ধানমন্ডি ৩২-এর দায়িত্ব থেকে শতকোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ, দুদকের তথ্য চাওয়া—আ’লীগ থেকে বিএনপিতে ‘রং বদলের’ অভিযোগ। ফাইল ছবি
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম শাখার উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আবুল বাশারকে ঘিরে উঠেছে নানা গুরুতর অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরির পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন। প্রায় এক দশক ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল কাজের দায়িত্বে থাকার সময় রাজধানীর জুরাইনে পাঁচতলা বাড়ি, নিউ মার্কেটে স্বর্ণের দোকান, বরিশাল শহরে বাড়ি, বাকেরগঞ্জে বিশাল ইটভাটা এবং কয়েকশ বিঘা জমিসহ নামে-বেনামে অর্ধশতাধিক কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন—এমন দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আবুল বাশার ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক অবস্থান বদলে বিএনপির বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন ও দলীয় নেতাদের সঙ্গে ছবি তুলে নিজেকে নতুনভাবে পরিচিত করার চেষ্টা করছেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ধানমন্ডি ৩২ থেকে বাকেরগঞ্জ—প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ডিপ্লোমা প্রকৌশলী আবুল বাশার ২০১৫ সালের শুরু থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল জাদুঘর ও সুধাসদনের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল দায়িত্বে ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। এ সময় তিনি নিজ এলাকা বরিশালের বাকেরগঞ্জে আওয়ামী লীগের পরিচয়ে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সূত্রের দাবি, বাকেরগঞ্জ উপজেলার ৭ নম্বর কবাই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে আবুল বাশারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন মিছিল, সভা, সমাবেশ ও জনসভায় তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ সহায়তা করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়ভাবে তিনি আওয়ামী লীগের ‘ডোনার’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন—এমন দাবিও করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এছাড়াও বিগত ২০১৮ ও পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নির্বাচনে নৌকার পক্ষে কাজ করার লিখিত স্বীকারোক্তি?
আবুল বাশারের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগের পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ নথির কথাও উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় অফিসে অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম-২ বিভাগের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম তার কাছে কৈফিয়ত তলব করেন।
এর জবাবে ১৫ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে দেওয়া লিখিত চিঠিতে উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আবুল বাশার নিজেই তার এলাকায় অবস্থানের কারণ ব্যাখ্যা করেন বলে দাবি করা হয়েছে।
চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতির নির্দেশনা অনুযায়ী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নৌকার পক্ষে কাজ করার জন্য তিনি নিজ এলাকায় ছিলেন। নির্বাচনের পরদিন বিজয়ী সংসদ সদস্য অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আব্দুল হাফিজ মল্লিকের বিজয় সংবর্ধনা ও বিজয় র্যালিসহ একটি অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তিনিও আমন্ত্রিত হয়ে উপস্থিত ছিলেন বলেও চিঠিতে উল্লেখ করেন।
ওই লিখিত জবাবের নিচে উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আবুল বাশারের স্বাক্ষর রয়েছে বলে প্রতিবেদকের হাতে থাকা নথিতে দেখা গেছে।
‘৫ আগস্টের পর বদলে যায় রাজনৈতিক পরিচয়’
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময়ও আবুল বাশার আওয়ামী লীগের পক্ষে অর্থ ব্যয় করেছিলেন। তবে ৫ আগস্টের পর তার রাজনৈতিক অবস্থানে পরিবর্তন আসে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
সূত্রের অভিযোগ, কিছুদিন আত্মগোপনে থাকার পর তিনি বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে উপস্থিত হতে শুরু করেন। বিভিন্ন বিএনপি নেতার সঙ্গে ছবি তুলে এবং দলীয় কর্মসূচিতে অর্থ সহায়তা করে নিজেকে বিএনপির কর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এমনকি বিএনপির বিভিন্ন সভা-সমাবেশে কথিত দুর্নীতি ও লুটপাটের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ ব্যয় করা এবং অর্থের বিনিময়ে কিছু কথিত সাংবাদিককে দিয়ে নিজের পক্ষে সংবাদ প্রকাশের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা হয়নি।
দুদকের নজরেও আবুল বাশার
আবুল বাশারের সম্পদ ও কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন ওঠার মধ্যেই তার বিষয়ে তথ্য চেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী বরাবর চিঠি দেয় বলে সংশ্লিষ্ট নথি থেকে জানা গেছে।
দুদকের ওই চিঠির পর গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. মাহাবুব হাসান আবুল বাশারের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, পাসপোর্ট, টিআইএন, চাকরির বেতন ও অন্যান্য সুবিধা, চাকরির বিবরণী এবং ঝিগাতলা অফিসার্স কোয়ার্টার নির্মাণ প্রকল্পসংক্রান্ত তথ্যসহ চাহিদাকৃত বিভিন্ন নথি দুদকে সরবরাহ করেন বলে জানা যায়।
দুদকের ২০ এপ্রিল ২০২৫ তারিখের চিঠি এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য-উপাত্ত এ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে পরবর্তী সময়ে দুদকের অনুসন্ধান বা তদন্তের কী অগ্রগতি হয়েছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে দুদকের তদন্ত প্রভাবিত বা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
জমি দখলের অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন
২০২৫ সালের মার্চে ডিপ্লোমা প্রকৌশলী আবুল বাশারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটিতে একটি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে ভুক্তভোগী কুদ্দুস মিয়া অভিযোগ করেন, ২০১৫ সাল থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বৈদ্যুতিক দায়িত্বে থাকার সুবাদে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে আবুল বাশার তার এবং তার বোনের ৭০ শতাংশ জমিসহ আশপাশের অন্যান্য ব্যক্তির জমি অবৈধভাবে দখল করেছেন।
তবে জমি দখলের এ অভিযোগের বিষয়ে আবুল বাশারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি এবং অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন, নিজ এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাব, বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ, জমি দখল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং দুদকের তথ্য চাওয়ার ঘটনা—সব মিলিয়ে উপসহকারী প্রকৌশলী আবুল বাশারের সম্পদের উৎস ও চাকরির বাইরে তার কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, রাজধানীর জুরাইনে পাঁচতলা বাড়ি, নিউ মার্কেটে স্বর্ণের ব্যবসা, বরিশাল শহরে বাড়ি, বাকেরগঞ্জে ইটভাটা এবং বিপুল পরিমাণ জমিসহ তার নামে-বেনামে অর্ধশতাধিক কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। এসব সম্পদের বৈধ উৎস কী—তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বক্তব্য মেলেনি
এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে ডিপ্লোমা প্রকৌশলী মো. আবুল বাশারের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে ইরেকশন ইঞ্জানিয়ারিয়ে কীভাবে নেতৃত্ব দিয়ে আলোচনায় এসেছেন। বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে।
