মঙ্গলবার, ২০শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বদলি বাণিজ্যে ছয় লাখ টাকার চুক্তি, এসএ পরিবহনে এক লাখ টাকা পাঠানোর অভিযোগ

চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি
অক্টোবর ২০, ২০২৬ ১১:২০ অপরাহ্ণ
Link Copied!

উপবন সংরক্ষক এমএ হাসানের নামে কুরিয়ার রসিদ, টাকা পাঠানোর কথা স্বীকার রেঞ্জ কর্মকর্তার; তদন্তের আশ্বাস বন সংরক্ষকের। ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রাম উপকূলীয় বনাঞ্চলে কর্মকর্তা বদলিকে কেন্দ্র করে ছয় লাখ টাকার ঘুষ চুক্তির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই চুক্তির অংশ হিসেবে এসএ পরিবহনের কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে এক লাখ টাকা পাঠানো হয়েছে চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপবন সংরক্ষক ও উপকূলীয় বন বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এমএ হাসানের নামে। এ লেনদেনের সমর্থনে একটি পার্সেল বুকিং রসিদ পাওয়ার দাবি করা হয়েছে। রসিদে প্রাপক হিসেবে এমএ হাসানের নাম, মোবাইল নম্বর এবং টাকার পরিমাণ হিসেবে এক লাখ টাকা উল্লেখ রয়েছে।

বদলিকে ঘিরে অর্থ লেনদেনের এমন অভিযোগে চট্টগ্রাম বন বিভাগের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম ও কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তবে অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

কুরিয়ার রসিদ সঠিক বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠান

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এসএ পরিবহনের একটি পার্সেল বুকিং রসিদে এমএ হাসানের নাম উল্লেখ রয়েছে। রসিদটির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কুরিয়ার সার্ভিসের কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে রসিদটি সঠিক বলে জানানো হয়।

বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপকূলীয় বন বিভাগের একটি রেঞ্জে বদলির জন্য একজন রেঞ্জ কর্মকর্তার সঙ্গে এমএ হাসানের ছয় লাখ টাকার ঘুষ চুক্তি হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই অর্থের অংশ হিসেবে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে এক লাখ টাকা পাঠানো হয় বলে তাঁদের দাবি। রসিদে প্রেরক হিসেবে বন বিভাগের একজন কর্মকর্তার নামও রয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে কুরিয়ার রসিদ সঠিক হওয়া বা টাকা পাঠানোর তথ্য পাওয়া গেলেই লেনদেনটি ঘুষের অর্থ ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অর্থ পাঠানোর প্রকৃত উদ্দেশ্য ও ছয় লাখ টাকার চুক্তির অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

টাকা পাঠানোর কথা স্বীকার, উদ্দেশ্য নিয়ে নীরব রেঞ্জ কর্মকর্তা

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা এমএ হাসানের কাছে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে টাকা পাঠানোর কথা স্বীকার করেছেন। তবে কী কারণে টাকা পাঠানো হয়েছিল, সে বিষয়ে তিনি কোনো ব্যাখ্যা দেননি।

বন বিভাগের এক রেঞ্জ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, এমএ হাসানের নিজস্ব একটি সিন্ডিকেট রয়েছে এবং চট্টগ্রাম বন বিভাগের কার্যক্রমে তাঁর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, এমএ হাসান বন সংরক্ষক (সিএফ) মিহির কুমার দের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এবং তাঁর অধীনে সুন্দরবনে কর্মরত থাকাকাল থেকেই দুজনের মধ্যে ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

ওই কর্মকর্তার অভিযোগ, ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করলে তার প্রমাণ থেকে যায়। এ কারণে ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা এড়াতে বিভিন্ন কর্মচারী, আত্মীয়স্বজন ও মধ্যস্থতাকারীদের ব্যবহার করে বদলি বাণিজ্যের অর্থ লেনদেন করা হয়।

তিনি আরও দাবি করেন, কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর ঘটনা নতুন নয়। বদলি বাণিজ্যের পাশাপাশি বাগান সৃজন প্রকল্পের অর্থ লেনদেনেও দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট লেনদেনের নথি, অর্থের উৎস ও গন্তব্য এবং বদলির আদেশের সঙ্গে অর্থ লেনদেনের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

প্রথমে অস্বীকার, পরে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া এমএ হাসানের

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপবন সংরক্ষক ও অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এমএ হাসান প্রথমে এসএ পরিবহনের মাধ্যমে কোনো টাকা গ্রহণ করেননি বলে জানান।

পরে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, কে দিয়েছে, তাকে সামনে আনেন। এই টাকা কেন নেওয়া হয়েছে, আপনাকে বলব না। আপনি যা ভাবার ভাবতে পারেন।

পরবর্তী প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, আপনার কোনো কাজ নেই? এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

প্রতিবেদন-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ফোনালাপ শেষ হওয়ার পরপরই এমএ হাসান কয়েকজন রেঞ্জ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। জরুরি কথা আছে জানিয়ে তাঁদের কাছে ভয়েস বার্তাও পাঠানো হয় বলে দাবি করেছেন এক রেঞ্জ কর্মকর্তা। তবে এ যোগাযোগের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে, প্রতিবেদন প্রকাশ না করার জন্য বন বিভাগের একজন কর্মকর্তা এবং একজন সংবাদকর্মীর মাধ্যমে এই প্রতিবেদকের কাছে সমঝোতার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল বলে জানা গেছে। প্রতিবেদক ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।

‘তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’ বন সংরক্ষক

অভিযোগের বিষয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি স্বীকার করেন, এমএ হাসান তাঁর অধীনে সুন্দরবনে কাজ করেছেন। তবে এমএ হাসানকে নিজের ‘ডান হাত’ হিসেবে অভিহিত করার দাবি নাকচ করে তিনি বলেন, কেউ তাঁকে ডান হাত বা বাম হাত বলতে পারেন। এমএ হাসান আমার ডান হাত ছিলেন না।

টাকা পাঠানোর কুরিয়ার সার্ভিসের রসিদ

কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে টাকা লেনদেনের অভিযোগ প্রসঙ্গে মিহির কুমার দে বলেন, এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তদন্তের মুখে বদলি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা

চট্টগ্রাম উপকূলীয় বনাঞ্চলে বদলিকে কেন্দ্র করে ছয় লাখ টাকার চুক্তির অভিযোগ এবং এসএ পরিবহনের রসিদে এক লাখ টাকা পাঠানোর তথ্য সামনে আসায় বিষয়টি তদন্তের দাবি রাখে। বিশেষ করে, অর্থ পাঠানোর উদ্দেশ্য, প্রেরক ও প্রাপকের ভূমিকা এবং সংশ্লিষ্ট বদলির সিদ্ধান্তের মধ্যে কোনো আর্থিক যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।

অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের নথি, অর্থের উৎস, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং বদলির আদেশ পর্যালোচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে অভিযোগে উল্লিখিত সিন্ডিকেট, বাগান সৃজন প্রকল্পে অর্থ লেনদেন এবং মধ্যস্থতাকারীদের ব্যবহারের দাবিগুলোও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে বন বিভাগের পক্ষ থেকে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তে প্রকৃত ঘটনা কীভাবে সামনে আসে এবং অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।