শুক্রবার, ২রা অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ডেঙ্গুতে বাবাকেও হারাল জন্মের তিন দিনে মাকে হারানো আরফা, আট বছর একাই মেয়ের বাবা-মায়ের দায়িত্ব পালন করেছিলেন তাজুল, এখন দাদির কাছে ছোট্ট আরফা

নিজস্ব প্রতিবেদক
অক্টোবর ১, ২০২৬ ১১:২৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

কবরের পাশে ও বাবার সঙ্গে আরিফিন ইসলাম আরফা। ছবি: কোলাজ

জন্মের মাত্র তিন দিনের মাথায় মাকে হারিয়েছিল আরিফিন ইসলাম আরফা। সেই থেকে বাবাই ছিলেন তার পৃথিবী—মা, বাবা, অভিভাবক ও সবচেয়ে আপন মানুষ। কিন্তু সেই বাবাকেও এবার ডেঙ্গু কেড়ে নিয়েছে। মাত্র ৪০ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে যেন আবারও অভিভাবকহীন হয়ে পড়ল ছোট্ট আরফা।

আরফার বাবা মো. তাজুল ইসলাম রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। গত ১৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

বাবার সঙ্গে আরিফিন ইসলাম আরফা। ছবি: পরিবারের সৌজন্যে

মেয়ের জন্মের পর আট বছর একাই শিশুটির বাবা ও মায়ের দায়িত্ব পালন করেছেন তাজুল। মেয়ের কথা ভেবে দ্বিতীয়বার ঘর বাঁধেননি। মাকে হারানোর পর বাবার ছায়াতেই বেড়ে উঠছিল আরফা। সেই ছায়াটুকুও এখন হারিয়ে গেছে।

তাজুল ও তার স্ত্রী দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। দীর্ঘদিনের পরিচয় থেকে দুই পরিবারের সম্মতিতে ২০১৪ সালে তাদের বিয়ে হয়। ২০১৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি নড়াইল সদর হাসপাতালে জন্ম নেয় আরফা। কিন্তু জন্মের তিন দিনের মাথায় মর্মান্তিকভাবে মারা যান তার মা। এরপর মেয়েকে ঘিরেই ছিল তাজুলের পুরো পৃথিবী। বাবার মৃত্যুর পর এখন শিশুটি তার দাদির কাছে রয়েছে।

পারিবারিক সূত্র জানায়, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেওয়ার পর হাসপাতালে থাকা অবস্থায় হঠাৎ তীব্র খিঁচুনি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন তাজুলের স্ত্রী। দাঁড়ানো অবস্থায় পড়ে গিয়ে মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পান তিনি। পেটের সেলাই ফেটে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। পরে যশোর হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

আরিফিন ইসলাম আরফা। ছবি: পরিবারের সৌজন্যে

স্ত্রীর আকস্মিক মৃত্যুতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তাজুল। মাত্র তিন দিনের শিশুকন্যাকে নড়াইল থেকে ঢাকায় এনে নিজের মায়ের কাছে তুলে দেন। স্ত্রীর শোক আর সন্তানকে ঘিরে দুশ্চিন্তায় একসময় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। এরই মধ্যে তার যক্ষ্মা ধরা পড়ে। ছয় মাসের চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠেন। সেই কঠিন সময়েও মেয়ে আরফাই তাকে বেঁচে থাকার মানসিক শক্তি জুগিয়েছিল।

পেশাগত জীবনে তাজুল পারিবারিক ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ও টিসিবির ডিলারশিপের ব্যবসা পরিচালনা করতেন। এই আয়েই চলত সংসার ও মেয়ের পড়াশোনাসহ অন্যান্য খরচ। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট।

আরফা রামপুরার একরামুন্নেসা উচ্চ বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। মা মারা যাওয়ার পর বাবা ও দাদির আদর-যত্নেই বড় হয়েছে সে। আট বছর ধরে বাবাই ছিলেন তার সবচেয়ে বড় আশ্রয়।

বাবাকে হারানোর শোক যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না ছোট্ট আরফা। তার ভাষায়, ‘মা চলে যাওয়ার পর বাবাই ছিল আমার মা-বাবা, সঙ্গে ছিল দাদি। দাদি ও বাবা একসঙ্গে স্কুলে নিয়ে যেত। বাবার সঙ্গে রাগ বা অভিমান করলে খেলনা এনে দিত। প্রতিদিন ৫০ টাকা দিত নাশতা খেতে। যেহেতু আমার বিড়াল পছন্দ, তো তার জন্য পছন্দের খাবার আনত। যে মানুষটা আমার পৃথিবী ছিল সে মানুষটা আর আসবে না, কথা বলবে না, হাঁটবে না।

