এক্সপ্লেইনার | ১৪ বছরের ভোগান্তি, তিন দফায় ব্যয় বৃদ্ধি, বিশেষ বাস সংগ্রহে ব্যর্থতা এবং শেষ মুহূর্তে প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত ঘিরে বড় প্রশ্ন। ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর বিআরটি প্রকল্পটি বাতিল করেছে সরকার।
* বিশ্বের ১৯১টি শহরে চালু বিআরটি; ২০০০ সালের পর বিশ্বে এ ব্যবস্থার বিস্তার বেড়েছে ৩৮৩ শতাংশ
* তিন দফায় ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা, প্রাথমিক ব্যয়ের তুলনায় বৃদ্ধি প্রায় ১০৯ শতাংশ
* ৯৭ শতাংশ অবকাঠামো নির্মাণের পর প্রকল্প বাতিল; স্টেশন ও লেন বিভাজক অপসারণে নতুন ব্যয়ের আশঙ্কা
* ১৪ বছর ধরে নির্মাণকাজের ধকল, যানজট ও পরিবহণ ব্যয়ে বিপর্যস্ত গাজীপুর-উত্তরা করিডোর
বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি)—দেশের অন্যতম বৃহৎ গণপরিবহণ অবকাঠামো প্রকল্প। যানজট এড়িয়ে দ্রুত, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী গণপরিবহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে ২০১২ সালে শুরু হয়েছিল গাজীপুর থেকে ঢাকার বিমানবন্দর পর্যন্ত এই প্রকল্প। পরিকল্পনা ছিল, মহাসড়কের মাঝখানে নির্দিষ্ট লেনে চলবে বিশেষ বাস। এতে যাত্রার সময় কমবে, সড়কের পরিবহণ সক্ষমতা বাড়বে, স্বস্তি ফিরবে গাজীপুরসহ আশপাশের এলাকার মানুষের চলাচলে।
কিন্তু যে প্রকল্পের কাজ ২০১৬ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল, সেটি ১৪ বছরেও যাত্রী পরিবহণের জন্য চালু করা যায়নি। নির্মাণকাজের দীর্ঘসূত্রতায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বেড়েছে যানজট, ভোগান্তি ও পরিবহণ ব্যয়। শেষ পর্যন্ত ৯৭ শতাংশ অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর গত ১৮ অক্টোবর প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিআরটি অবকাঠামো সরিয়ে করিডোরটিকে ছয় লেনের মহাসড়কে রূপান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে করিডোরে নির্মিত ২৫টি স্টেশন ও লেন বিভাজক অপসারণ করতে হবে। এ কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ কোটি টাকা। সড়ক প্রশস্ত করতে আরও ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে—মাত্র ৩ শতাংশ কাজ বাকি থাকতে কেন বাতিল করা হলো প্রকল্পটি? যে অবকাঠামো নির্মাণে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, তা সরিয়ে ফেলাই কি সবচেয়ে ভালো সমাধান? নাকি অব্যবহৃত অর্থ দিয়ে বাস কিনে প্রকল্পটি চালু করা সম্ভব ছিল? সরকারের এই সিদ্ধান্তে শেষ পর্যন্ত লাভ হবে, নাকি ক্ষতির বোঝা আরও বাড়বে?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিআরটির বিস্তার, এর সুবিধা-অসুবিধা, বাংলাদেশের প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ত্রুটি এবং বাতিলের সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করলে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সুযোগ তৈরি হয়।
বিআরটি কী, কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বিআরটি অর্থ বাস র্যাপিড ট্রানজিট—বাংলায় দ্রুতগতির গণপরিবহণ। এটি শুধু বাস চলাচলের জন্য আলাদা সড়ক বা অবকাঠামো নয়; বরং নির্দিষ্ট লেন, দ্রুত যাত্রী ওঠানামা, উন্নত বাস, সমন্বিত টিকিট ব্যবস্থা এবং পরিকল্পিত স্টেশন নিয়ে গড়ে ওঠা একটি গণপরিবহণব্যবস্থা।
