আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও একই সঙ্গে অনুষ্ঠিতব্য গণভোটকে ঘিরে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার নিয়ে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অবস্থান এখন প্রকাশ্যভাবে মুখোমুখি। একদিকে সরকার সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নামলেও, অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন কড়া নির্দেশনা দিয়ে জানিয়েছে—গণভোটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোনোভাবেই ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর পক্ষে প্রচার চালাতে পারবেন না। এ ধরনের কার্যক্রম দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
ইসির এই সিদ্ধান্তে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। ভোটের মাত্র ১২ দিন আগে এমন নির্দেশনা জারি হওয়ায় সরকারের কর্তাব্যক্তিরা বিষয়টিকে ‘আকস্মিক’ ও ‘অপ্রত্যাশিত’ হিসেবে দেখছেন।
ইসির কড়া বার্তা: প্রচার নয়, শুধু সচেতনতা— বৃহস্পতিবার সব রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পাঠানো চিঠিতে নির্বাচন কমিশন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি গণভোটে জনগণকে কেবল অবহিত ও সচেতন করতে পারবেন। কিন্তু ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
চিঠিতে বলা হয়, এ ধরনের প্রচার গণভোটের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে, যা গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ধারা ২১ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), ১৯৭২-এর ৮৬ ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এত দেরিতে কেন নির্দেশনা?
প্রচার শুরুর দীর্ঘ সময় পর কেন এমন চিঠি—এ প্রশ্নে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, বিষয়টি নজরে আসার পরই আমরা চিঠি দিয়েছি। এত দিন যা হয়েছে, তা নিয়ে নয়—এখন থেকে যেন আর কেউ প্রচারে না নামে, সেটাই নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, নির্দেশনার পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আর কোনো পক্ষের হয়ে প্রচারে জড়াবেন না।
মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন—- ইসির নিষেধাজ্ঞার বিপরীতে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে মত দিয়েছেন। সরকার গণভোটের প্রচারে ১৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, ব্যাংক-বীমা ও সরকারি স্থাপনায় ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ব্যানার, বিলবোর্ড ও ফেস্টুন টাঙানো হয়েছে।
তবে ইসি জানিয়েছে, আগে যারা প্রচারে যুক্ত ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে নতুন করে যেন কেউ প্রচারে না নামে—এটাই কমিশনের মূল উদ্দেশ্য।
প্রচারসামগ্রী অপসারণ নিয়ে ধোঁয়াশা—– ইসির চিঠিতে সরকারি দপ্তরে ইতোমধ্যে টাঙানো ব্যানার-বিলবোর্ড অপসারণের বিষয়ে কোনো নির্দেশনা নেই। এ প্রসঙ্গে ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ বলেন, এসব প্রচারসামগ্রী কে বা কারা স্থাপন করেছে, তা আমাদের জানা নেই। এমনও হতে পারে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা এনজিও এগুলো লাগিয়েছে। তিনি গণমাধ্যম কে জানান, এসব সরানো হবে কি না—সে সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট দপ্তরকেই নিতে হবে।
সরকারের অসন্তোষ ও পাল্টা ভাবনা—– সরকারের সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্তে ঊর্ধ্বতন মহল ক্ষুব্ধ। সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনা বা মতামত না নিয়েই ইসি নির্দেশনা জারি করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রয়োজনে যে আইনের বরাতে ইসি এই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তা সংশোধন করে নতুন অধ্যাদেশ জারির কথাও ভাবা হচ্ছে।
তবে তার আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে আলোচনায় বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
গণভোট সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, আমরা নির্বাচন কমিশনের চিঠি পেয়েছি। আইন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে বিস্তারিত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
উপদেষ্টারা প্রচার করতে পারবেন?
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার রহমানেল মাছউদ বলেন, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী নন। ফলে তারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাতে পারবেন। উপদেষ্টারা ব্যক্তিগত উদ্যোগে ও নিজস্ব অর্থ ব্যয় করে এ বিষয়ে কাজ করছেন—এটাই বাস্তবতা বলেন তিনি।
চার বিষয়ে গণভোট, এক প্রশ্ন—–
এবারের গণভোট অনুষ্ঠিত হবে চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে। তবে ভোটাররা একটি মাত্র প্রশ্নে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেবেন। বিষয়গুলো হলো—
* নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠন।
* দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ও ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠন।
* নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ জুলাই জাতীয় সনদের ৩০ দফা বাস্তবায়ন।
* জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার বাস্তবায়ন।
উল্লেখ্য গণভোট সামনে রেখে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের এই দ্বন্দ্ব নির্বাচন প্রক্রিয়াকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। নির্দেশনা কার্যকর হয় কি না, মাঠের বাস্তবতা কতটা বদলায় এবং সরকার–ইসি আলোচনার ফল কী হয়—সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।
