বুধবার, ২১শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

১১ নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস চক্রের নেপথ্যে খাদ্য নিয়ন্ত্রক হারুন অর রশিদ?

নিজস্ব প্রতিবেদক
অক্টোবর ২১, ২০২৬ ১১:০৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

প্রার্থীপ্রতি ১০ লাখ টাকার চুক্তি, সনদ ও ফাঁকা চেক জিম্মার অভিযোগ—তদন্তে উঠে আসছে আন্তমন্ত্রণালয় সিন্ডিকেটের চাঞ্চল্যকর তথ্য। ফাইল ছবি

সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, আগাম উত্তর সরবরাহ এবং প্রার্থীদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায়ের অভিযোগে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন সিরাজগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হারুন অর রশিদ। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় তদন্তের সূত্র ধরে অন্তত ১১টি সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সামনে এসেছে। এই চক্রের সঙ্গে হারুন অর রশিদের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ প্রকাশের পর তাঁর কর্মস্থলে অনুপস্থিতি ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার বিষয়টিও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই চক্রে একাধিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম উঠে এসেছে। প্রশ্নপত্র সংগ্রহ, উত্তর সরবরাহ, পরীক্ষার্থী বাছাই এবং অর্থের বিনিময়ে পরীক্ষায় সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে তদন্তের ফলাফল ও আদালতের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পরীক্ষা শুরুর আগমুহূর্তে স্থগিত, তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য

গত ১০ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ২৪২টি শূন্য পদের বিপরীতে সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগের এমসিকিউ বাছাই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এতে অংশ নেওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন ৩ লাখ ১৮ হাজার ৯৭৬ জন প্রার্থী। কিন্তু পরীক্ষা শুরুর কয়েক মিনিট আগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ।

এ ঘটনায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের করা মামলার তদন্তে নামে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। তদন্তের একপর্যায়ে চক্রটির সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথন এবং অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা প্রশ্নফাঁসের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য পান বলে জানা গেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অনুসন্ধানে শুধু যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষা নয়, আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ও উত্তর সরবরাহের অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, প্রতিরক্ষা অর্থসংক্রান্ত সংস্থা সিজিডিএফ, খাদ্য মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, নির্বাচন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড। সব মিলিয়ে অন্তত ১১টি নিয়োগ পরীক্ষাকে ঘিরে চক্রটির তৎপরতার অভিযোগ তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।

অফিসে শেষ উপস্থিতি ১৫ অক্টোবর, এরপর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন?

প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণের পর সিরাজগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হারুন অর রশিদের নাম সামনে আসে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সূত্রের দাবি, গত ১৫ অক্টোবর তিনি সর্বশেষ অফিসে উপস্থিত হন। এরপর থেকে তাঁর মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে তিনি আত্মগোপনে গেছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হলেও তাঁর বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

একজন বিসিএস কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এত বড় নিয়োগ জালিয়াতির চক্রে সম্পৃক্ততার অভিযোগ এবং তাঁর অনুপস্থিতির বিষয়টি প্রশাসনিক মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে আত্মগোপনের অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।

সিন্ডিকেটের কেন্দ্রে সুজিত গোপ, উঠে এসেছে একাধিক কর্মকর্তার নাম

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিসংখ্যান কর্মকর্তা সুজিত গোপকে ঘিরে প্রশ্নফাঁস চক্রটির সাংগঠনিক কাঠামো সম্পর্কে অনুসন্ধান চলছে। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মচারীদের সহযোগিতায় চক্রটি পরীক্ষার প্রশ্ন ও উত্তর সংগ্রহ এবং পরীক্ষার্থীদের কাছে সেগুলো পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করত।

মতিঝিল এলাকায় গোপন বুথ বা নির্দিষ্ট স্থানে পরীক্ষার্থীদের জড়ো করে উত্তর মুখস্থ করানোর অভিযোগও সামনে এসেছে। এ কাজে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, এনবিআর এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের কয়েকজন নিম্নপদস্থ কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতার কথা তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে বলা হয়েছে।

