১৪ বছরেও চালু হয়নি গণপরিবহন প্রকল্প, এবার ছয় লেনের মহাসড়ক করতে অপসারণ হবে স্টেশন-বাস লেন। ফাইল ছবি
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নির্মাণকাজ, হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়, যাত্রীদের সীমাহীন দুর্ভোগ—শেষ পর্যন্ত চালুর আগেই ভেঙে ফেলার পথে দেশের প্রথম বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি)। গাজীপুরের জয়দেবপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত সাড়ে ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রকল্পের অবকাঠামো সরিয়ে সড়কটিকে ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এতে ইতোমধ্যে ব্যয় হওয়া ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকার অবকাঠামো পরিত্যক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এক দশকে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দেশের প্রথম বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) চালু না করেই ভেঙে ফেলার চিন্তা করছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। গত রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের চিঠিতে প্রকল্পটির পরবর্তী করণীয় জানানো হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, বিআরটি করিডোরের স্টেশন, লেন বিভাজকসহ অন্যান্য অবকাঠামো অপসারণ করে সড়কটিকে উভয় দিকে তিন লেন করে মোট ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তর করা হবে। পাশাপাশি দুটি দুই লেনের ওভারপাসকে চার লেনে উন্নীত করার কার্যক্রম নেওয়া যেতে পারে।
চালুর অপেক্ষা শেষ, এবার ভাঙার পালা
গাজীপুরের জয়দেবপুর থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত বাসের জন্য সাড়ে ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিশেষায়িত লেন নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল ২০১২ সালে। চার বছরে কাজ শেষ করার পরিকল্পনা থাকলেও ১৪ বছরেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। প্রকল্পের ব্যয় ২ হাজার ৩৯ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকায়।
বিআরটি পদ্ধতিতে বাস চলাচলের জন্য নির্ধারিত বিশেষ লেন থাকে। সেখানে অন্য যানবাহনের প্রবেশ নিষিদ্ধ। ফলে বাস অনেকটা ট্রেনের মতো বাধাহীনভাবে চলতে পারে। সড়কের মোড়গুলোতে ওভারপাস এবং সরু অংশে রয়েছে সাড়ে চার কিলোমিটার ফ্লাইওভার। উড়ালপথে ওঠার জন্য নির্মাণ করা হয়েছে র্যাম্প।
কিন্তু দীর্ঘ নির্মাণযজ্ঞ শেষে সেই বিশেষায়িত গণপরিবহন ব্যবস্থা চালুর পরিবর্তে অবকাঠামো সরিয়ে সাধারণ মহাসড়ক তৈরির সিদ্ধান্ত সামনে এসেছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ও পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জানান, সরকার বিআরটি প্রকল্প বাতিল, সংশ্লিষ্ট সংস্থা বিলুপ্ত এবং পুরো অবকাঠামোকে ছয় লেনের মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তাঁর মতে, ১৮ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিআরটি নিয়ে সবচেয়ে খারাপ বিকল্পটি বেছে নেওয়া হয়েছে। বৈঠক-পরবর্তী নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে সিদ্ধান্তটি জানানো না হওয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের একাংশের কিছু গোপন করার চেষ্টা নিয়ে জল্পনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় সুস্পষ্ট স্বার্থের সংঘাত রয়েছে বলেও মনে করে বিআইপি।
বিবৃতিতে বিআইপি এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে একে টেকসই, জ্বালানি-সাশ্রয়ী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণপরিবহনের ইতিহাসে ‘কালো দিন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। সংস্থাটির দাবি, সিদ্ধান্তটি ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারী এবং দেশি-বিদেশি নির্মাণ খাতের লবির স্বার্থের পক্ষে গেছে। একই সঙ্গে এটি গাজীপুর ট্রান্সপোর্ট মাস্টারপ্ল্যান (জিটিএমপি) ও ঢাকার সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার (আরএসটিপি) প্রস্তাবনার পরিপন্থি।
