শুক্রবার, ২৮শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রাজস্ব কর্মকর্তা বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমের বিরুদ্ধে ঘুষ-বাণিজ্য ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
আগস্ট ২৭, ২০২৬ ১২:৫৩ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

‘কোটি টাকার মাসোহারা’ থেকে গুলশান-ভাটারায় সম্পদের পাহাড়—তদন্তের দাবি ব্যবসায়ী মহলের। ফাইল ফটো

কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (উত্তর)-এর রাজস্ব কর্মকর্তা (আরও) বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমের বিরুদ্ধে অনিয়ম, ঘুষ-বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেট থেকে বদলি হয়ে আসার পর জ্যেষ্ঠতা ও প্রশাসনিক নিয়মের তোয়াক্কা না করে অঘোষিত তদবিরের মাধ্যমে কমিশনারেটের গুরুত্বপূর্ণ ‘হেডকোয়ার্টার রাজস্ব কর্মকর্তা’ পদটি বাগিয়ে নেন তিনি।

অনুসন্ধানে ওঠা অভিযোগ অনুযায়ী, ওই পদে বসে বন্ড সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর ফাইল আটকে রাখা, অডিটে শিথিলতা দেখানো, শোকজ নোটিশ প্রত্যাহার এবং বন্ড লাইসেন্সসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের নামে অনৈতিক আর্থিক সমঝোতার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে ডিপ্লোমেটিক বন্ড ওয়্যারহাউসের কার্যক্রম ঘিরে প্রতি মাসে ২ থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত অবৈধ মাসোহারা আদায়ের অভিযোগও উঠেছে।

কোটি টাকার মাসোহারা, প্রশ্নের মুখে রাজস্ব প্রশাসন

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রজ্ঞাপন (০৮.০১.০০০০.০০১১.০৫.০০৪.২০২০-৬৪১, তারিখ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫) অনুযায়ী বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (উত্তর)-এ যোগদানের পর থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক আর্থিক সমঝোতার অভিযোগ সামনে আসে।

অভিযোগকারীদের দাবি, প্রভাবশালী অবস্থান কাজে লাগিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল আটকে রাখা কিংবা দ্রুত নিষ্পত্তির আশ্বাস, অডিট কার্যক্রমে শিথিলতা, শোকজ নোটিশ প্রত্যাহার এবং বন্ড লাইসেন্সসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

বিশেষ করে ডিপ্লোমেটিক বন্ড ওয়্যারহাউসকেন্দ্রিক কার্যক্রম থেকে প্রতি মাসে ২ থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত মাসোহারা আদায়ের অভিযোগটি সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে এসব অর্থ আদায়ের অভিযোগের সত্যতা স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

গৃহিণী স্ত্রীর নামে কোটি কোটি টাকার সম্পদ?

অভিযোগের আরেকটি বড় অংশ ঘিরে রয়েছে তাঁর স্ত্রী সানজিদা আফরিন লিপির নামে রাজধানীতে জমি কেনার তথ্য। অভিযোগ অনুযায়ী, লিপির দৃশ্যমান কোনো নিজস্ব আয়ের উৎস না থাকলেও তাঁর নামে ভাটারা মৌজায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভূ-সম্পত্তি নিবন্ধিত হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভাটারা মৌজার জেএল নং ১৫, নামজারি খতিয়ান নং ২৯৭১৬ এবং দাগ নং ২০৭৬৩-সংক্রান্ত সম্পত্তি ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩৭৫৬(IX-I) নম্বর নামজারি মামলার মাধ্যমে তাঁর নামে কেনা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। লিপির স্থায়ী ঠিকানা খুলনার সোনাডাঙ্গা বলেও তথ্য রয়েছে।

জমির পরিমাণেই বড় গরমিল

. সরকারি নথিপত্রের বরাত দিয়ে অভিযোগে জমির পরিমাণে বড় ধরনের অসঙ্গতির কথা বলা হয়েছে।

