সাবেক এনবিআর কর্মকর্তা সহিদুল ইসলাম। দুদকে অভিযোগ। ফাইল ছবি
ঢাকা: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক সদস্য ও সাবেক কাস্টমস কমিশনার ড. মোঃ সহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বিপুল সম্পদ অর্জন, বেনামি সম্পদ গোপন, কর ও ভ্যাট ফাঁকি এবং দেশ-বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ উঠেছে। একই অভিযোগে তার দুই ভাই মোঃ শামীম আহমেদ ও মোঃ সেলিম আহমেদ এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত মোঃ খোকন মিয়ার সম্পদ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে গত ১৩ আগস্ট দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জের ফুলহাতা, বহরবুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা মোঃ মনিরুজ্জামান মনির জনস্বার্থে অভিযোগটি দাখিল করেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, এনবিআরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকালে ড. মোঃ সহিদুল ইসলাম ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে ঘুষ, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তার এবং তার পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বেশি সম্পদের তথ্য উঠে এসেছে বলে অভিযোগকারী দাবি করেছেন। তবে এসব সম্পদের প্রকৃত উৎস, মালিকানা ও বৈধতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি জানানো হয়েছে।
দুই ভাইয়ের হেফাজতে সম্পদ রাখার অভিযোগ
অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, দেশত্যাগের আগে ড. সহিদুল ইসলাম তার কথিত অবৈধ সম্পদের একটি বড় অংশ দুই ভাই মোঃ শামীম আহমেদ ও মোঃ সেলিম আহমেদের হেফাজতে রেখে যান। বর্তমানে তারা এসব সম্পদ ও ব্যবসা পরিচালনা করছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, মোঃ সেলিম আহমেদ ‘সেলিম এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি C&F ব্যবসা পরিচালনা করছেন। অভিযোগপত্রে প্রতিষ্ঠানটির C&F লাইসেন্স নম্বর ২৬৬৮ এবং ইস্যুর তারিখ ১৭ অক্টোবর ২০০৮ উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, ব্যবসাটির প্রকৃত অর্থায়ন ও নিয়ন্ত্রণ ড. সহিদুল ইসলামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যবসাটিতে যথাযথ কর ও ভ্যাট পরিশোধ করা হয়েছে কি না, সেটিও যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া ইউনিক পলি ইন্ডাস্ট্রিজ ও আইডিয়াল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও আনা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানা, শেয়ারহোল্ডিং, অর্থের উৎস, ব্যাংক লেনদেন এবং প্রকৃত নিয়ন্ত্রক কারা—তা অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।
‘ক্যাশিয়ার’ পরিচয়ে খোকন মিয়ার সম্পদ নিয়েও প্রশ্ন
অভিযোগের আরেকটি অংশে মোঃ খোকন মিয়ার সম্পদের বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। অভিযোগে তাকে ড. সহিদুল ইসলামের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তার নামে বা নিয়ন্ত্রণে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে বাড়ি ও মূল্যবান সম্পদ থাকার অভিযোগ তুলে এসব সম্পদের বৈধ আয়ের উৎস অনুসন্ধানের দাবি করা হয়েছে।
তবে অভিযোগে উল্লিখিত এসব তথ্যের প্রকৃত মালিকানা, অর্থের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা দুদকের তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকায় ৫৩ ফ্ল্যাট, পূর্বাচলে ৬ প্লটসহ বিপুল সম্পদের দাবি
অভিযোগে বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে ড. সহিদুল ইসলাম, তার স্ত্রী, সন্তান ও ঘনিষ্ঠ স্বজনদের নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের তথ্য উঠে আসার দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে উল্লেখিত সম্পদের তালিকায় রয়েছে—
১. ঢাকায় ৫৩টি ফ্ল্যাট।
২. পূর্বাচলে ৬টি প্লট।
৩. বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় বহুতল ভবন।
৪. নিউমার্কেট ও আজিজ সুপার মার্কেটে একাধিক বাণিজ্যিক দোকান।
৫. মধুমতি মডেল টাউনে বাংলো।
৬. শেয়ারবাজারে বিপুল বিনিয়োগ।
৭. বাগেরহাটে কলেজ, হাজার হাজার শতাংশ জমি।
খুলনায় বহুতল ভবনসহ বিভিন্ন স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ।