নগর ও পরিবহণ পরিকল্পনাবিদদের কাছে বিআরটি দ্রুত বর্ধনশীল, ঘনবসতিপূর্ণ ও অপেক্ষাকৃত কম আয়ের শহরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প। এর উদ্দেশ্য কেবল যাতায়াতের গতি বাড়ানো নয়; নগরকেন্দ্র ও আশপাশের এলাকার ভূমি ব্যবহার, অর্থনীতি, পরিবেশ এবং মানুষের দৈনন্দিন চলাচলে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা।
বিআরটির যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৪ সালে ব্রাজিলের কুরিচিবা শহরে। এরপর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ব্যবস্থা ছড়িয়ে পড়ে। গ্লোবাল বিআরটি ডেটার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১৯১টি শহরে বিআরটি চালু রয়েছে। এসব ব্যবস্থায় প্রতিদিন প্রায় সোয়া তিন কোটি যাত্রী যাতায়াত করেন। ২০০০ সালের পর বিশ্বে বিআরটির বিস্তার বেড়েছে ৩৮৩ শতাংশ।
প্রতিবেশী ভারতে ১৩টি শহরে বিআরটি চালু রয়েছে। দেশটির ২২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এসব ব্যবস্থায় প্রতিদিন প্রায় পাঁচ লাখ যাত্রী চলাচল করেন। চীনে বিআরটিতে প্রতিদিন প্রায় ৪৪ লাখ এবং তাইওয়ানে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ যাত্রী চলাচল করেন।
বিআরটির বিস্তারের অন্যতম কারণ এর তুলনামূলক কম নির্মাণব্যয় ও দ্রুত বাস্তবায়নের সম্ভাবনা। মেট্রো রেলের তুলনায় কম অবকাঠামো নির্মাণ করেই বেশি যাত্রী পরিবহণের সুযোগ তৈরি করা যায়। ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা সম্প্রসারণের সুযোগও থাকে।
আধুনিক বিআরটির পাঁচ বৈশিষ্ট্য
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, আধুনিক বিআরটির প্রধান বৈশিষ্ট্য পাঁচটি—
১. বাসের জন্য নির্দিষ্ট লেন। ২. প্রিপেইড বা আগাম টিকিট ব্যবস্থায় যাত্রী ওঠানো। ৩. প্ল্যাটফর্মের সমতলে বাসে ওঠানামার সুবিধা। ৪. বেশি যাত্রী বহনে সক্ষম আর্টিকুলেটেড বা সংযুক্ত বাস। ৫. পরিবহণব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বিত ভূমি ব্যবহার ও নগর পরিকল্পনা।
বিআরটি ঘণ্টায় আনুমানিক ২০ থেকে ৩৫ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারে। এর যাত্রী ধারণক্ষমতা মেট্রো রেলের তুলনায় কম হলেও নির্মাণব্যয় অনেক কম। এ কারণেই উন্নত ও উন্নয়নশীল—উভয় ধরনের দেশে বিআরটি জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের একটি গবেষণায় চট্টগ্রামে বিআরটি প্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজশাহী, বগুড়া, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও নোয়াখালীসহ ছয়টি শহরে এ ব্যবস্থা এখনই দরকার এবং আরও ১৩টি শহরে অদূর ভবিষ্যতে প্রয়োজন হতে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। গবেষণাটি যখন করা হয়েছিল, তখন ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে বিআরটি প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় এ তিন শহরকে এর আওতায় রাখা হয়নি।
এমন প্রেক্ষাপটে দেশের প্রথম বিআরটি প্রকল্পের শেষ পর্যায়ে এসে বাতিলের সিদ্ধান্ত শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নয়, বাংলাদেশের নগর গণপরিবহণ পরিকল্পনার দিকনির্দেশনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
২০১২ সালে যে স্বপ্ন নিয়ে শুরু
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১২ সালে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এর মধ্যে ১৫ দশমিক ০৭ কিলোমিটার হওয়ার কথা ছিল সমতল সড়কপথ এবং বাকি অংশ উড়ালপথ। মহাসড়কের মাঝখানে পৃথক লেনে বিশেষ বাস চলার পরিকল্পনা ছিল।
