মুজিব কোট থেকে জিন্নাহ টুপির যাত্রায় আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রে গণপূর্তের এই কর্মকর্তা**
উপরে থাকা ছবিতে দেখা যায়—আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন অন্তরঙ্গ ভঙ্গিমায় ‘আওয়ামী লীগ মাস্ক’ পরিহিত শহীদুল আলমসহ আরেকজন সাংসদ। ছবিগুলো দেখে বোঝার উপায় নেই, কে সরকারি কর্মকর্তা আর কে রাজনীতিক। স্বাভাবিকভাবেই অনেকে মনে করবেন, দলের লোগো ও নৌকা প্রতীকযুক্ত মাস্ক পরা ব্যক্তি নিশ্চয়ই রাজনীতিবিদ। কিন্তু বাস্তবতা উল্টো—তিনি আসলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের তৎকালীন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সংস্থাপন ও সমন্বয়) শহীদুল আলম।
সরকারি কর্মকর্তাদের দলীয় প্রতীকে মাস্ক পরার বাধ্যবাধকতা না থাকা সত্ত্বেও তিনি কেন এমন করলেন—এ প্রশ্ন থেকেই বিতর্কের সূত্রপাত। সমালোচকদের ভাষ্য, শহীদুল আওয়ামী লীগ শাসনামলে প্রভাব, বদলি–নিয়োগ, বাসা বরাদ্দ ও থোক বরাদ্দ নিয়ন্ত্রণ করে ২০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার অস্বচ্ছ লেনদেনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, অথচ সব শাস্তি এড়িয়ে নির্বিঘ্নে চাকরি চালিয়ে গেছেন।
দশ বছর লিয়েন, ছাত্রলীগ ক্যাডার দিয়ে শহরজুড়ে ‘সেটআপ’, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ।
ফ্যাসিবাদী শাসন নামে পরিচিত সময়টিতে শহীদুল আলম নিয়ম বহির্ভূতভাবে দশ বছর লিয়েন ভোগ, বদলি–নিয়োগ বাণিজ্য, এপিপি ও থোক বরাদ্দ বাণিজ্য, বেনামে ঠিকাদারি, সরকারি সম্পত্তি দখল থেকে শুরু করে অর্থপাচারের মতো নানা সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। সাবেক সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকার এবং পরবর্তী সচিব কাজী ওয়াসী উদ্দিনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে তিনি দপ্তরের নানান সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করেছেন।
এ সময় তিনি সাবেক ছাত্রলীগ কর্মীদের নিয়ে একটি নিজস্ব নেটওয়ার্ক গঠন করেন, যারা ঢাকায় নির্বাহী প্রকৌশলী পদে টিকে থাকতে চাইলে শহীদের ‘আশীর্বাদ’ ছাড়া উপায় ছিল না। অভিযোগ আছে—এই প্রকৌশলীরা শহীদের জন্য কোটি কোটি টাকার ‘তহবিল’ পরিচালনা করতেন এবং বিনিময়ে পেতেন সীমাহীন সুযোগ–সুবিধা। বিগত সরকার পতনের পর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও পেশাজীবী সংগঠনের চাপের মুখে প্রশাসন ঢাকার কয়েকজন ফ্যাসিবাদী আচরণের কর্মকর্তা চিহ্নিত করতে বাধ্য হয়। কিন্তু বদলি আদেশ কার্যকর হলেও কিছু কর্মকর্তা মাসের পর মাস দায়িত্বে বহাল থেকে ওটিএমের নামে কোটি কোটি টাকার কাজ বণ্টন করেছেন—যার পেছনে শহীদের প্রত্যক্ষ ভূমিকার অভিযোগ রয়েছে।
মুস্তাফিজুর রহমান: ছাত্রলীগ ইতিহাস, ‘র’–এর প্রশিক্ষণ ও শহীদের পছন্দের ‘স্ট্রাইকার’। বুয়েটের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মুস্তাফিজুর রহমানকে শহীদুল আলম নিজের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগী (‘স্ট্রাইকার’) হিসেবে বেছে নেন। অভিযোগ আছে, তিনি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’–এর সহায়তা নিয়ে চাকরির শুরু থেকেই বিশেষ পোস্টিং জোগাড় করতেন। রক্ষণাবেক্ষণ গণপূর্ত বিভাগে থাকা অবস্থায় তিনি শতভাগ ওটিএম করেন—যা নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন। এসব কাজ অনুমোদন করতেন শহীদুল আলম নিজেই।
২০২২–২৩ ও ২০২৩–২৪ অর্থবছরে রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগে ১১৬টি কাজ ওটিএম পদ্ধতিতে করা হয়—যার একটিরও অনুমোদন শহীদের বাইরে ছিল না। এপিপির সীমা অতিক্রম করে কাজ বরাদ্দ দেওয়া, বকেয়া সৃষ্টি এবং নীতিমালা লঙ্ঘনের প্রতিটি ঘটনায় শহীদের দায় রয়েছে বলে অভিযোগ।
