কাজের চাপ বেশি, তবু উৎপাদনশীলতায় পিছিয়ে নেই নারীরা; আড্ডা, কর্মঘণ্টা ও ছুটির দিনের কাজ নিয়ে যা বলছে জরিপ। প্রতীকী ছবি
অফিসের টেবিলে কে বেশি সময় কাজ করেন, কার ওপর দায়িত্বের চাপ বেশি আর কাজের পরিমাণেই বা এগিয়ে কে—নারী, নাকি পুরুষ? কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা নিয়ে এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রায়ই সামনে আসে নানা প্রচলিত ধারণা। তবে সম্প্রতি প্রডাক্টিভিটি প্ল্যাটফর্ম ‘হাইভে’র এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চমকপ্রদ কিছু তথ্য। ৩ হাজারের বেশি কর্মজীবী নারী ও পুরুষের ওপর বেনামি জরিপের ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদনটি বলছে, কাজের পরিমাণ ও দায়িত্বের চাপের ক্ষেত্রে নারীরা এগিয়ে রয়েছেন।
কর্মক্ষেত্রে কাজের ধরন, দায়িত্ব বণ্টন, সহকর্মীদের সঙ্গে আড্ডা এবং ছুটির দিনের উৎপাদনশীলতা—সব মিলিয়ে নারী ও পুরুষের কাজের অভ্যাসের বেশ কিছু পার্থক্য তুলে ধরেছে এই জরিপ।
কাজের পরিমাণে এগিয়ে নারীরা
হাইভের জরিপ অনুযায়ী, আধুনিক কর্মক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় নারীদের প্রায় ১০ শতাংশ বেশি কাজ বরাদ্দ দেওয়া হয়। অথচ নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ—উভয়ের হারই প্রায় ৬৬ শতাংশ।
অর্থাৎ, নারীদের ওপর তুলনামূলক বেশি কাজের চাপ থাকলেও নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন করার হারে তারা পুরুষদের সমপর্যায়ে রয়েছেন। কাজের এই পরিসংখ্যান কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব বণ্টন ও উৎপাদনশীলতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে বেশি কাজ বরাদ্দ পাওয়া মানেই সব ক্ষেত্রে বেশি দক্ষতা—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে কাজের ধরন, দায়িত্বের জটিলতা এবং কর্মপরিবেশের মতো বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
কেন নারীদের কাঁধে বেশি কাজের চাপ?
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, নারীদের এমন কিছু কাজে বেশি সময় দিতে হয়, যেগুলো প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারে পদোন্নতি বা পেশাগত অগ্রগতিতে সরাসরি ভূমিকা রাখে না।
সহকর্মীদের সহযোগিতা করা, দলীয় সমন্বয় বজায় রাখা কিংবা দৈনন্দিন সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের মতো কাজের চাপ নারীদের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়তে পারে। অন্যদিকে, কিছু ক্ষেত্রে পুরুষ কর্মীরা যেসব দায়িত্ব এড়িয়ে যান, সেগুলোও নারীদের ওপর এসে পড়ার প্রবণতা দেখা যায়।
ফলে প্রতিষ্ঠানের কাজে অবদান রাখলেও নারীদের সেই শ্রম সব সময় ব্যক্তিগত অর্জন, স্বীকৃতি কিংবা পদোন্নতিতে সমানভাবে প্রতিফলিত হয় না। কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব বণ্টনের পাশাপাশি এই অদৃশ্য শ্রমের মূল্যায়নও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা।
আড্ডায় এগিয়ে কারা, প্রভাব পড়ে কাজে কতটা?