প্রকল্পটি চালু হলে প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার যাত্রী দ্রুত যাতায়াত করতে পারবেন বলে প্রত্যাশা করা হয়েছিল। বাসগুলো যানজট, ট্রাফিক সিগন্যাল কিংবা অন্য বাধায় আটকে থাকবে না—এমনটাই ছিল পরিকল্পনা।
উদ্দেশ্য ছিল গাজীপুরসহ আশপাশের এলাকার মানুষের যাতায়াত সহজ করা। গাজীপুরের শিল্পাঞ্চল, ঢাকার কর্মক্ষেত্র এবং বিমানবন্দরকেন্দ্রিক চলাচলের চাপ কমানোর সম্ভাবনাও ছিল এই প্রকল্পে।
কিন্তু পরিকল্পনার ত্রুটি, নির্মাণকাজে দীর্ঘসূত্রতা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে সেই প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ নেয়নি।
তিন দফায় ব্যয় বেড়ে দ্বিগুণের কাছাকাছি
প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় তিন দফা সংশোধনের পর বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা। প্রাথমিক ব্যয়ের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে ২ হাজার ২২৮ কোটি টাকার বেশি, অর্থাৎ প্রায় ১০৯ শতাংশ।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পে ক্রমপুঞ্জীভূত ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। অনুমোদিত ব্যয়ের প্রায় ৬৬ শতাংশ খরচ হলেও যাত্রী পরিবহণের জন্য বিআরটি চালু করা সম্ভব হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালে প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে তা অনুমোদন পায়নি।
অর্থাৎ, একদিকে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে, অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ের বহু বছর পরও যাত্রীসেবা চালু হয়নি। এ অবস্থায় প্রকল্পটি চালু রাখতে আরও অর্থ বিনিয়োগ করা হবে, নাকি নির্মিত অবকাঠামো সরিয়ে অন্যভাবে সড়ক পরিচালনা করা হবে—এ নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিকল্প পর্যালোচনা করা হয়।
কেন মুখ থুবড়ে পড়ল বিআরটি?
বিআরটি প্রকল্পের ব্যর্থতার পেছনে একক কোনো কারণ নয়, বরং পরিকল্পনা, নকশা, নির্মাণ ও পরিচালনব্যবস্থার একাধিক দুর্বলতা কাজ করেছে।
১. পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা ও নকশার আগেই প্রকল্প
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা ও নকশা শেষ হওয়ার আগেই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল। নির্মাণকাজ শুরুর পর দেখা যায়, প্রকল্প এলাকায় যথাযথ পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নেই। ফলে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকত।
ভূগর্ভস্থ গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সেবা সংস্থার লাইন সরানোর পরিকল্পনাও যথাযথভাবে আগে করা হয়নি। ভূমি অধিগ্রহণ, নকশা পরিবর্তন এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতায় কাজ বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
ব্যস্ত মহাসড়কে নির্মাণকাজ চলাকালে যানবাহন সচল রাখার কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থাও ছিল না। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়ই গাজীপুর-উত্তরা করিডোরে যানজট ও জনদুর্ভোগ বেড়েছে।
২. বিশেষ বাস সংগ্রহে ব্যর্থতা
প্রকল্পের অন্যতম বড় ব্যর্থতা ছিল পরিকল্পিত বিশেষ বাস সংগ্রহ করতে না পারা।