. মূল নামজারি খতিয়ান: ০.৪০০০ একর—প্রায় ৪০ শতাংশ বা ২৪ কাঠা।

. ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড: ৪.৯৬ একর—প্রায় ৩০০ কাঠা।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ভাটারা এলাকায় বর্তমান বাজারদর কাঠাপ্রতি প্রায় ৬০ লাখ থেকে ১.৫ কোটি টাকা ধরলে ৪০ শতাংশ জমির আনুমানিক মূল্য দাঁড়াতে পারে প্রায় ১৫ থেকে ৩৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে ডিজিটাল রেকর্ডে প্রদর্শিত ৪.৯৬ একর জমির বাজারমূল্য ৩০০ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে।

তবে জমির প্রকৃত পরিমাণ ও বাজারমূল্য নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের রেকর্ড, দলিল, নামজারি এবং সরকারি মূল্যতালিকা যাচাই করা জরুরি।

অভিযোগকারীদের প্রশ্ন—একজন সরকারি রাজস্ব কর্মকর্তার ঘোষিত বৈধ আয় দিয়ে রাজধানীর অভিজাত এলাকায় এমন বিপুল সম্পদ অর্জন কীভাবে সম্ভব? একই সঙ্গে স্ত্রী ও আত্মীয়দের নামে খুলনার সোনাডাঙ্গাসহ বিভিন্ন স্থানে আরও সম্পদ গড়ার অভিযোগও উঠেছে।

বন্ড ব্যবস্থায় অনিয়ম হলে ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্র ও ব্যবসায়ী—অভিযোগ

কাস্টমস বন্ড ব্যবস্থা দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পখাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগকারীদের দাবি, এই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্রে বসে যদি ফাইল আটকে অর্থ আদায় বা সুবিধা দেওয়ার মতো অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে এর প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে না; ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সরকারি রাজস্ব ও পুরো বন্ড ব্যবস্থার স্বচ্ছতা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের এক সাবেক কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, ‘হেডকোয়ার্টার রাজস্ব কর্মকর্তা’ পদটি কমিশনারেটের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। ফলে এই পদে বসে সংঘবদ্ধভাবে অনিয়ম হলে তা ব্যক্তিগত দুর্নীতির গণ্ডি পেরিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির রূপ নিতে পারে।

‘ঘুষ কালেক্টর’—ব্যবসায়ীদের অভিযোগ

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুম রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে ‘ঘুষ কালেক্টর’ হিসেবে কাজ করছেন। তাঁদের দাবি, অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে হলে কেবল মৌখিক বক্তব্য নয়—ফাইল নোটিং, অডিট রিপোর্ট, ব্যাংক লেনদেন, সম্পদের দলিল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের বক্তব্যও যাচাই করা প্রয়োজন।

ব্যবসায়ী মহলের মতে, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে এটি জাতীয় রাজস্ব ব্যবস্থার প্রতি আস্থার জন্যও গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

দুদকের হস্তক্ষেপ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমের বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষ-বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও সচেতন মহল।

তাঁদের দাবি, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, আয়কর নথি এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন অনুসন্ধান করা জরুরি।

যেসব পদক্ষেপের দাবি উঠেছে

১. বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুম ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব, আয়কর রিটার্ন এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য যাচাই করা।

২. ডিপ্লোমেটিক বন্ড ওয়্যারহাউসসংক্রান্ত লেনদেনের নথি, ফাইল নোটিং ও তাঁর স্বাক্ষরিত গুরুত্বপূর্ণ নথি অডিট করা।

৩. সংশ্লিষ্ট বন্ড সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য ও জবানবন্দি গ্রহণ করা।

৪. অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যোগাযোগের তথ্য আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনা করা।

৫. ভাটারা ও অন্যান্য এলাকায় তাঁর স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পত্তির দলিল, নামজারি ও ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড যাচাই করা।

অভিযোগগুলো সত্য নাকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত—তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ, নথিভিত্তিক ও স্বচ্ছ তদন্তই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।