সোমবার, ১৯শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ভক্তি, ঐতিহ্য আর তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে জমজমাট শারদীয় দুর্গোৎসব

নিজস্ব প্রতিবেদক
অক্টোবর ১৯, ২০২৬ ১:৪৮ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

রাজধানীর পূজামণ্ডপে প্রতিমা দর্শন, অঞ্জলি, আড্ডা ও ছবি তোলায় মেতেছেন নানা বয়সী মানুষ। ছবি: সংগৃহীত

কেউ দেবী প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে মেতে উঠেছেন প্রাণখোলা আড্ডায়। আবার কেউ ব্যস্ত মণ্ডপের বর্ণিল সাজসজ্জা ঘিরে ভিডিও ও রিলস তৈরিতে। এরই মধ্যে মাইকে ভেসে আসছে মন্ত্রপাঠের ধ্বনি, শুরু হচ্ছে পুষ্পাঞ্জলির প্রস্তুতি। মুহূর্তেই থেমে যাচ্ছে ছবি তোলা ও আড্ডা। ভক্তিভরে প্রার্থনায় শামিল হচ্ছেন তরুণ-তরুণীসহ সব বয়সী মানুষ।

ভক্তি, পারিবারিক বন্ধন, ধর্মীয় ঐতিহ্য আর তারুণ্যের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে রাজধানীর পূজামণ্ডপগুলোতে এভাবেই উদযাপিত হচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসব। গতকাল বনানী, মৌচাক, রমনা ও রামপুরাসহ বিভিন্ন এলাকার মন্দির ও পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা যায়, প্রতিমা দর্শন ও ধর্মীয় আচার পালনের পাশাপাশি উৎসবকে ঘিরে মানুষের আনন্দ-উচ্ছ্বাসে তৈরি হয়েছে প্রাণবন্ত পরিবেশ।

বনানীর কামাল আতাতুর্ক পার্কে গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশনের আয়োজনে এবার মণ্ডপের মূল ভাবনা ‘জলজ’। জলকে জীবন ও সৃষ্টির উৎস হিসেবে তুলে ধরতে বাঁশ, বেত, পাট ও প্রাকৃতিক তন্তু দিয়ে সাজানো হয়েছে মণ্ডপ। নকশায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ঢেউ, জলপ্রপাত ও জলাশয়ের আবহ। পদ্মফুলের আদলে নির্মিত কাঠামোর কেন্দ্রে স্থাপন করা হয়েছে দেবী দুর্গার প্রতিমা, পেছনে রয়েছে শঙ্খের অনুষঙ্গ। শিল্পী পার্থপ্রতিম সাহা ও স্থপতি অমিতি কুণ্ডুর পরিকল্পনা এবং তত্ত্বাবধানে নির্মিত এ মণ্ডপে ধর্মীয় ভাবনার পাশাপাশি গুরুত্ব পেয়েছে প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তা।

সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরেও পূজার আনুষ্ঠানিকতা ঘিরে ভক্তদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ব্যস্ত সড়ক ও বিপণিবিতানের কাছাকাছি অবস্থিত এ মন্দিরে বিভিন্ন বয়সী মানুষ আসছেন প্রতিমা দর্শন ও প্রার্থনা করতে। সন্ধ্যার আলোকসজ্জায় মন্দির প্রাঙ্গণ হয়ে উঠছে আরও বর্ণিল, ছড়িয়ে পড়ছে উৎসবের আমেজ।

মন্দিরে মাঝবয়সী অনর্ব দত্তকে দেখা গেল মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে দেবী প্রতিমার সামনে ছবি তুলতে। তাঁর স্ত্রী দেশের বাইরে থাকায় পূজার আনন্দঘন মুহূর্তগুলো ছবি ও ভিডিও করে পাঠাচ্ছেন তাঁকে। অনর্ব বলেন, আমার স্ত্রী দেশের বাইরে আছেন। তাই যতটা সম্ভব ছবি তুলে ও ভিডিও করে তাঁকে পাঠাই। ফেসবুকেও ছবি দিই। সবার সঙ্গে পূজার আনন্দ ভাগাভাগি করতে ভালো লাগে।

