গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীদের সাম্প্রতিক বদলি ও পদায়ন ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। লটারির মাধ্যমে কর্মস্থল বণ্টনের কথা বলা হলেও ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিভাগে আগে থেকেই পছন্দের কর্মকর্তাদের পদায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছিল—এমন অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্ট অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, একাধিক বাক্সে পছন্দের কর্মকর্তাদের নাম রেখে লটারির নামে পূর্বনির্ধারিত পদায়ন বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে পক্ষপাতিত্ব, প্রশাসনিক অনিয়ম, সরকারি চাকরির বিধিবিধান অনুসরণ এবং বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সরোয়ার আলম, গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সরোয়ার জাহান এবং পদায়নপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন নির্বাহী প্রকৌশলী। অভিযোগকারীদের দাবি, ঢাকার চার থেকে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগে কারা দায়িত্ব পাবেন, তা আগে থেকেই নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়েছিল। পাশাপাশি পদায়নপ্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে ১২০ কোটি টাকা অবৈধভাবে আয়ের অভিযোগও তুলেছেন তাঁরা।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট নথি এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া না যাওয়ায় অভিযোগগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে লটারির প্রক্রিয়া, পদায়নের তালিকা, কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা, গ্রেডিং এবং আর্থিক লেনদেনের নথি যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।
লটারির নামে প্রহসনের অভিযোগ, আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন?
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীদের পদায়নের ক্ষেত্রে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিভাগে পছন্দের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরে একাধিক বাক্সে নির্দিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার নাম রেখে লটারির মাধ্যমে পদায়নের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয় বলে তাঁদের অভিযোগ।
অভিযোগের তালিকায় রয়েছে শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-১ ও বিভাগ-২, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩ ও বিভাগ-৪, ঢাকা মেডিকেল কলেজ গণপূর্ত বিভাগ এবং রাজধানীর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থল। এসব বিভাগের কয়েকটিতে অপেক্ষাকৃত নবীন কর্মকর্তাদের পদায়ন এবং জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ঢাকার বাইরে পাঠানোর বিষয়টি সামনে এনে লটারির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
তাঁদের দাবি, পদায়নপ্রক্রিয়াটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর অগোচরে পরিচালিত হয়ে থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সচিব সরোয়ার আলম ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সরোয়ার জাহানের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
তবে লটারিতে অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নির্ধারণে শুধু পদায়নের ফলাফল দেখাই যথেষ্ট নয়। লটারির আগে প্রস্তুত করা মূল তালিকা, বাক্সভিত্তিক নামের বিবরণ, লটারির কার্যবিবরণী, বিভাগভিত্তিক শূন্যপদ, কর্মকর্তাদের যোগ্যতা ও পছন্দক্রম এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক আদেশ যাচাই করা প্রয়োজন। এসব নথি প্রকাশ করা হলে অভিযোগের সত্যতা নিরূপণ সহজ হতে পারে।
৩২ ও ৩৩তম ব্যাচের কর্মকর্তারা ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে, জ্যেষ্ঠদের জেলা পর্যায়ে পদায়ন
অভিযোগকারীদের সরবরাহ করা পদায়নসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ৩২ ও ৩৩তম ব্যাচের কয়েকজন কর্মকর্তা ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগে দায়িত্ব পেয়েছেন। অন্যদিকে, ২৪, ২৭, ৩০ ও ৩১তম ব্যাচের কয়েকজন কর্মকর্তা ঢাকার বাইরে পদায়ন পেয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তালিকায় ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২-এ মাসুম বিল্লাহ (৩৩তম ব্যাচ), ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩-এ কামরুল হাসান (৩২তম ব্যাচ), গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংস্থাপন-১ শাখায় জ্যোতিময় ভট্টাচার্য (৩৩তম ব্যাচ), প্রকল্প বিভাগ-৫-এ মনিরুজ্জামান জিতু (৩২তম ব্যাচ), ঢাকা মেট্রো জোনে স্টাফ অফিসার হিসেবে মাহমুদুল হাসান লিমন (৩৩তম ব্যাচ) এবং ঢাকা রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগে রেজা তাইমুর মালিকের (৩২তম ব্যাচ) পদায়নের তথ্য রয়েছে।
