হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটির নথি উল্টাতেই বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য। শেখ মুজিব হত্যা মামলার বিচারকার্যে মৃত্যুদণ্ড প্রদানকারী তৎকালীন ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুলের তিন মেয়ে—কাজী নিশাত রসুল, কাজী নাহিদ রসুল ও কাজী তুহিন রসুল—পূর্বাচল নতুন শহর আবাসিক প্রকল্পে সংরক্ষিত কোটায় ৫ কাঠা করে মোট ১৫ কাঠা প্লট পেয়েছেন।
প্রশ্ন উঠেছে—কোন ‘অসাধারণ অবদানের’ ভিত্তিতে?
সংরক্ষিত কোটার বিধান বনাম বাস্তবতা- গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং রাজউকের নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০০৯ সালের প্লট বরাদ্দ পদ্ধতি অনুযায়ী সংরক্ষিত কোটায় প্লট পেতে হলে প্রজাতন্ত্র বা জাতীয় ক্ষেত্রে ‘উল্লেখযোগ্য/অসাধারণ অবদান’ থাকতে হবে। পাশাপাশি, সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞপ্তির সময় আবেদন না করা ব্যক্তি হতে হবে।
কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে—
“জাতীয় পর্যায়ে কোন অবদানের জন্য সংরক্ষিত কোটায় ৫ কাঠা আয়তনের প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে তা মন্ত্রণালয়ের পত্রে বা নথিতে উল্লেখ নেই।
অর্থাৎ, বিধির ১৩/এ ধারার যে শর্তাবলি—তা অনুসরণ করা হয়নি বলেই প্রতীয়মান।
বোর্ড সভা ও প্রশাসনিক আদেশের ছায়া-
কাজী তুহিন রসুলের ক্ষেত্রে তদন্তে উঠে এসেছে আরও স্পষ্ট তথ্য। তিনি পূর্বাচল প্রকল্পে প্লটের জন্য নির্ধারিত সময়ে আবেদনই করেননি। তবুও ২০১১ সালের ৪৮০ নং স্মারক জারির পর রাজউকের ০৭/২০১১ তম বোর্ড সভায় তার নামে ৫ কাঠা প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়।
একইভাবে তার দুই বোন— নিশাত রসুল (প্লট আইডি: ১১-৪০৯-০০৩) ও নাহিদ রসুল (প্লট আইডি: ৭১০-১০৭এ-০০৭) প্রত্যেকেই ৫ কাঠা করে প্লট পেয়েছেন সংরক্ষিত কোটায়। তদন্ত কমিটির ভাষ্য— দলীয় কর্মকর্তা বিবেচনায় তাদের কে সংরক্ষিত কোটায় প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
৬০০ প্লটের জায়গায় ৯৪২: কীভাবে?
২০০৯ সালে পূর্বাচল প্রকল্পে মোট ৬০০০ প্লটের মধ্যে ১০% অর্থাৎ ৬০০টি প্লট সংরক্ষিত রাখার বিধান ছিল। কিন্তু তদন্তে দেখা গেছে, বাস্তবে সংরক্ষিত কোটায় বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৯৪২টি প্লট—অর্থাৎ বিধির চেয়ে ৩৪২টি বেশি। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও বিচারপতিদের বাইরে অসংখ্য ব্যক্তি এই কোটায় প্লট পেয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন— বিশেষ রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী (দেশি ও প্রবাসী) বিশেষ শ্রেণির সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়াঙ্গনের ব্যক্তিত্ব, প্রভাবশালী আমলা ও তাদের আত্মীয়স্বজন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, গণভবন ও বঙ্গভবনে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী (২০০৯–২০২৪)। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জাতীয় অবদানের কোনো লিখিত উল্লেখ নেই।
বিধি ভেঙে ‘সংশোধিত’ সুযোগ- পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের ২০০৯ ও ২০১১ সালের সংশোধিত বরাদ্দ পদ্ধতি পর্যালোচনায় তদন্ত কমিটি দেখতে পেয়েছে—যাদের বা তাদের পরিবারের নামে রাজউক বা অন্য সরকারি সংস্থার আবাসিক সম্পত্তি ছিল, তাদেরও সংশোধিত বিধির ফাঁক গলে প্লট দেয়া হয়েছে।
এটিকে তদন্ত প্রতিবেদনে অনিয়ম সংগঠনের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটি: কারা, কীভাবে হাইকোর্টের নির্দেশে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্লট বরাদ্দের অনিয়ম খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। প্রশাসনের সাবেক গ্রেড-১ কর্মকর্তা মহ: মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে এই কমিটি সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা করে একাধিক অসঙ্গতি চিহ্নিত করেছে।
প্রশ্ন থেকেই যায়- কাজী গোলাম রসুলের বিচারিক দায়িত্ব পালনের সঙ্গে তার কন্যাদের প্লট বরাদ্দের কী সম্পর্ক?
‘অসাধারণ অবদান’ কোথায়?
‘কেন নথিতে তার উল্লেখ নেই?
এবং কেন সংরক্ষিত কোটার সীমা অতিক্রম করে অতিরিক্ত শত শত প্লট বরাদ্দ দেয়া হলো?
তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য ইঙ্গিত করছে—সংরক্ষিত কোটার আড়ালে গড়ে উঠেছিল একটি প্রভাব-রাজনীতি নির্ভর বরাদ্দ সংস্কৃতি, যেখানে বিধি ছিল কাগজে, আর বাস্তবতা ছিল সুপারিশ ও ক্ষমতার ছায়ায়।
এখন দেখার বিষয়—প্রকাশিত এই অনুসন্ধানী তথ্যের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে কী প্রশাসনিক বা আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হয়।