প্রথমে স্বয়ংক্রিয় দরজাযুক্ত দীর্ঘ বাস চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরে বৈদ্যুতিক বাস কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের এপ্রিলে ১৩৭টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ডিজেলচালিত বাস কেনার দরপত্র আহ্বান করা হলেও শেষ পর্যন্ত বাস সংগ্রহ করা যায়নি।
অথচ বিআরটির মূল উদ্দেশ্যই ছিল নির্দিষ্ট লেনে বিশেষ বাস চালিয়ে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহণ নিশ্চিত করা। বাস ছাড়া অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন হলেও যাত্রীসেবা চালু করা সম্ভব হয়নি।
৩. স্টেশনের নকশা ও বাসের দরজায় অসামঞ্জস্য
স্টেশনগুলোর নকশায় বাসের দরজার অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশের প্রচলিত বাসের দরজা বাম পাশে থাকলেও বিআরটি স্টেশন তৈরি করা হয়েছিল ডান পাশে দরজাবিশিষ্ট বাসের কথা বিবেচনায় রেখে।
বিশ্বের অনেক বিআরটি ব্যবস্থায় বাসের দরজা ডান পাশে থাকে। তবে এমন বাস চালু করলে সেগুলো গাজীপুর-বিমানবন্দর করিডোরের বাইরে প্রচলিত সড়কে চলাচলের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে পারে।
ফলে বিশেষ বাস চালু হলেও বিদ্যমান গণপরিবহণের সঙ্গে সংযোগ, বাসের বহুমুখী ব্যবহার এবং যাত্রীদের ওঠানামা নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
৪. ব্যবহার অনুপযোগী অবকাঠামো
যাত্রীদের ওঠানামার জন্য নির্মিত কয়েকটি পদচারী-সেতুতে চলন্ত সিঁড়ি ও লিফট রয়েছে। কিন্তু এসব স্থাপনার অনেকগুলোই ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কোথাও যন্ত্রপাতিতে জং ধরেছে, কোথাও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিআরটি লেন আলাদা করতে সড়কের মাঝখানে সিমেন্টের প্রতিবন্ধক এবং কোথাও লোহার বেড়া বসানো হয়েছে। এতে সড়কের ব্যবহারযোগ্য জায়গা কমেছে। কোথাও উড়ালপথ, কোথাও সমতল সড়ক, আবার কোথাও সরু লেন থাকায় যানবাহন চলাচলে সমস্যা তৈরি হয়েছে।
অর্থাৎ, যে অবকাঠামো যানজট কমানোর কথা ছিল, নির্মাণকাজের দীর্ঘসূত্রতা ও অসম্পূর্ণতার কারণে সেটিই অনেক ক্ষেত্রে যানজটের চাপ বাড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন: বাতিলই কি সবচেয়ে ভালো বিকল্প?
বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের আগে এর কারিগরি দিক পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি বিশেষজ্ঞ দল। দলের নেতৃত্বে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক।
বিশেষজ্ঞ দলের প্রতিবেদনে গাজীপুর-বিমানবন্দর করিডোরে বিআরটি প্রকল্প বাস্তবায়নকে ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। প্রকল্পটিকে দেশের অবকাঠামো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে ‘পদ্ধতিগত ব্যর্থতার’ উদাহরণ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছিল।
অধ্যাপক সামছুল হকের মতে, প্রকল্পটি চালু করলেও কয়েক হাজার কোটি টাকা আরও বিনিয়োগ করতে হবে। এতে করিডোরটি যানজটে স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা শিল্প-কলকারখানার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, বিআরটি চালু হলে গাজীপুরের যাত্রীরা শুধু বিমানবন্দর পর্যন্ত আসতে পারতেন। এরপর তাঁদের আবার বাস বদল করতে হতো। তাঁর মতে, এটি বাস্তবসম্মত যাতায়াতব্যবস্থা নয়।
