শুক্রবার, ২৮শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বরিশাল গণপূর্তে বিতর্কের কেন্দ্রে নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলম

নিজস্ব প্রতিবেদক
আগস্ট ২৭, ২০২৬ ১:৫২ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

নৌকার ব্যাজ, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ ও টেন্ডার নিয়ে প্রশ্ন—বহাল তবিয়তে প্রকৌশলী; নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি। ফাইল ছবি

ছাত্র–জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও বরিশাল গণপূর্ত বিভাগে বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ছে না। বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফয়সাল আলমকে ঘিরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার, অনিয়ম–দুর্নীতি এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগের পরও তিনি স্বপদে বহাল থাকায় গণপূর্তের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারদের একাংশের মধ্যে প্রশ্ন ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সরকারি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ফয়সাল আলমকে প্রকাশ্যে নৌকার ব্যাজ পরিহিত অবস্থায় দেখা গেছে। এ নিয়ে তার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তিনি প্রভাব ও পদ ধরে রাখতে নানা কৌশল অবলম্বন করছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্ট মহলের মত।

নৌকার ব্যাজ ঘিরে নতুন প্রশ্ন

ফয়সাল আলমের বুকের ডান পাশে নৌকার প্রতীকসংবলিত ব্যাজ পরা একটি ছবি নিয়েও সম্প্রতি আলোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ছবিটি তার প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থানের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো।

তবে কোনো কর্মকর্তার রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রতীকের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে সংশ্লিষ্ট নথি, সময়কাল ও অন্যান্য তথ্যের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন। এ কারণেই বিষয়টি তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।

ঝালকাঠির দায়িত্বকাল নিয়েও অভিযোগ

অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, ৩২তম বিসিএসের কর্মকর্তা ফয়সাল আলম ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার বাসিন্দা। ঝালকাঠিতে দায়িত্ব পালনকালে তিনি তৎকালীন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন—এমন অভিযোগ রয়েছে।

সেই সময় নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, কমিশন বাণিজ্য ও নিয়মবহির্ভূত কার্যক্রমের অভিযোগে তাকে নিয়ে সাধারণ ঠিকাদারদের মধ্যে সমালোচনা ছিল বলেও দাবি করা হয়েছে। এমনকি তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ জমা পড়েছিল বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি ও দুদকের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।

ঝালকাঠি থেকে বরিশালে বদলির পরও একই ধরনের অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে দাবি করছেন কয়েকজন ঠিকাদার। তাদের অভিযোগ, খান বিল্ডার্স ও খান ট্রেডার্স নামের দুটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বিপুল পরিমাণ কাজ পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

টেন্ডারেই যত প্রশ্ন-

সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের অভিযোগ, বরিশালের একাধিক মডেল মসজিদসহ কয়েকটি প্রকল্পের দরপত্রে ওয়ার্ক ক্যাপাসিটি না থাকায় এর আগে কিছু দরপত্র বাতিল হয়েছিল। পরবর্তীতে যৌথ উদ্যোগ বা জেবি (Joint Venture) দেখিয়ে একই প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এতে টেন্ডারের শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সে প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে কয়েকজন ঠিকাদার গণপূর্ত কার্যালয়ে প্রতিবাদ জানাতে গেলে নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে তাদের বাকবিতণ্ডা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিরোধিতাকারী ঠিকাদারদের লাইসেন্স বাতিলের হুমকি দেওয়া হয়েছিল—এমন অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ। যদিও এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।

ঠিকাদারদের ক্ষোভ

গণপূর্তের সাধারণ ঠিকাদার আব্দুর রহিম বলেন, ঝালকাঠিতে থাকার সময় যেমন অনিয়মের অভিযোগ ছিল, বরিশালেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নিয়ম ভেঙে নির্দিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হচ্ছে।

আরেক ঠিকাদার তসলিম মৃধার অভিযোগ, সরকারি কর্মকর্তা হয়ে তিনি প্রকাশ্যে রাজনৈতিক পরিচয় বহন করতেন। এখনো গোপন সমঝোতার মাধ্যমে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে ঠিকাদার এটিএম আশরাফুল হক রিপন বলেন, ওয়ার্ক ক্যাপাসিটি না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো টেন্ডারে অংশ নিচ্ছে—তিনি মূলত সেই প্রশ্নই তুলেছেন। কাউকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।

নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফয়সাল আলম সাংবাদিকদের কাছে উল্টো দাবি করেন, কয়েকজন ঠিকাদার তার কার্যালয়ে এসে তাকে হুমকি দিয়েছেন।

তবে টেন্ডার, রাজনৈতিক পরিচয় এবং নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগসহ সামগ্রিক বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

আইইবি কমিটিতেও দায়িত্ব

গত ৮ ফেব্রুয়ারি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি), বরিশালের নবগঠিত কমিটিতে ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান ফয়সাল আলম। এ নিয়েও প্রকৌশলী ও ঠিকাদার মহলে আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রে রয়েছে এ ডন।

তদন্তের দাবি

সব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট দরপত্রের নথি, ওয়ার্ক ক্যাপাসিটি, জেবি চুক্তি, কার্যাদেশ, প্রকল্প বাস্তবায়নের তথ্য এবং পূর্বের অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে কোনো কর্মকর্তা বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি উঠেছে।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং অভিযোগ অসত্য হলে অভিযুক্ত কর্মকর্তার অবস্থানও পরিষ্কার হওয়া জরুরি। এতে সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

নৌকার ব্যাজের ছবি, টেন্ডার বিতর্ক এবং নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ—সব মিলিয়ে বরিশাল গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলমকে ঘিরে প্রশ্ন এখন একটাই: অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হবে কবে?

বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী সংখ্যায়।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।