এ ছাড়া মহাখালী গণপূর্ত বিভাগের দায়িত্বে ইমরান (৩৩তম ব্যাচ) এবং সার্ভে-সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে কাওসারের (৩২তম ব্যাচ) নামও অভিযোগকারীদের দেওয়া তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ২৪তম ব্যাচের স্বর্ণেন্দু শেখর মণ্ডলকে মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগে, ২৭তম ব্যাচের আতিকুল ইসলামকে কুড়িগ্রাম গণপূর্ত বিভাগে এবং আব্দুস সাত্তারকে লালমনিরহাট গণপূর্ত বিভাগে পদায়নের তথ্য দেওয়া হয়েছে। একই ব্যাচের মোহসিনকে ফেনী এবং জোয়ারদার তাবেদুন নবীকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া গণপূর্ত বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগে পদায়নের ক্ষেত্রে কী ধরনের মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে? জ্যেষ্ঠতা, অভিজ্ঞতা, পূর্ববর্তী কর্মস্থল, প্রশাসনিক দক্ষতা ও শূন্যপদের বিবেচনা কীভাবে করা হয়েছে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
তবে সরকারি চাকরিতে পদায়নের ক্ষেত্রে শুধু ব্যাচ বা জ্যেষ্ঠতাই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়। প্রশাসনিক প্রয়োজন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অভিজ্ঞতা, পদায়নযোগ্যতা এবং প্রযোজ্য বিধিবিধান বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল কি না, তা যাচাই করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত।
ই/এম শাখায়ও একই প্রশ্ন, সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্তদের ঢাকায় পদায়ন
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল (ই/এম) শাখার নির্বাহী প্রকৌশলীদের পদায়ন নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩২তম ব্যাচের জুবায়েরকে ঢাকা ই/এম বিভাগ-২, রুহুল আমিনকে ঢাকা ই/এম বিভাগ-১০ এবং সামিরাকে ঢাকা ই/এম বিভাগ-১২-তে পদায়ন করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, তিনজনই সম্প্রতি নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন।
অন্যদিকে, ২৮তম ও ৩০তম ব্যাচের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ ই/এম কর্মকর্তা ঢাকায় পদায়ন পাননি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ নিয়ে অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগে দায়িত্ব পেলেও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে একই ধরনের সুযোগ কেন তৈরি হয়নি?
তাঁদের দাবি, ই/এম শাখায়ও পদায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ, সুনির্দিষ্ট ও অভিন্ন মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পদোন্নতির তারিখ, পূর্ববর্তী কর্মস্থল, অভিজ্ঞতা এবং পদায়নের প্রশাসনিক কারণ তুলনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি পরিষ্কার হতে পারে।
গ্রেডিং ও পদায়নের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেই স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ
পদায়নের জন্য কর্মকর্তাদের ক্যাটাগরি বা গ্রেডিং নির্ধারণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বিপ্লব, নির্বাহী প্রকৌশলী আ ন ম মাজহারুল ইসলাম এবং নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জিয়াউর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, দায়িত্বপ্রাপ্ত কয়েকজন কর্মকর্তা নিজেদের জন্য উচ্চতর ক্যাটাগরি নির্ধারণ করে গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পদায়ন নিয়েছেন। তাঁদের দেওয়া তথ্যে আ ন ম মাজহারুল ইসলামকে নির্বাহী প্রকৌশলী, সংস্থাপন-১ এবং মো. জিয়াউর রহমানকে নির্বাহী প্রকৌশলী, সংস্থাপন-২ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, যাঁদের ওপর পদায়নপ্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল, তাঁদের বিরুদ্ধেই যদি নিজেদের সুবিধা নিশ্চিত করার অভিযোগ ওঠে, তাহলে পুরো প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
এ ক্ষেত্রে গ্রেডিংয়ের মূল নথি, কর্মকর্তাদের দেওয়া নম্বর, ক্যাটাগরি নির্ধারণের লিখিত মানদণ্ড, দায়িত্ব বণ্টনের আদেশ এবং লটারির কার্যবিবরণী যাচাই করা জরুরি। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিজেদের মূল্যায়ন বা পদায়নের সিদ্ধান্তে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন কি না, সেটিও তদন্তে খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
শেরেবাংলা নগরের গুরুত্বপূর্ণ দুই বিভাগে পদায়ন নিয়ে বিশেষ প্রশ্ন
অভিযোগকারীরা আ ন ম মাজহারুল ইসলাম ও মো. জিয়াউর রহমানের পদায়নকে বিশেষভাবে সামনে এনেছেন। তাঁদের দাবি, পদায়নপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত এই দুই কর্মকর্তা শেষ পর্যন্ত শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-১ ও বিভাগ-২-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পেয়েছেন।
