের। এই বাতিল হওয়া ভোটগুলোতে নির্বাচন কমিশন নির্ধারিত সিলের পরিবর্তে রহস্যজনক ‘গোল সিল’ পাওয়া গেছে। তার দাবি, পুনরায় ভোট গণনা করা হলে এই রহস্যময় সিল কোথা থেকে এলো এবং কীভাবে ভোট কক্ষে সরবরাহ করা হলো, তার রহস্য উন্মোচিত হবে। এ আসনে জামায়াত প্রার্থীর সঙ্গে তাঁর ভোটের ব্যবধান মাত্র ২ হাজার ৪২৫।নির্বাচনী মাঠের এই উত্তাপ ও বিক্ষোভের মুখে রংপুরের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ এনামুল আহসান জানিয়েছেন, তিনটি আসনের প্রার্থীদের পক্ষ থেকেই তিনি লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী অভিযোগগুলো নির্বাচন কমিশনের কাছে পরবর্তী নির্দেশনার জন্য পাঠানো হয়েছে।
তবে প্রশাসনের এই আশ্বাসেও বিক্ষোভকারীরা শান্ত হননি। তাদের দাবি, ভোটের দিন যে অনিয়ম হয়েছে, তার প্রতিকার না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। বিশেষ করে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রার্থীদের এই সরাসরি বাগ্বিতণ্ডা এবং অভিশাপ দেওয়ার ঘটনা আগামীর নির্বাচনী সংস্কৃতির জন্য এক অশনিসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রংপুর-৪ আসনের ঘটনাটি প্রমাণ করে, ফলাফল ঘোষণা হয়ে গেলেও মানুষের মনে জমে থাকা ক্ষোভ এবং আইনি লড়াইয়ের আবেদনগুলো জনমনে এক ধরনের অস্থিরতা বজায় রাখছে। প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপরেই নির্ভর করছে এই উত্তাল পরিস্থিতির সমাধান।