তিন বিআরটি, তিন মেট্রোরেল থেকে পরিকল্পনায় কাটছাঁট
২০০৪ সালে প্রণীত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি) ঢাকায় তিনটি বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) এবং তিনটি ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (মেট্রোরেল) লাইন নির্মাণের সুপারিশ করা হয়। সেই পরিকল্পনার আওতায় ২০১২ সালে গাজীপুরের জয়দেবপুর থেকে কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল পর্যন্ত ৪১ কিলোমিটার বিআরটি-৩ লাইন নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়।
কিন্তু বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন থেকে সরে যাওয়ায় প্রথম ধাপে জয়দেবপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত সাড়ে ২০ কিলোমিটার বিআরটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। নির্মাণকাজে ভোগান্তির কারণ দেখিয়ে বিমানবন্দর থেকে ঝিলমিল অংশের পরিকল্পনা আগেই বাতিল করা হয়।
গাজীপুর-বিমানবন্দর অংশের নির্মাণকাজ শুরু হয় প্রকল্প অনুমোদনের পাঁচ বছর পর, ২০১৭ সালে। কাজ চলাকালে ব্যস্ত টঙ্গী-জয়দেবপুর সড়কের যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। তখন নির্মাণকারী সরকারি কোম্পানি ঢাকা বিআরটি জানিয়েছিল, বাস লেন চালু হলে এ করিডোরে দিনে চার লাখ যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হবে।
তবে প্রকল্পের পরিকল্পনা নিয়েই তখন প্রশ্ন উঠেছিল। গাজীপুর থেকে আসা যাত্রীরা বিমানবন্দরে নেমে ঢাকার বাকি অংশে কীভাবে যাবেন, তা নিয়ে উদ্বেগ ছিল। বিমানবন্দর থেকে ঝিলমিল পর্যন্ত বিআরটি নির্মাণের পরিকল্পনা বাতিল হওয়ায় খণ্ডিত এই প্রকল্প যানজট কতটা কমাতে পারবে, তা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়।
মেট্রোরেলে গুরুত্ব, বিআরটি কি অবহেলার শিকার?
বাংলাদেশে বাস্তবায়িত না হলেও ভারত, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে মেট্রোরেলের তুলনায় অনেক কম ব্যয়ে বিআরটি চালু হয়েছে। নাম প্রকাশে অনাগ্রহী একাধিক বিশেষজ্ঞ সমকালকে বলেছেন, অত্যধিক ব্যয়ের মেট্রোরেলকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে বিআরটি বাতিল করা হচ্ছে।
দুজন বিশেষজ্ঞ সমকালকে বলেন, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রণীত ২০০৪ সালের এসটিপিতে ঢাকায় তিনটি বিআরটি ও তিনটি মেট্রোরেল নির্মাণের সুপারিশ ছিল। পরে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে এসটিপি সংশোধনের সময় বিআরটির সংখ্যা কমানো হয়।
২০১৫ সালে মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (আরএসটিপি) ছয়টি মেট্রোরেল ও দুটি বিআরটি নির্মাণের সুপারিশ করা হয়। এরপর বিআরটি-৩-এর অর্ধেক বাতিল করা হয়। বিআরটি-৭ প্রকল্পেও অগ্রগতি নেই।
বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, বিআরটির তুলনায় প্রায় ১০ গুণ ব্যয়ে নির্মিত মেট্রোরেলকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মেট্রোরেল প্রকল্পে জাইকার অর্থায়ন রয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একজন অধ্যাপক সমকালকে বলেছেন, মেট্রোরেল নিয়ে আগ্রহ বাড়ার পর বিআরটি বাতিলের পরিকল্পনা শোনা যাচ্ছে। অথচ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কম ব্যয় ও কম সময়ে বিআরটি নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে অনীহার পেছনে কোনো গোষ্ঠীর প্রভাব রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ভাঙা হবে ২৫ স্টেশন, ২৩ ফুট চওড়া বাস লেন