৪০০ কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য: ফল প্রকাশ বন্ধ, খাম গায়েব—বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু শহীদ। ২০২৩ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ১৬৯টি পদের নিয়োগ পরীক্ষার ফল রহস্যজনকভাবে আটকে যায়। মৌখিক পরীক্ষার ফলসম্বলিত ১৫টি সিলগালা খামের একটি ‘গায়েব’ হওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসে। খামগুলো শহীদুল আলমের কক্ষে তালাবদ্ধ অবস্থায় সংরক্ষিত থাকায় স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ পড়ে তার ওপর। বিষয়টি ধামাচাপা দিতে নানান চেষ্টা করা হয়, গণমাধ্যম ম্যানেজে কয়েক কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলেও অভিযোগ আছে।
এ ঘটনায় তৎকালীন মন্ত্রী তদন্তের আশ্বাস দিলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। একই বছরের ডিসেম্বরের নিয়োগ পরীক্ষায়ও শহীদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে উচ্চ নম্বর পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। নির্বাচনের আগের সপ্তাহে পরীক্ষা নেওয়ায় বহু পরীক্ষার্থী অংশ নিতে পারেনি—এ বিষয়েও সচেতনভাবে অনিয়ম ঘটানোর অভিযোগ রয়েছে।
শহীদের প্রভাব, বদলি–বাণিজ্য এবং বরিশাল–নোয়াখালী–ঢাকা জুড়ে ক্ষমতার বিস্তার। পদোন্নতির পর শহীদুল আলম প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারের আস্থাভাজন হয়ে সংস্থাপন ও সমন্বয় উইং পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করেন—যেখানে বদলি–পদায়নই মূল ক্ষমতার উৎস। অভিযোগ আছে, তিনি কার্যত ডি–ফ্যাক্টো প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেছেন।
বরিশালের পরিত্যক্ত সম্পত্তি নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে তিনি একাধিক সফর করেছেন, স্থানীয় আইনজীবী ও বিচারিক কর্মকর্তাদের উপঢৌকন দেওয়ার অভিযোগও আছে। নির্বাহী প্রকৌশলী অলিভারকে ‘অনমনীয়তার’ কারণে বদলি করে সেখানে আনেন ক্ষমতাধর কামরুলকে—যিনি নাকি পোস্টিং পেতে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়েছেন।
নাসির উদ্দিন ও অন্যান্য প্রকৌশলীদের নিয়ে ‘বিশেষ দল’, ওটিএম–এ দায়মুক্তি ও বরাদ্দ বাড়ানোর অভিযোগ।নাসির উদ্দিনের মতো বিতর্কিত প্রকৌশলীরা শহীদের ঘনিষ্ঠ তালিকায় ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে নিম্নমানের কাজ, সরকারি অর্থ অপচয়, ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়া, এমনকি সরকারি কোয়ার্টারে মাছ চুরির মতো হাস্যকর অভিযোগও রয়েছে—যা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তবুও তারা দায়িত্বে বহাল থেকেছেন কারণ, অভিযোগ আছে—বছরে কয়েক কোটি ‘বখরা’ দিলেই শহীদের কাছে দায়মুক্তি নিশ্চিত।
দুই দফা লিয়েন, দ্বৈত বেতন, তদন্ত গায়েব—পেছনে রাজনৈতিক ছায়া? শহীদুল আলম একসময় এডিবি–তে লিয়েনে থাকলেও অভিযোগ আছে—তিনি দুই জায়গা থেকেই বেতন তুলতেন। এ নিয়ে তদন্তে বিদেশি সংস্থাও তথ্য চেয়েছিল। তবে প্রভাবশালী আমলাদের ছত্রছায়ায় তদন্ত ধামাচাপা পড়ে যায়। তার বিরুদ্ধে চাকরি অযোগ্যতার একাধিক অভিযোগ থাকলেও পদোন্নতি থামেনি—বরং দায়িত্ব বেড়েছে।
সমাপনী কথা : শহীদুল আলমকে ঘিরে অভিযোগের পাহাড়—দলীয় ঘনিষ্ঠতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, বদলি–নিয়োগ বাণিজ্য, আর্থিক অনিয়ম ও প্রভাব বিস্তারের গল্পে পরিপূর্ণ। মুজিব কোট থেকে জিন্নাহ টুপি—তার প্রতিটি রূপান্তর সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ক্ষমতার বলয়ে দীর্ঘদিন অবস্থান করে তিনি যে নানামুখী প্রভাব গড়ে তুলেছিলেন, ফ্যাসিবাদ–পরবর্তী সময়ের অনুসন্ধানেই সেসব ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছে।
