রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। গতকাল শুক্রবার ডিএনসিসি হাসপাতাল থেকে তোলা ছবি: সংগৃহীত
অসুস্থতার ছায়ায় ঢেকে যাচ্ছে শৈশব—উচ্চঝুঁকিতে পাঁচ জেলা, তিন সিটি; টিকাদানই এখন শেষ আশ্রয়।
দেশজুড়ে যেন নীরব এক দুঃস্বপ্নের বিস্তার। ছোট্ট শিশুদের হাসি থেমে যাচ্ছে, মায়ের বুক খালি হয়ে যাচ্ছে—হামের নির্মম থাবায় ইতোমধ্যেই শতাধিক প্রাণ নিভে গেছে।
গত ১৫ মার্চ থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ছুটেছে ৫ হাজার ৭৯২ শিশু। এই অসহায়দের মধ্যে ১০৩টি কোমল প্রাণ চিরতরে নিভে গেছে। তাদের মধ্যে ৯ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হয়েছে হামের জীবাণু—এক ভয়াবহ বাস্তবতার নির্মম সাক্ষ্য। শুধু গত ২৪ ঘণ্টাতেই নতুন করে ৯৪৭ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। আরও ৩টি মৃত্যু—সংখ্যাগুলো যেন প্রতিটি মুহূর্তে আরও ভারী হয়ে উঠছে।
উচ্চঝুঁকিতে দেশ: আতঙ্কের লাল মানচিত্র- সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে দেশের ৫৬ জেলায়। বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে— কক্সবাজার, বরগুনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা ও নাটোর। শহরও রক্ষা পাচ্ছে না—ঢাকা উত্তর, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশন এখন হটস্পট। জনসংখ্যার তুলনায় কক্সবাজারে রোগীর চাপ সবচেয়ে বেশি—একটি জেলার বুক যেন ভারী হয়ে উঠেছে শিশুদের কান্নায়।
বিভাগভিত্তিক চিত্র: সংখ্যার আড়ালে নিঃশব্দ কান্না
ঢাকা বিভাগে সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি—৩১৫ জন আক্রান্ত, হাসপাতালে ভর্তি ২,৩৯৪ শিশু। চট্টগ্রামে ১৯৯, বরিশালে ৭৬, ময়মনসিংহে ৪৪—প্রতিটি সংখ্যা যেন একটি করে পরিবারের ভাঙা স্বপ্নের গল্প।
টিকার আশায় নতুন লড়াই- অবশেষে আশার আলো—উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি টিকাদান শুরু হচ্ছে।৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের জন্য এই কর্মসূচি যেন জীবন বাঁচানোর শেষ সেতু। আবার ঢাকা উত্তরের পাঁচটি ওয়ার্ডে রোববার থেকে শুরু হচ্ছে টিকাদান—সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত চলবে এই লড়াই।
স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।পরিস্থিতির ভয়াবহতা এতই সব স্বাস্থ্যকর্মীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। হাম আর নিউমোনিয়ার যুগল আক্রমণে স্বাস্থ্যব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে এক কঠিন পরীক্ষার সামনে।
একেকটি মৃত্যু, একেকটি গল্পের মতো শোনাচ্ছে। তবে
গোপালগঞ্জের ১০ মাসের ছোট্ট তুবা—চোখে ছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন, অথচ হামের থাবায় তা থেমে গেল চিরতরে। রাজশাহীতে দুই সপ্তাহেই ৪৪ শিশুর মৃত্যু—হাসপাতালের শয্যা কম, কিন্তু অসহায়তার চাপ অসীম। এক বেডে একাধিক শিশু, বারান্দায় চিকিৎসা—যেন যুদ্ধক্ষেত্রের মতো দৃশ্য। একদিকে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা,আবার স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন— দ্রুত টিকাদান বাড়াতে হবে। আক্রান্তদের চিকিৎসা স্থানীয় পর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে। রোগীর আশপাশে নতুন সংক্রমণ খুঁজে বের করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা—কমিউনিটির সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এই যুদ্ধ জেতা অসম্ভব।
উল্লেখ্য যে, এটা শুধু একটি রোগের গল্প নয়—
এটা হারিয়ে যাওয়া শৈশবের গল্প, মায়ের অশ্রুর গল্প, একটি জাতির অস্থির সময়ের গল্প। হাম এখন আর সাধারণ অসুখ নয়—এটি হয়ে উঠেছে এক নীরব আতঙ্ক, যা থামাতে হলে এখনই সবাইকে একসঙ্গে লড়তে হবে।