সরকারের সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে বিআরটি-৩ প্রকল্পের জন্য নির্মিত বিশেষায়িত লেন তুলে ফেলা হবে। সড়কের মাঝবরাবর ২৩ ফুট চওড়া করে নির্মিত বাস লেন অপসারণ করা হবে। ভেঙে ফেলা হবে সড়কের মাঝখানে নির্মিত ২৫টি স্টেশনও।
তবে নির্মিত চার কিলোমিটার ফ্লাইওভার থাকবে। উত্তরা ও টঙ্গীর মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী তুরাগ নদের ওপর নির্মিত ১০ লেনের সেতুটিও বহাল রাখা হবে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আইনি জটিলতা নিরসন ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে অবকাঠামো অপসারণ করে সড়কটিকে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।
চীনা দুই প্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজ, ব্যয় ১ হাজার ৭৯০ কোটি
২০১৬ সালের ডিসেম্বরে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী, ১৭ কিলোমিটার মূল করিডোর, ড্রেনেজ, নিচু অংশের লেন ও স্টেশন নির্মাণে চীনের প্রতিষ্ঠান চায়না গেঝুবা গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেডকে দিতে হয়েছে ৮৫৫ কোটি টাকা।
চীনের আরেক প্রতিষ্ঠান জিয়াংসু প্রভিন্সিয়াল ট্রান্সপোর্টেশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড সাড়ে চার কিলোমিটার ফ্লাইওভার নির্মাণে নিয়েছে ৯৩৫ কোটি টাকা।
বাকি অর্থ ব্যয় হয়েছে বাস ডিপো ও সংযোগ সড়ক নির্মাণ, ভূমি অধিগ্রহণ এবং বেতন-ভাতায়। বিআরটি-৩ বাতিল হলে মূল করিডোর, ড্রেনেজ, নিচু অংশের লেন ও স্টেশন নির্মাণে ব্যয় হওয়া ৮৫৫ কোটি টাকার অবকাঠামো পরিত্যক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব স্থাপনা অপসারণেও নতুন করে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হবে।
চার বিকল্পের মধ্যে শেষ পর্যন্ত ভাঙার সিদ্ধান্ত
প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সরকারের বিবেচনায় ছিল চারটি বিকল্প—
১. প্রকল্পের কাজ শেষ করে বিআরটি চালু করা। ২. ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাস রুট চালু করা। ৩. সড়কটিকে এক্সপ্রেসওয়েতে রূপান্তর করা। ৪. বিআরটির অবকাঠামো অপসারণ করে সাধারণ মহাসড়ক করা।
শেষ পর্যন্ত চতুর্থ বিকল্পটি বেছে নিয়েছে সরকার। ফলে দীর্ঘদিনের নির্মাণকাজ, যাত্রীদের দুর্ভোগ ও বিপুল বিনিয়োগের পর বিশেষায়িত গণপরিবহন ব্যবস্থা চালুর সম্ভাবনা কার্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
৯৭ শতাংশ অবকাঠামোগত কাজ শেষ, তবু বাস কেনা হয়নি
বর্ধিত সময় অনুযায়ী ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিআরটি প্রকল্প চালু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়েও বাস কেনা হয়নি।
ওই সময় প্রকল্পের অবকাঠামোগত কাজের ৯৭ শতাংশ শেষ হয়েছিল। এতে ব্যয় হয় ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। তবে প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ছিল ৭৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এরপর আর প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়নি।
অর্থাৎ অবকাঠামোর বড় অংশ নির্মিত হওয়ার পরও বাস না কেনা এবং প্রকল্পের সার্বিক কাজ শেষ না হওয়ায় বিআরটি চালু করা যায়নি। এখন সেই নির্মিত অবকাঠামো অপসারণের সিদ্ধান্তে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে জানতে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হককে ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
প্রকল্পটির চূড়ান্ত পরিণতি এখন নির্ভর করছে সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, আইনি প্রক্রিয়া এবং অবকাঠামো অপসারণের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। তবে ১৪ বছরের নির্মাণযজ্ঞের পর চালুর পরিবর্তে ভেঙে ফেলার পরিকল্পনা দেশের গণপরিবহন, উন্নয়ন ব্যয় ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