কাজের ফাঁকে সহকর্মীদের সঙ্গে গল্প, চা-পানের বিরতি কিংবা সামান্য আড্ডা—অফিসজীবনের পরিচিত অংশ। তবে এসব বিরতি কর্মীদের মনোযোগ ও উৎপাদনশীলতায় কতটা প্রভাব ফেলে, তা নিয়েও রয়েছে নানা গবেষণা।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণার বরাতে বলা হয়েছে, কোনো কাজে বাধা সৃষ্টি হলে আগের মনোযোগ ও কাজের ধারায় ফিরতে প্রায় ২৫ মিনিট পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। অন্য একটি গবেষণায় আড্ডার কারণে সার্বিক উৎপাদনশীলতা প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।
হাইভের জরিপে দেখা যায়, নারীরা পুরুষদের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি আড্ডা দেন। তবে একই জরিপে তাদের ওপর বেশি কাজের চাপ থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে। ফলে শুধু আড্ডার সময় হিসাব করে কর্মদক্ষতা নির্ধারণ করা যায় না; কাজের ধরন, বিরতির সময় এবং সম্পন্ন কাজের পরিমাণও বিবেচনায় নিতে হয়।
আড্ডার ধরনেও রয়েছে পার্থক্য। নারীরা সাধারণত সামনাসামনি বা একান্তে কথোপকথনে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। অন্যদিকে, ডিজিটাল গ্রুপ চ্যাটে পুরুষদের অংশগ্রহণ কিছুটা বেশি হতে পারে। তবে গ্রুপ চ্যাটে নারীদের কম অংশগ্রহণের পেছনে সামাজিক পরিবেশ, যোগাযোগের ধরন ও স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়গুলো কতটা ভূমিকা রাখে, তা আলাদাভাবে বিবেচনার দাবি রাখে।
ছুটির দিনে বেশি কাজ করলেই কি বাড়ে উৎপাদনশীলতা?
সাপ্তাহিক ছুটির দিনে অফিসের ব্যস্ততা ও সহকর্মীদের আনাগোনা কম থাকায় অনেকেই মনে করেন, এ সময় কাজের গতি বাড়ে। কিন্তু হাইভের জরিপে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছুটির দিনে পুরুষরা নারীদের তুলনায় কিছুটা বেশি সময় কাজ করলেও কাজের প্রকৃত আউটপুট বা উৎপাদনশীলতায় তারা নারীদের চেয়ে পিছিয়ে থাকেন।
এ থেকে বোঝা যায়, শুধু কাজের পেছনে ব্যয় করা সময় দিয়ে উৎপাদনশীলতা পরিমাপ করা যথেষ্ট নয়। বরং নির্দিষ্ট সময়ে কতটা কাজ সম্পন্ন হচ্ছে, কাজের মান কেমন এবং নির্ধারিত লক্ষ্য কতটা পূরণ হচ্ছে—এসব সূচকও গুরুত্বপূর্ণ।
কর্মদিবসের সবচেয়ে কার্যকর সময় কখন?
অফিসে সারাদিন একই রকম মনোযোগ ও কর্মস্পৃহা বজায় রাখা সবার জন্যই কঠিন। দিনের নির্দিষ্ট সময়ে কর্মীদের কাজের গতি বাড়ে, আবার সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ক্লান্তিও ভর করতে পারে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সাধারণত সকাল ১০টার দিকে কর্মীদের কাজের গতি ও কর্মস্পৃহা সবচেয়ে বেশি থাকে। অন্যদিকে, বিকেল ৪টার দিকে অনেকের ক্লান্তি বাড়তে শুরু করে এবং কাজের গতি কমে আসে।
তবে ব্যক্তিভেদে কর্মক্ষমতার সময় আলাদা হতে পারে। কাজের ধরন, ঘুম, শারীরিক অবস্থা, কর্মপরিবেশ এবং ব্যক্তিগত অভ্যাসও উৎপাদনশীলতায় প্রভাব ফেলে।
কর্মক্ষেত্রে নতুন করে ভাবার সময়
হাইভের জরিপে উঠে আসা তথ্য নারী-পুরুষের কাজের ধরন ও দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে নতুন আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। নারীদের ওপর তুলনামূলক বেশি কাজের চাপ, প্রতিষ্ঠানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অথচ ক্যারিয়ার গঠনে কম স্বীকৃত দায়িত্ব এবং কাজের প্রকৃত ফলাফল—সবকিছুই কর্মক্ষেত্রের উৎপাদনশীলতা মূল্যায়নে বিবেচনা করা জরুরি।
তবে এই ফলাফলকে সব প্রতিষ্ঠান বা সব কর্মজীবী নারী-পুরুষের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। জরিপের পদ্ধতি, অংশগ্রহণকারীদের কর্মক্ষেত্র এবং কাজের ধরনও ফলাফল ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, কর্মক্ষেত্রে কে নারী আর কে পুরুষ—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে কে কতটা দায়িত্ব পালন করছেন, কী পরিমাণ কাজ সম্পন্ন করছেন এবং সেই কাজের যথাযথ স্বীকৃতি পাচ্ছেন কি না। উৎপাদনশীলতার প্রকৃত মূল্যায়নে এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