শেরেবাংলা নগর এলাকার এসব বিভাগের আওতায় জাতীয় সংসদ ভবন, সংসদ সদস্যদের আবাসনসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনার নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট কাজ পরিচালিত হয়। ফলে এসব কর্মবিভাগে পদায়নের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং দায়িত্ব পালনের পূর্ববর্তী রেকর্ড গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অতীত কর্মস্থল, অভিজ্ঞতা, গ্রেডিং এবং পদায়নপ্রক্রিয়ায় তাঁদের ভূমিকা যাচাই করা হলে সিদ্ধান্তগুলোর যৌক্তিকতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা স্বাধীন তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
একই কর্মকর্তার বারবার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে দায়িত্ব পালনের অভিযোগ
ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগে কয়েকজন কর্মকর্তার ধারাবাহিক পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজিবুল ইসলাম আগে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১, রাজউকে অথরাইজড অফিসার এবং রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ উপবিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে মহাখালী গণপূর্ত বিভাগ থেকে আবার ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১-এ পদায়ন পেয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
আ ন ম মাজহারুল ইসলাম আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩, রেলওয়ে ডিভিশন-সংশ্লিষ্ট উপবিভাগসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থানে দায়িত্ব পালন করেছেন বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
মাসুদ রানার পদায়ন নিয়েও একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের তথ্য অনুযায়ী, তিনি আগে শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-৩ এবং পরে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৪-এ দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ গণপূর্ত বিভাগে পদায়ন করা হয়েছে বলে তালিকায় উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, একই কর্মকর্তাদের বারবার গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে কী নীতি অনুসরণ করা হয়েছে? তাঁদের দায়িত্ব পালনের মেয়াদ, অতীত পদায়নের ধারাবাহিকতা এবং অন্য কর্মকর্তাদের তুলনায় সুযোগ পাওয়ার ধরন বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।
তবে একই কর্মকর্তার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করাই অনিয়মের প্রমাণ নয়। সংশ্লিষ্ট পদায়নগুলো প্রশাসনিক প্রয়োজন, প্রযোজ্য বিধি এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে করা হয়েছিল কি না, সেটিই যাচাইয়ের মূল বিষয়।
রাশেদ হাসানের পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন
অভিযোগকারীদের সরবরাহ করা তথ্যে রাশেদা হাসান নামের এক কর্মকর্তার পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগে তাঁকে সাবেক মন্ত্রী শরিফ আহমেদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, ময়মনসিংহে দায়িত্ব পালনের পর তিনি মিরপুরে এবং পরবর্তী সময়ে আজিমপুরে পদায়ন পান।
অভিযোগকারীরা তাঁর পদায়নের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি। এ কারণে এ অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সংশ্লিষ্ট পদায়ন আদেশ, প্রশাসনিক সুপারিশ, যোগ্যতার মূল্যায়ন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া যাচাই করেই অভিযোগটির সত্যতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
ঢাকার বাইরে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পদায়ন, ২৭তম ব্যাচের কর্মকর্তারাও আলোচনায়
প্রাপ্ত তালিকায় ঢাকার বাইরে পদায়ন পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন ২৭তম ব্যাচের আতিকুল ইসলাম (কুড়িগ্রাম), আব্দুস সাত্তার (লালমনিরহাট), মোহসিন (ফেনী) এবং জোয়ারদার তাবেদুন নবী (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)। এ ছাড়া ২৪তম ব্যাচের স্বর্ণেন্দু শেখর মণ্ডলের মেহেরপুরে পদায়নের তথ্যও দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগকারীদের বক্তব্য, একদিকে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে অপেক্ষাকৃত নবীন কর্মকর্তাদের পদায়ন, অন্যদিকে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের জেলা পর্যায়ে পাঠানোর ঘটনা পদায়ননীতির প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
তাঁদের দাবি, কর্মকর্তাদের ব্যাচ, জ্যেষ্ঠতা, অভিজ্ঞতা ও অতীত কর্মস্থলের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে পদায়নের যৌক্তিকতা যাচাই করা হোক। একই সঙ্গে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে পদায়নের জন্য কী কী যোগ্যতা ও মানদণ্ড বিবেচনা করা হয়েছে, তা প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
নিয়োগবিধি, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক ন্যায্যতা কি উপেক্ষিত?
