সোমবার, ৫ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

স্বৈরাচার হটাতে যতটা সফল, গণতন্ত্র গড়তে ততটাই ব্যর্থ: মাহফুজ আনাম

নিজস্ব প্রতিবেদক
অক্টোবর ৪, ২০২৬ ১১:০১ অপরাহ্ণ
Link Copied!

‘রাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত রাজনীতিকরণ’; শাসনব্যবস্থাকে কার্যকর করতে প্রযুক্তি ও সুশাসনের ওপর জোর। বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর দ্বিতীয় দিনে বক্তব্য দেন দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম। ছবি: সংগৃহীত

স্বৈরাচার উৎখাতে বাংলাদেশের মানুষের প্রায় ঈর্ষণীয় সক্ষমতা থাকলেও স্বৈরাচারের পতনের পর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং কার্যকর শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় দেশ বারবার ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম।

তাঁর মতে, এ ব্যর্থতার অন্যতম প্রধান কারণ রাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত রাজনীতিকরণ।

রোববার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর দ্বিতীয় দিনে ‘আমরা কি জানি কীভাবে শাসন পরিচালনা করতে হয়?’ শীর্ষক পর্বে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।

মাহফুজ আনাম বলেন, ‘স্বৈরাচারকে উৎখাত করার ক্ষেত্রে আমাদের প্রায় ঈর্ষণীয় সক্ষমতা আছে। তবে স্বৈরাচার উৎখাত করার ক্ষেত্রে আমরা যতটা ভালো, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা ততটাই খারাপ।

স্বৈরাচারের পতনের পর ভেঙে যায় ঐক্য

স্বৈরাচার উৎখাতের পর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে কেন বারবার ব্যর্থতা এসেছে, তার ব্যাখ্যাও দেন মাহফুজ আনাম।

তিনি বলেন, স্বৈরাচার উৎখাতের সময় জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়। কিন্তু স্বৈরাচারের পতনের পর সেই ঐক্য আর ধরে রাখা যায় না। যে গোষ্ঠীগুলো একসঙ্গে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়েছিল, পরবর্তী সময়ে তারাই একে অপরের প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে। এখান থেকেই গণতান্ত্রিক কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ব্যর্থতার শুরু।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, অত্যন্ত নিষ্ঠুর সামরিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের জন্ম। পরে গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটাতে ব্যর্থতার পর সামরিক অভ্যুত্থান হয়।

এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ আবার গণতন্ত্রের পথে ফিরে আসে। তখন আশা করা হয়েছিল, এর মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে একাধিক সুষ্ঠু নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পরিবর্তে দেশ ক্রমেই সংঘাত ও ধ্বংসের দিকে এগিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

‘আমরা জানি না কীভাবে দেশ পরিচালনা করতে হয়’

এই ব্যর্থতার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মাহফুজ আনাম বলেন, ‘আমরা সত্যিই জানি না কীভাবে একটি দেশ পরিচালনা করতে হয়, আমরা আসলে জানি না শাসনব্যবস্থা কী। আমরা জানি না, কীভাবে মানুষের সব শক্তি, উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও সহনশীলতাকে একত্র করে সেই সম্পদকে জাতীয় উন্নয়নে রূপান্তর করতে হয়।

তাঁর মতে, এর পেছনে অন্যতম কারণ অতিরিক্ত রাজনীতিকরণ। রাজনৈতিক পরিচয় ও সমর্থনের ভিত্তিতে চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। সাংবাদিকতাও এ প্রবণতার বাইরে নয়।

অথচ সাংবাদিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো বিশ্বাসযোগ্যতা—উল্লেখ করে মাহফুজ আনাম প্রশ্ন রাখেন, ‘যে পেশায় বিশ্বাসযোগ্যতাই আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ, সেখানে আপনি কীভাবে প্রকাশ্যে কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ নেবেন এবং একই সঙ্গে আশা করবেন যে আপনার বিশ্বাসযোগ্যতা অক্ষুণ্ণ থাকবে?

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানেও রাজনৈতিক প্রভাবের সমালোচনা

শুধু পেশাজীবীদের মধ্যেই নয়, রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সমালোচনা করেন মাহফুজ আনাম।

তাঁর মতে, আমলাতন্ত্র, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন ও তথ্য অধিকার কমিশনের মতো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানও এর বাইরে থাকেনি। অতিরিক্ত রাজনীতিকরণের ফলে এভাবে প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা ক্ষয়ে গেছে।

মাহফুজ আনাম বলেন, কোনো রাজনৈতিক দল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হলে তা জনগণের ইচ্ছার প্রকাশ। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সেই নির্বাচনী ফল জনস্বার্থে রূপ নেওয়ার পরিবর্তে রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হয়।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো সরকারব্যবস্থাকে নিজের দলের সম্প্রসারণে পরিণত করার প্রক্রিয়া থেকেই পতনের শুরু। এর ফল হিসেবে দেখা দেয় দুর্নীতি, দলীয় পক্ষপাত, স্বজনপ্রীতি ও আনুকূল্য। এভাবে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর পুরো শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।

শাসনব্যবস্থায় প্রযুক্তির গুরুত্ব

কার্যকর শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রযুক্তির গুরুত্বও তুলে ধরেন মাহফুজ আনাম। তিনি বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির যুগে শাসন এখন একটি বিজ্ঞান। প্রযুক্তি দক্ষ আমলাতন্ত্রের পাশাপাশি দক্ষ ও ন্যায়পরায়ণ পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, বিপুল জনসংখ্যা ও নানা প্রাকৃতিক চ্যালেঞ্জের কারণে বাংলাদেশ পরিচালনা সহজ নয়। তবে দেশের সম্ভাবনাও বিপুল।

প্রযুক্তি, শিক্ষা ও সুশাসনের মাধ্যমে দেশের মানবসম্পদকে মূল্যবান ও উৎপাদনশীল সম্পদে রূপান্তর করা গেলে সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।