চক্রটির সঙ্গে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সহকারী পরিচালক সোহাগ ফকির এবং ৩৬তম বিসিএসের কর্মকর্তা হারুন অর রশিদের যোগাযোগ ও ভূমিকা নিয়েও তদন্ত চলছে বলে জানা গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে তাঁদের পারস্পরিক পরিচয় ও যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে পরীক্ষার্থী সংগ্রহ এবং প্রশ্নফাঁসের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে।

তবে এই পর্যায়ে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা, পারস্পরিক যোগাযোগ এবং অপরাধে সম্পৃক্ততার মাত্রা তদন্তের মাধ্যমে পৃথকভাবে যাচাই করা জরুরি।

প্রার্থীপ্রতি ১০ লাখ টাকা, জিম্মায় রাখার অভিযোগ সনদ ও ফাঁকা চেক

প্রশ্নফাঁস চক্রটির বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো, সরকারি চাকরিপ্রত্যাশীদের সঙ্গে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে চুক্তি করা হতো। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কোনো কোনো প্রার্থীর কাছ থেকে চাকরির পরীক্ষায় সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার চুক্তি করা হয়েছিল।

অভিযোগ অনুযায়ী, এসব চুক্তির ক্ষেত্রে প্রার্থীদের কাছ থেকে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর, মূল শিক্ষাগত সনদ কিংবা দুই থেকে তিন লাখ টাকার ফাঁকা ব্যাংক চেক জিম্মায় রাখা হতো। এর মাধ্যমে প্রার্থীদের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি এবং চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার সুযোগ সীমিত করার চেষ্টা করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

যদি এসব অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়, তবে তা শুধু নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম নয়, চাকরিপ্রত্যাশীদের সঙ্গে প্রতারণা এবং তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত নথি ও আর্থিক নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলার ঘটনাও হতে পারে। তবে কতজন প্রার্থীর কাছ থেকে এ ধরনের নথি বা চেক নেওয়া হয়েছে এবং সেগুলো বর্তমানে কার কাছে রয়েছে, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।

সরকারি নিয়োগে অনিয়ম, প্রশ্নের মুখে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা

সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা মেধা, যোগ্যতা ও সমান সুযোগের ভিত্তিতে সম্পন্ন হওয়ার কথা। সেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁস কিংবা অর্থের বিনিময়ে উত্তর সরবরাহের অভিযোগ উঠলে লাখো চাকরিপ্রার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় পড়ে। একই সঙ্গে নিয়োগব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী, তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অপরাধের ধরন ও প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না; তদন্ত, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।

এদিকে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, চক্রের সন্দেহভাজন সদস্যদের শনাক্ত করা এবং তাদের যোগাযোগের নেটওয়ার্ক উদ্‌ঘাটনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। হারুন অর রশিদ ও সুজিত গোপকে ঘিরে তদন্তের অগ্রগতি, তাঁদের অবস্থান এবং প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে আর কারা জড়িত—এসব বিষয় এখন অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

দ্রুত তদন্ত ও জিম্মায় থাকা নথি উদ্ধারের দাবি

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিতের ঘটনাটি সরকারি নিয়োগব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে অন্তত ১১টি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ সত্য হলে এর ব্যাপ্তি ও প্রভাব হবে অত্যন্ত গুরুতর।

সচেতন মহলের দাবি, তদন্তের মাধ্যমে প্রশ্নফাঁসের উৎস, অর্থ লেনদেনের পথ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা এবং ক্ষতিগ্রস্ত প্রার্থীদের শনাক্ত করতে হবে। কারও শিক্ষাগত সনদ বা ফাঁকা চেক জিম্মায় নেওয়া হয়ে থাকলে সেগুলো উদ্ধারের উদ্যোগও জরুরি। একই সঙ্গে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারি চাকরির নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও মেধার মূল্যায়ন ফিরিয়ে আনতে হলে এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং তদন্তের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশের বিকল্প নেই। অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের চক্রের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াই হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।