যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস, গ্রেপ্তার ৭; পাঁচজনই সরকারি কর্মচারী। ওপরে বাঁ থেকে নূর মোহাম্মদ, জাহাঙ্গীর ও আসাদুল ইসলাম- নিচে বাঁ থেকে ইমদাদুল, মফিজুল, রুবেল ইসলাম ও হাসিনুর রহমান। ছবি: এসআরবি
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় নতুন চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দুই কম্পিউটার অপারেটরসহ সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাঁচ কর্মচারী এবং আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে এসআরবি-৩। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, পরীক্ষার দিন ভোরে প্রশ্নপত্রের ছবি সংগ্রহ, উত্তর প্রস্তুত এবং তা বিভিন্ন মাধ্যমে পরীক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে একাধিক ব্যক্তি যুক্ত ছিলেন।
গত বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের মধ্যে এনবিআরের তিন কর্মচারী, পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন করে কর্মচারী রয়েছেন। এ ঘটনায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের উৎস, সরবরাহের বিভিন্ন ধাপ এবং এর সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।
শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন।
গ্রেপ্তার যাঁরা
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম ও জাহাঙ্গীর, একই প্রতিষ্ঠানের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ, পরিবেশ অধিদপ্তরের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলাম, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম, চক্রের সদস্য হাসিনুর রহমান সুজন এবং চাকরিপ্রার্থী মো. মফিজুল ইসলাম।
তাঁদের কাছ থেকে ১০০ টাকা মূল্যমানের ১১৬টি ও ৫০ টাকা মূল্যমানের চারটি স্ট্যাম্প, এক সেট প্রশ্নপত্র, বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্র ও সনদপত্র, বিভিন্ন ব্যাংকের চেক, আটটি মোবাইল ফোন, ছয়টি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং নগদ চার হাজার টাকা জব্দ করা হয়েছে।
ভোরে প্রশ্নপত্রের ছবি, পরে উত্তর তৈরি করে বিতরণ
এসআরবি-৩-এর তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষার দিন ভোর পৌনে ৫টার দিকে একটি সূত্র থেকে প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি পান এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ। পরে সকাল সোয়া ৬টার দিকে এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর তাঁকে প্রশ্নপত্রের স্পষ্ট ছবি পাঠান। নূর মোহাম্মদ ওই প্রশ্নপত্রের উত্তর প্রস্তুত করে জাহাঙ্গীর ও এস এম ইমদাদুল ইসলামের কাছে পাঠান।
এরপর চক্রের সদস্যরা নিজেদের এবং প্রশ্নপত্র বিতরণের কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে উত্তরসহ প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে দেন বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।
এ কাজে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম, পরিবেশ অধিদপ্তরের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর রুবেল ইসলাম, চাকরিপ্রার্থী মফিজুল ইসলাম এবং পরীক্ষার্থী সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা হাসিনুর রহমান সুজন যুক্ত ছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পেয়েছে এসআরবি।
যেভাবে ধরা পড়েন সাতজন
এসআরবি-৩ জানায়, গত বুধবার মতিঝিল এলাকা থেকে রুবেল ইসলাম, মফিজুল ইসলাম ও হাসিনুর রহমান সুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। রুবেল পরিবেশ অধিদপ্তরের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর এবং মফিজুল চাকরিপ্রার্থী।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, মফিজুল এ চক্রের এক সদস্যকে ১৭ লাখ টাকা দিয়ে প্রতারিত হয়েছিলেন। পরে আরও অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে তিনি চক্রটির সঙ্গে যুক্ত হন বলে তদন্তকারীদের ধারণা।
গ্রেপ্তার তিনজনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের একজন এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম। তাঁকে ঢাকার উত্তরখান থেকে এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলামকে মিরপুর-১০ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এরপর সাভার থেকে এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদকে এবং শুক্রবার সকালে মোহাম্মদপুর থেকে এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রশ্ন ফাঁসের মূল উৎস কোথায়?
প্রশ্নপত্র ফাঁসের উৎস সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে নূর মোহাম্মদ জানিয়েছিলেন, তিনি ফেসবুকের মাধ্যমে প্রশ্নটি পেয়েছেন। পরে প্রশ্নটি জাহাঙ্গীরকে দেন। তবে তাঁর দেওয়া তথ্য সঠিক বলে মনে হয়নি। আমাদের তদন্ত চলছে। সরকারি একাধিক কর্মচারীর নাম এসেছে। কোনো কর্মকর্তা জড়িত আছেন কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। মূলত যে জায়গা থেকে প্রশ্নটি ফাঁস হয়েছে, সেটি বের করার চেষ্টা চলছে।
তিনি আরও বলেন, এই প্রশ্ন ফাঁসের একাধিক ধাপ রয়েছে। নূর মোহাম্মদ অন্য একজনের মাধ্যমে প্রশ্নটি পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তার জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি।
এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক জানান, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় একটি মাত্র চক্র জড়িত—বিষয়টি এমন নয়। বিভিন্ন স্তরে একাধিক চক্র এ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকতে পারে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে নূর মোহাম্মদকে আপাতত মূল হোতা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। চক্রের সদস্যরা আলাদাভাবে যোগাযোগ করতেন এবং নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের বিষয়টি গোপন রাখতেন।
চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া হতো ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা
প্রাথমিক তদন্তে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে আট থেকে ১০ লাখ টাকা করে নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানান লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন। তবে একেকজনের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের পরিমাণ ভিন্ন ছিল। এ বিষয়ে আরও তদন্ত চলছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং উদ্ধার করা আলামত বিশ্লেষণ করে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল উৎস, প্রশ্নপত্র সরবরাহের বিভিন্ন ধাপ ও এর সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের নাম আসায় তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। তবে প্রশ্নপত্রটি ঠিক কোথা থেকে ফাঁস হয়েছে, এর পেছনে আর কারা রয়েছেন এবং অর্থ লেনদেনের পুরো নেটওয়ার্ক কতটা বিস্তৃত—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো তদন্তের অপেক্ষায়।