অভিযোগকারী বলেছেন, এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়মূল্য, বর্তমান বাজারমূল্য, অর্থের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ঘোষিত আয় ও কর নথির সঙ্গে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না—তা পূর্ণাঙ্গভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
দেশত্যাগ ও বিদেশে সম্পদ সরানোর অভিযোগ
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, সম্ভাব্য আইনি জটিলতা এড়াতে ড. সহিদুল ইসলাম দেশত্যাগ করেছেন এবং পরবর্তীতে পরিবারের সদস্যদেরও বিদেশে পাঠানো হয়েছে। প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্যের বরাত দিয়ে গত কয়েক মাসে তার একাধিক বিদেশ সফরের কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব বিদেশ সফর, দেশত্যাগ এবং বিদেশে কোনো সম্পদ বা অর্থ স্থানান্তরের সঙ্গে অবৈধ কর্মকাণ্ডের সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই। এ কারণে তার পাসপোর্ট-ইমিগ্রেশন তথ্য, বিদেশ সফরের উদ্দেশ্য, বিদেশে ব্যাংক হিসাব, সম্পদ ও আর্থিক লেনদেনসহ সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।
দুদক ও এনবিআরের অনুসন্ধানের দাবির মধ্যেই নতুন অভিযোগ
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, ড. সহিদুল ইসলামের সম্পদের উৎস, আয়-ব্যয় ও আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়ে দুদক এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রাথমিক অনুসন্ধানের খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। একই সঙ্গে তার দুই ভাইয়ের নামে-বেনামে থাকা সম্পদ ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডও তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
অভিযোগকারীর দাবি, শুধু ড. সহিদুল ইসলামের নামে থাকা সম্পদ যাচাই করলেই প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। তার পরিবারের সদস্য, দুই ভাই, ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেনও একই সঙ্গে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
ব্যাংক হিসাব থেকে C&F ব্যবসা—সবকিছু তদন্তের দাবি
দুদকের কাছে দাখিল করা অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের—ব্যাংক হিসাব, বিও হিসাব, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ, কোম্পানির মালিকানা, C&F লাইসেন্স, আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত নথি, আয়কর রিটার্ন, ভ্যাট রিটার্ন, জমি-ফ্ল্যাটের দলিল, কোম্পানির আর্থিক বিবরণী এবং দেশ-বিদেশে অর্থ লেনদেনের তথ্য যাচাই করার দাবি জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে কোনো সম্পদ প্রকৃতপক্ষে অন্য কারও নামে থাকলেও তা ড. সহিদুল ইসলাম বা তার পরিবারের সদস্যদের অর্থে অর্জিত হয়েছে কি না, সে বিষয়েও অনুসন্ধানের দাবি জানানো হয়েছে।
সম্পদ জব্দ ও অর্থপাচারের অভিযোগ তদন্তের আবেদন
অভিযোগকারী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজন হলে সন্দেহভাজন সম্পদ, ব্যাংক হিসাব ও ব্যবসায়িক লেনদেন প্রচলিত আইনের আওতায় সাময়িকভাবে অবরুদ্ধ বা জব্দ করার ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে দেশ-বিদেশে অর্থ পাচার, মানিলন্ডারিং, কর ও ভ্যাট ফাঁকি এবং জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে।
নিরপেক্ষ তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত চিত্র
অভিযোগকারী তার আবেদনে উল্লেখ করেছেন, অভিযোগে উত্থাপিত সম্পদ ও আর্থিক কর্মকাণ্ডের তথ্যগুলো বিভিন্ন প্রকাশিত প্রতিবেদন, প্রাসঙ্গিক নথি ও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কমিশনের নজরে আনা হয়েছে। এসব অভিযোগের কোনোটি সত্য, আংশিক সত্য কিংবা ভিত্তিহীন—তা নির্ধারণের জন্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
এ কারণে ড. মোঃ সহিদুল ইসলাম, তার দুই ভাই মোঃ শামীম আহমেদ ও মোঃ সেলিম আহমেদ এবং মোঃ খোকন মিয়ার নামে বা নিয়ন্ত্রণে থাকা সম্পদের পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান, অর্থের উৎস যাচাই এবং দেশ-বিদেশে সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা করে প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটনের আবেদন জানানো হয়েছে।
অভিযোগে উত্থাপিত তথ্যগুলোর স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধানের ওপর নির্ভরশীল।
অভিযোগের পর দুদকের বাছাই কমিটির অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে…………..