বিআরটি প্রকল্প নিয়ে সম্ভাব্য বিকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো বিকল্প হচ্ছে এটি বাতিল করা—এমন মত দিয়েছিলেন বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান।
মন্ত্রিসভায় চার বিকল্প, বেছে নেওয়া হলো বাতিলের পথ
প্রকল্প বাতিলের আগে মন্ত্রিসভায় চারটি বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়—
১. প্রকল্পটি বাতিল করে দেওয়া। ২. অসমাপ্ত কাজ শেষ করে বিআরটি বাস কিনে চলাচলের ব্যবস্থা করা। ৩. বিআরটি পথ যেভাবে আছে, সেভাবেই রেখে বিশেষ বাস ও বিদ্যমান বেসরকারি বাস চলতে দেওয়া। ৪. বিআরটি পথটিকে টোলের আওতায় এনে পরিচালনা করা।
সরকার প্রথম বিকল্পটি বেছে নিয়েছে।
তবে প্রকল্প বাতিলের পর করিডোরটিকে অন্য সব বাহনের জন্য উন্মুক্ত করতে হলে বিআরটি স্টেশন, র্যাম্প, চলন্ত সিঁড়ি ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো অপসারণ করতে হবে। এ ছাড়া নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত ঠিকাদারদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতিতে এ-সংক্রান্ত ব্যয় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ ব্যয়ের নির্ভরযোগ্য চূড়ান্ত হিসাব এবং ক্ষতিপূরণের শর্ত প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত আর্থিক দায় নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
অন্যদিকে, প্রকল্পের অব্যবহৃত অর্থ প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা দিয়ে বাস কিনে একটি মৌলিক বিআরটি ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব বলে মত দিয়েছেন এর সমর্থকেরা। উন্নত বাস সংগ্রহ করতে অতিরিক্ত দুই থেকে তিন শ কোটি টাকা এবং আধুনিক বৈদ্যুতিক বাস ব্যবহারে আরও প্রায় এক হাজার কোটি টাকা লাগতে পারে বলেও তাঁদের হিসাব।
এখানে মূল প্রশ্ন শুধু কত টাকা ব্যয় হবে, তা নয়। বরং নির্মিত অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে যাত্রীসেবা চালু করা সম্ভব কি না, সেটিও বিবেচনার বিষয়।
বিআরটি বাতিল করলে লাভ, নাকি ক্ষতি?
প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি হলো—গাজীপুর-বিমানবন্দর করিডোরে বিআরটি পরিচালনা করতে গেলে আরও অর্থ বিনিয়োগ, বিশেষ বাস সংগ্রহ, পরিচালনব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং স্টেশনগুলোর নকশাগত সমস্যার সমাধান করতে হবে। এসব করতে গিয়ে যানজটের চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে, প্রকল্পের সমর্থকেরা বলছেন, অবকাঠামোর বড় অংশ নির্মিত হয়ে যাওয়ার পর তা অপসারণ করা হলে এত দিনের বিনিয়োগের কার্যকর ব্যবহার হবে না। বাস সংগ্রহের জন্য অব্যবহৃত অর্থ দিয়ে বিআরটি চালু করা সম্ভব হলে যাত্রীদের উপকার হতে পারে।
তবে শুধু বাস কিনলেই বিআরটি কার্যকর হবে না। বাসের দরজা ও স্টেশনের সামঞ্জস্য, যাত্রী ওঠানামা, টিকিট ব্যবস্থা, অন্যান্য গণপরিবহণের সঙ্গে সংযোগ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং করিডোরের যান চলাচল—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
তাই প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্তকে লাভজনক বা ক্ষতিকর বলার আগে অপসারণ ব্যয়, ক্ষতিপূরণ, অবকাঠামোর অবশিষ্ট ব্যবহার, বাস কেনার ব্যয় এবং যাত্রীদের সম্ভাব্য সুবিধা—এসবের পূর্ণাঙ্গ তুলনামূলক হিসাব প্রয়োজন।
গাজীপুর-ঢাকা করিডোরে বিআরটি কেন দরকার?