বাবার স্মৃতিচারণ করে আরফা আরও বলে, ‘আমি অনেক সময় ঘুমালেও বাবা বাসায় এসেই ঘুমিয়েছি কি না, দাদির কাছে জিজ্ঞেস করত। এক পলক না দেখে বাবা থাকতে পারত না।

রামপুরার ওয়াপদা সড়কের ১৪৭ নম্বর বাসায় যৌথ পরিবারে বসবাস ছিল তাজুলের। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বাসাজুড়ে সুনসান নীরবতা। সন্তান হারানোর শোক এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি তাজুলের মা-বাবা, মেয়ে ও পরিবারের অন্য সদস্যরা। যে ঘরে একসময় তাজুলের কণ্ঠে মুখর থাকত পরিবেশ, সেখানে এখন শুধু শোকের নীরবতা।

কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আছে আরিফিন ইসলাম আরফা। ছবি: পরিবারের সৌজন্যে

এ সময় কথা হয় তাজুলের বড় ভাই মো. শফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘কয়েক দিন আগে মা-বাবা, আমি এমনকি ছোট্ট আরফাও জ্বরে আক্রান্ত হই। সবাই সুস্থ হলে তাজুলের জ্বর শুরু হয়। কয়েকদিন বেশ ভালো ছিল, খাচ্ছিলও ঠিকঠাক। কিন্তু ১৪ সেপ্টেম্বর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে রামপুরার বেটার লাইফ হাসপাতালে নেওয়া হয়। এরপরের ৭২ ঘণ্টায় সবকিছু এলামেলো হয়ে যায়।

তাজুলের জ্বরের সময় বাবার পাশেই থাকত আরফা। সে জানায়, বাবা তাকে বলেছিল, ‘আমার কলিজাটা মনে হয় বের হয়ে যাচ্ছিল।’ তবে দাদিকে এ কথা জানাতে নিষেধ করেছিলেন তিনি।

বাবার জ্বরের সময় রাতে তার মাথায় পানি ও জলপট্টি দিত ছোট্ট আরফা। সে জানায়, ‘বাবার অনেক কষ্ট হতো। বেশি জ্বর হলেও বাবা কাউকে সহজে বুঝতে দিতেন না। পরিবারের সবাই জানতেন বাবার ডেঙ্গু হয়েছে, কিন্তু কেউ তা বলেনি।

হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দিনের স্মৃতিও এখন আরফার কাছে কেবলই কষ্টের। কান্না থামাতে বাবা তাকে বলেছিলেন, ‘তুমি বাসায় যাও, আমি কালই চলে আসব।’

কিন্তু সেই ‘কাল’ আর আসেনি।

শফিকুল ইসলাম জানান, হাসপাতালে তাজুলের রক্তচাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। তার হাত কাঁপছিল এবং প্রচুর বমি হচ্ছিল। খুব দ্রুত শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়।

চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে শফিকুল ইসলাম জানান, তাজুল ডেঙ্গুর সবচেয়ে মারাত্মক ধরনে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ভাইরাসের প্রভাবে তার নিউমোনিয়া হয়। এরপর একে একে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো বিকল হতে শুরু করে (মাল্টিপল অর্গান ফেইলিউর)। একপর্যায়ে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়।

বাবার শেষ সময়ের কথা বলতে গিয়ে আরফা বলে, ‘হাসপাতালে ভর্তি হলে আমি সঙ্গে থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বাবা বলেছিল, তেমন সমস্যা নেই, আমি কালই চলে আসব। আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমি যাতে কান্না না করি সে জন্য বাবা এমনটা বলেছিল। পরদিন যখন হাসপাতালে যাই, তখন দেখি বাবার খিঁচুনি উঠেছে, অক্সিজেন লাইন লাগানো। বাবার জন্য নামাজ পড়ে দোয়া করেছি, তবুও বাবাকে আল্লাহ নিয়ে গেছেন।

বাবার সঙ্গে আরিফিন ইসলাম আরফা। ছবি: পরিবারের সৌজন্যে

মাত্র তিন দিনের বয়সে মাকে হারিয়েছিল আরফা। আট বছর ধরে সেই শূন্যতা নিজের ভালোবাসা দিয়ে পূরণ করে আসছিলেন বাবা তাজুল। মেয়ের জন্য নিজের জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু করেননি, অসুস্থতার সঙ্গে লড়েছেন, মেয়েকে আগলে রেখেছেন। শেষ পর্যন্ত ডেঙ্গুর কাছে হার মেনে তিনিও চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

মা-বাবা দুজনকেই হারিয়ে এখন ছোট্ট আরফার পৃথিবী বলতে শুধু দাদি ও স্বজনেরা। বাবার ফেরার অপেক্ষায় যে শিশুটি একসময় প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকত, সেই দরজায় এখন আর তাজুল ফিরবেন না—এ বাস্তবতাই যেন সবচেয়ে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে তার ছোট্ট জীবনে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।