সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়, মিষ্টি কথায় ঘনিষ্ঠতা—তারপর নির্জন বাসায় ডেকে নিয়ে মারধর, আপত্তিকর ছবি তুলে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায়। এমনই এক সংঘবদ্ধ প্রতারণা চক্রের দুই নারীসহ ১২ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্র ধরে তুলিয়া আক্তার সুমি নামের এক তরুণী এক ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন। কয়েকদিনের আলাপচারিতার পর দেখা করার প্রস্তাব দেন তিনি। নির্ধারিত দিন রাজধানীর ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার হোসেন প্লাজার সামনে তাদের দেখা হয়। সেখান থেকে কৌশলে ওই ব্যক্তিকে বাসায় নিয়ে যান সুমি। বাসায় ঢুকতেই অপেক্ষায় থাকা কয়েকজন যুবক তাকে এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করে। পরে ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করে চক্রের সদস্যরা।
এ ঘটনায় গ্রেপ্তাররা হলেন— তুলিয়া আক্তার সুমি, দুলালী ওরফে মীম, ওমর ফারুক, শফিকুল ইসলাম শান্ত, সজল তালুকদার, মো. ইয়াছিন, নাছির খান, সাদ্দাম, মেহেদী হাসান শাহরিয়া, আজিজুল হাকিম টুটুল, কামরুল ইসলাম ও মো. রাব্বি। গত রোববার ও সোমবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। যাত্রাবাড়ী থানা সূত্রে জানা যায়, গত ১১ জানুয়ারি ভোরে সায়েদাবাদ জনপদ মোড় এলাকা থেকে চক্রের সদস্যরা দুই ব্যক্তিকে অপহরণ করে। পরে তাদের মাতুয়াইল কবরস্থান রোডের একটি বাসায় আটকে রেখে মারধর করা হয়। ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে অজ্ঞাতনামা দুই নারীর সঙ্গে তাদের আপত্তিকর ছবি তুলে রাখা হয়। এরপর শুরু হয় চাঁদাবাজি— দাবি করা হয় ১০ লাখ টাকা। টাকা না দিলে সেই ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
নিরুপায় ভুক্তভোগীরা মানিব্যাগে থাকা ৪৮ হাজার টাকা, দুই ভরি রুপার চেইন, একটি হিরার আংটি এবং বিকাশ, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে এটিএম বুথ থেকে তোলা ৫ লাখ ৩১ হাজার ৫০০ টাকা তুলে দিতে বাধ্য হন। পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ১৩ জানুয়ারি যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা হয়।
অন্য এক ঘটনায় একই চক্রের ফাঁদে পড়েন আরও এক ব্যক্তি। ফেসবুকে পরিচয়ের পর গত ১৫ ডিসেম্বর তিনি ডেমরায় যান সুমির সঙ্গে দেখা করতে। সেখানে তাকে মারধর করে আট লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকার করলে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। পরে তিনি সঙ্গে থাকা ৪৮ হাজার ৫০০ টাকা, এক ভরি ওজনের স্বর্ণের দুটি আংটি এবং পরিবারের কাছ থেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আনা ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৫০০ টাকা দিতে বাধ্য হন। এরপর নানা ভয়ভীতি দেখিয়ে তাকে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ১৩ জানুয়ারি ডেমরা থানা-য় মামলা করেন ভুক্তভোগী।
পুলিশ জানায়, পৃথক দুটি ঘটনার তদন্তে বেরিয়ে আসে একই চক্রের সংশ্লিষ্টতা। গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তায় যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা থানার একাধিক টিম ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টার্গেট নির্ধারণ করে প্রথমে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে। পরে কৌশলে নির্জন স্থানে ডেকে নিয়ে ভয় দেখিয়ে নগদ অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী হাতিয়ে নেয়। রাজধানীতে প্রযুক্তিনির্ভর এই ‘প্রেমের ফাঁদ’ চক্রের এমন কৌশলী প্রতারণা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, চক্রটির আরও সদস্য আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