গাজীপুর দেশের দ্রুত বর্ধনশীল নগর ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল। ঢাকা ও গাজীপুরের মধ্যে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ যাতায়াত করেন। তাঁদের একটি বড় অংশের যাত্রাপথ বিমানবন্দর-গাজীপুর করিডোরের সঙ্গে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) প্রতিবেদনে গাজীপুরে বিআরটি চালু হলে কয়েকটি সম্ভাব্য সুবিধার কথা উল্লেখ করা হয়েছে—
মোট যাত্রার সময় প্রায় ৩০ শতাংশ কমতে পারে।
করিডোর ও সংলগ্ন সড়কে রিকশা, ব্যক্তিগত গাড়িসহ ছোট যানবাহনের ব্যবহার কমানো সম্ভব হতে পারে।
জ্বালানি ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণ কমতে পারে।
নারী, প্রবীণ ও অন্যান্য যাত্রীর জন্য আরামদায়ক ও নিরাপদ পরিবহণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
যাত্রীবীমা সুবিধা এবং বিআরটি-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে কর্মসংস্থান বাড়তে পারে।
স্থানীয় অর্থনীতি ও শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে গণপরিবহণের সংযোগ উন্নত হতে পারে।
তবে এসব সুবিধা বাস্তবে পেতে হলে বিআরটি কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে হবে। শুধু নির্দিষ্ট লেন ও স্টেশন নির্মাণ করলেই প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাবে না।
দ্বিতীয় বিআরটি প্রকল্পও বাতিলের প্রভাব
সড়ক পরিবহণ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে উত্তরা থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত আরেকটি বিআরটি পথ নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু গাজীপুর-বিমানবন্দর করিডোর সময়মতো চালু না হওয়ায় দ্বিতীয় প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যায়।
এতে দেশের অন্যান্য শহরে বিআরটি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা এবং এ ধরনের গণপরিবহণ প্রকল্পের প্রতি আস্থা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিশ্বের বহু শহরে বিআরটি সফলভাবে চালু থাকলেও বাংলাদেশের প্রথম প্রকল্পটি শেষ পর্যায়ে এসে বাতিল হওয়া পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের দুর্বলতা সামনে এনেছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের পরিবহণ প্রকল্পে সমীক্ষা, নকশা, অর্থায়ন, বাস সংগ্রহ ও পরিচালনব্যবস্থাকে শুরু থেকেই সমন্বিত করার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করেছে।
প্রকল্প চালুর পক্ষে বিশেষজ্ঞের আহ্বান
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোসলেহ উদ্দীন হাসান প্রকল্পটি চালুর পক্ষে মত দিয়েছেন।
তিনি যুগান্তরকে বলেন, সরকারকে অনুরোধ জানানো হয়েছে, বাতিলের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে প্রকল্পটি চালু করতে। এটি চালু করা গেলে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত ধারণাটি বাংলাদেশেও জনপ্রিয়তা পাবে। পাশাপাশি মানুষ সুবিধা ভোগ করবে। বিষয়টি সরকারকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
শেষ কথা: অবকাঠামো নয়, যাত্রীসেবাই হোক সিদ্ধান্তের মাপকাঠি
গাজীপুর-বিমানবন্দর বিআরটি প্রকল্পের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বড় অবকাঠামো নির্মাণ করলেই কার্যকর গণপরিবহণ নিশ্চিত হয় না। পরিকল্পনার শুরু থেকে বাস সংগ্রহ, স্টেশন নকশা, যাত্রী ওঠানামা, সড়ক ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনব্যবস্থা—সবকিছু সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হয়।
৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্তের পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি রয়েছে। একদিকে, আরও অর্থ বিনিয়োগ করে সমস্যাযুক্ত ব্যবস্থাটি চালু করার ঝুঁকি; অন্যদিকে, বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো অপসারণ এবং সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণের নতুন বোঝা।
সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো—প্রকল্প বাতিলের আর্থিক ও কারিগরি হিসাব স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা, করিডোরের দীর্ঘমেয়াদি পরিবহণ চাহিদা মূল্যায়ন করা এবং যাত্রীদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প নিশ্চিত করা।
কারণ, শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ধারিত হবে কত শতাংশ অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে, তা দিয়ে নয়; বরং মানুষ কত দ্রুত, নিরাপদে, স্বস্তিতে ও সাশ্রয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন, তা দিয়ে।
