এনবিআরের কর দাবি আদায়ে আর আইনি বাধা নেই। রায় পর্যালোচনা করে আপিল করবে গ্রামীণ কল্যাণ।ফাইল ছবি
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ কল্যাণকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকার বেশি আয়কর পরিশোধ করতে হবে। এ বিষয়ে হাইকোর্টের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায় সোমবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। রায়ে যত দ্রুত সম্ভব বকেয়া কর আদায়ের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এর ফলে গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে এনবিআরের দাবি করা কর আদায়ের ক্ষেত্রে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশজনিত আইনি বাধা আর থাকল না।
দুটি পৃথক মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ের একটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ১৫ এবং অন্যটির ৩২। বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের বিচারকদের স্বাক্ষরের পর রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়।
এর আগে গত ১০ সেপ্টেম্বর গ্রামীণ কল্যাণের করা পৃথক দুটি রিট আবেদন খারিজ করে দেন হাইকোর্ট। ফলে প্রতিষ্ঠানটির কাছে এনবিআরের দাবি করা কর আদায়ের বিষয়ে সরকারের অবস্থান বহাল থাকে।
কর পরিশোধে আইনগত বাধ্যবাধকতার কথা বললেন আদালত
পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪-এর ধারা ১২১এ(৪বি) অনুযায়ী, আবেদনকারী গ্রামীণ কল্যাণ যখন ধারা ৭৫(২)(ডি)(৩)-এর অধীনে রিট পিটিশনে উল্লেখিত করবর্ষগুলোর রিটার্ন দাখিল করেছিল, তখন আইনগতভাবেই ধারা ৭৪ অনুযায়ী কর পরিশোধে বাধ্য ছিল প্রতিষ্ঠানটি। গ্রামীণ টেলিকমের উৎসে কর পরিশোধকে নিজেদের কর পরিশোধ হিসেবে দেখানোর কোনো সুযোগ গ্রামীণ কল্যাণের ছিল না বলেও পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়।
রায়ে আরও বলা হয়, আয়কর অধ্যাদেশের ১৭৩ ধারা কর কমিশনারকে নিজ উদ্যোগে ভুল সংশোধনের ক্ষমতা দিয়েছে। পূর্ববর্তী আদেশ দেওয়ার ১৩ দিনের মধ্যে যথাযথ নোটিশ প্রদান এবং আবেদনকারীকে শুনানির সুযোগ দিয়ে কমিশনার সংশোধনী আদেশ দেন।
শুনানির সময় করদাতা প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি আলোচ্য করবর্ষগুলোর দাখিল করা আয়কর রিটার্নের বিপরীতে প্রদেয় কর পরিশোধের কোনো প্রমাণ দাখিল করতে পারেননি বলে পূর্ণাঙ্গ রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
বকেয়া কর আদায়ে ডিমান্ড নোটিশ জারির নির্দেশ
রায়ের শেষাংশে হাইকোর্ট বলেন, সংক্ষুব্ধ আদেশে এমন কোনো আইনগত ত্রুটি বা অবৈধতা নেই, যাতে আদালতের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়। এ কারণে রুল কোনো খরচ ছাড়াই খারিজ করা হয়েছে এবং আগে দেওয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
একই সঙ্গে রিট আবেদনকারীর কাছ থেকে বকেয়া কর আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় চাহিদা নোটিশ বা ডিমান্ড নোটিশ অবিলম্বে জারি করতে কর কমিশনারকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের মধ্য দিয়ে গ্রামীণ কল্যাণের বিরুদ্ধে এনবিআরের কর দাবির আইনগত ভিত্তি সম্পর্কে হাইকোর্টের বিস্তারিত অবস্থান স্পষ্ট হলো।
আপিল বিভাগেও বহাল ছিল হাইকোর্টের রায়
গত ১০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট রায় ঘোষণার পর তা স্থগিত চেয়ে ১৪ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগে আবেদন করে গ্রামীণ কল্যাণ। আবেদনের ওপর শুনানি শেষে আপিল বিভাগের বিচারপতি ফারাহ মাহবুবের চেম্বার আদালত হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন।
আদালতের আদেশে বলা হয়েছিল, পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত এ মামলায় কোনো হস্তক্ষেপ করা হবে না।
পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর গ্রামীণ কল্যাণের আইনজীবী ব্যারিস্টার খাজা তানভীর আহমেদ সমকালকে বলেন, রায়টি পূর্ণাঙ্গভাবে পর্যালোচনা করে আইন অনুযায়ী অতি দ্রুত হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল (সিপি) করা হবে।
পাঁচ করবর্ষের কর দাবি নিয়ে ২০১৭ সালে রিট
গ্রামীণ কল্যাণের চেয়ারম্যান ছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। পুনর্মূল্যায়নের পর ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ করবর্ষ পর্যন্ত পাঁচ বছরের আয়কর বাবদ প্রদেয় অর্থের দাবি নিয়ে ২০১৭ সালে হাইকোর্টে পৃথক দুটি রিট আবেদন করে প্রতিষ্ঠানটি। প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত এ বিষয়ে রুল জারি করেন। পরবর্তী সময়ে হাইকোর্টের নতুন বেঞ্চে শুনানি শেষে রুলগুলো খারিজ করে দেওয়া হয়।
এর আগে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে এনবিআরের দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা কর আদায়ের বিষয়ে হাইকোর্টের একটি রায় স্বতঃপ্রণোদিতভাবে প্রত্যাহার করা হয়। পরে মামলাটি নতুন একটি বেঞ্চে পাঠানো হয়। সেখানে শুনানি শেষে গ্রামীণ কল্যাণের রিট আবেদন খারিজ করে দেন আদালত।
এর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ওই কর আদায়ের বিষয়ে এনবিআরের অবস্থান বহাল থাকে। এবার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের ফলে কর দাবি, সংশোধনী আদেশ এবং বকেয়া অর্থ আদায়ের বিষয়ে হাইকোর্টের যুক্তি ও নির্দেশনা বিস্তারিতভাবে সামনে এল।
এদিকে, গ্রামীণ কল্যাণের আইনজীবী আপিলের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন। ফলে হাইকোর্টের রায়ের পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের দিকে এখন নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট মহলের।