অন্যদিকে, রমনা কালীমন্দিরের পূজা প্রাঙ্গণে বসেছে সপ্তাহব্যাপী মেলা। আলোকসজ্জায় সাজানো মেলার আশপাশে ঘুরছেন দর্শনার্থীরা। পুকুরপাড়ে কোথাও তরুণদের আড্ডা, কোথাও চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে গল্প, আবার কোথাও চলছে দলবেঁধে ছবি তোলার ব্যস্ততা। ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি মেলাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বাড়তি আনন্দের উপলক্ষ।

বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘উৎসব তো উৎসবই। বন্ধুদের সঙ্গে এ রকম প্রাণখোলা আড্ডা শুধু ঈদ আর পূজাতেই হয়।

রামপুরা-হাতিরঝিল সংলগ্ন পশ্চিম রামপুরার শ্রীশ্রী গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর মন্দিরেও পূজা উপলক্ষে জড়ো হচ্ছেন নানা বয়সী মানুষ। পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষে কেউ হাতিরঝিলের পাড়ে ছবি তুলছেন, কেউ আবার বন্ধুদের নিয়ে কাছাকাছি কফিশপে বসে আড্ডা দিচ্ছেন। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি ও মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে যোগ হয়েছে মানুষের হাসি-আনন্দ আর উৎসবের নানা আয়োজন।

মামাতো ভাইবোনদের সঙ্গে মন্দিরে ঘুরতে এসেছেন জয়ীতা মজুমদার। তিনি বলেন, ‘পূজার সময় বন্ধুদের সঙ্গে মণ্ডপে ঘুরতে ভালো লাগে। প্রতিমা দেখি, ছবি তুলি, রিলসও তৈরি করি। তবে অঞ্জলি দেওয়া ও পরিবারের সঙ্গে পূজায় আসার আনন্দ আলাদা। আমার কাছে পূজা মানে শুধু ঘোরাঘুরি নয়, সবার সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া।

বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া মেঘলা সেনের কাছেও পূজা মানে বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর বিশেষ উপলক্ষ। তাঁর ভাষ্য, ‘পূজার সময় বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার আলাদা আনন্দ আছে। সবাই একসঙ্গে সাজগোজ করে বের হই। পছন্দের মণ্ডপে ছবি তুলি, দেবী মায়ের ছবিটা আরও একটু সুন্দরভাবে নিজের ক্যামেরায় তোলার চেষ্টা করি, আবার পরিবারের সঙ্গেও পূজামণ্ডপে যাই। বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ করা আর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো—দুটোই আমার কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ধানমন্ডি ও মিরপুরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপেও স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি আশপাশের এলাকার মানুষের ভিড় দেখা যাচ্ছে। শিশুদের হাত ধরে প্রতিমা দর্শন, পরিচিতজনদের সঙ্গে কুশল বিনিময় কিংবা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সন্ধ্যায় মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানো—সবকিছুতেই ছড়িয়ে পড়ছে উৎসবের আনন্দ। দৈনন্দিন ব্যস্ততার মধ্যে পূজার দিনগুলো যেন এনে দিয়েছে স্বস্তি ও একসঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ।

এদিকে, কাল মহাষ্টমী। রাজধানীর বিভিন্ন মণ্ডপে পূজার আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি ছুটি শুরু হওয়ায় অনেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন পরিবারের কাছে বাড়ি ফেরার। তার আগে বন্ধুদের সঙ্গে মণ্ডপে ঘোরাঘুরি ও আড্ডায় সময় কাটাচ্ছেন অনেকে।

সৌরভ মন্ডল জানান, ছুটিতে পরিবারের সঙ্গে পূজা উদযাপন করতে বাড়ি যাব। তার আগে বন্ধুদের সঙ্গে মণ্ডপে ঘোরাঘুরি করে, আড্ডা দিচ্ছি। আবার ফিরে তো সেই রুটিন লাইফ কাটাতে হবে।

ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, প্রতিমার নান্দনিকতা, মণ্ডপের বর্ণিল সাজসজ্জা, বন্ধুদের আড্ডা আর পরিবারের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত—সব মিলিয়ে রাজধানীতে শারদীয় দুর্গোৎসব হয়ে উঠেছে ভক্তি ও আনন্দের সম্মিলিত আয়োজন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ উৎসবকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। পূজামণ্ডপে তাই একদিকে যেমন উচ্চারিত হচ্ছে মন্ত্র, অন্যদিকে তেমনি হাসি, গল্প আর স্মৃতির ফ্রেমে ধরা পড়ছে শারদীয় উৎসবের রঙিন মুহূর্তগুলো।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।