বদলি-পদায়ন বিতর্কের পাশাপাশি সরকারি চাকরির বিধিবিধান, পদোন্নতির শর্ত এবং প্রশাসনিক ন্যায্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ব্যাচ, জ্যেষ্ঠতা ও অভিজ্ঞতার তুলনামূলক মূল্যায়ন ছাড়াই কয়েকজন কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে বদলি-পদায়ন, নিয়োগ ও পদোন্নতি পৃথক প্রশাসনিক বিষয়। কোনো পদায়নকে বিধিবহির্ভূত বলতে হলে সংশ্লিষ্ট আদেশ, প্রযোজ্য বিধি, পদায়নযোগ্যতার শর্ত এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া যাচাই করা জরুরি।
অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রমাণিত হলে তা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে, পদায়নগুলো বিধি ও প্রশাসনিক প্রয়োজন অনুযায়ী করা হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথিভিত্তিক ব্যাখ্যা বিতর্ক নিরসনে সহায়ক হবে।
১২০ কোটি টাকা অবৈধ আয়ের অভিযোগ, আর্থিক লেনদেন তদন্তের দাবি
পদায়নপ্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে ১২০ কোটি টাকা অবৈধভাবে আয়ের অভিযোগ পুরো ঘটনাকে আরও গুরুতর করে তুলেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগসহ পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নকে কেন্দ্র করে অনিয়মের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে এবং এ-সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তদন্ত করা প্রয়োজন।
তবে ১২০ কোটি টাকা অবৈধ আয়ের দাবির পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা আর্থিক নথি বা প্রমাণ এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগটিকে প্রমাণিত আর্থিক অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ নেই।
অভিযোগটির সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্টদের সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক লেনদেন, আর্থিক নথি, পদায়নসংক্রান্ত যোগাযোগ এবং অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করা যেতে পারে। প্রয়োজনীয় প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
তাঁদের বক্তব্য, পদায়নপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ এবং বিপুল অঙ্কের অর্থ অবৈধভাবে আয়ের দাবিকে আলাদাভাবে ও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অভিযোগের ভিত্তি না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের অবস্থান পরিষ্কার করার সুযোগ থাকা উচিত।
মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়ন নিয়ে ওঠা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।
তাঁদের দাবি, পদায়নের পুরো প্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। লটারি কীভাবে পরিচালিত হয়েছে, কারা কর্মকর্তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন, গ্রেডিং ও ক্যাটাগরি নির্ধারণের মানদণ্ড কী ছিল এবং ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগে পদায়নের সিদ্ধান্ত কোন ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে—এসব প্রশ্নের নথিভিত্তিক জবাব প্রয়োজন।
অভিযোগকারীরা আরও যেসব পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন, সেগুলো হলো—
১. লটারির মূল তালিকা, বাক্সভিত্তিক নামের তালিকা এবং কার্যবিবরণী সংগ্রহ করে যাচাই করা।
২. কর্মকর্তাদের ব্যাচ, জ্যেষ্ঠতা, পদোন্নতির তারিখ, পূর্ববর্তী কর্মস্থল ও বর্তমান পদায়নের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা।
৩. ক্যাটাগরি নির্ধারণ ও গ্রেডিংয়ের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকা পর্যালোচনা করা।
৪. ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে পদায়নের প্রশাসনিক কারণ, শূন্যপদের বিবরণ এবং প্রযোজ্য মানদণ্ড প্রকাশ করা।
৫. ১২০ কোটি টাকা অবৈধ আয়ের অভিযোগের পক্ষে আর্থিক ও অন্যান্য প্রমাণ যাচাই করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে অনুসন্ধানের ব্যবস্থা করা।
৬. অভিযোগে নাম আসা কর্মকর্তাদের বক্তব্য গ্রহণ করা এবং তদন্তের ফলাফল যথাযথভাবে প্রকাশ করা।
জবাবদিহি নিশ্চিত হবে, নাকি প্রশ্ন থেকেই যাবে?
গণপূর্ত অধিদপ্তর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে। এ প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগে পদায়ন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠা তাই শুধু দাপ্তরিক বিষয় নয়, জনস্বার্থের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। বিশেষ করে জাতীয় সংসদ ভবন, সরকারি আবাসন, হাসপাতাল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা বিভাগগুলোতে পদায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি।
অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে তা বদলি-পদায়নের অনিয়মের বাইরেও প্রশাসনিক জবাবদিহি, সরকারি চাকরির বিধিবিধানের প্রয়োগ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থার প্রশ্ন তৈরি করবে। আর অভিযোগগুলো অসত্য বা তথ্যগতভাবে অসম্পূর্ণ হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য, দাপ্তরিক নথি এবং স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ থাকা উচিত।
সব মিলিয়ে, লটারির নামে পূর্বনির্ধারিত পদায়ন, গ্রেডিংয়ে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত, একই কর্মকর্তার বারবার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে দায়িত্ব পাওয়া এবং ১২০ কোটি টাকা অবৈধ আয়ের অভিযোগ—প্রতিটি বিষয়ই পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী না করে নথি, আর্থিক তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্যের ভিত্তিতে তদন্ত পরিচালনা করাই হবে ন্যায়সংগত পন্থা।
এখন দেখার বিষয়, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে কত দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের উদ্যোগ নেয়। লটারির প্রকৃত প্রক্রিয়া ও পদায়নের ভিত্তি প্রকাশ করা হলে বিতর্কের অবসান ঘটতে পারে, আর অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পথও উন্মুক্ত হবে।
