৫০–৬০টি ভবনের ড্রেনেজের কাজ নিয়ে চাপ প্রয়োগ, অতিরিক্ত বিল আদায় ও বাড়ি দখলচেষ্টার অভিযোগ; অস্বীকার অভিযুক্তের। গ্রেফতারকৃত নয়ন। ফাইল ছবি
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের মাছের আড়ত থেকে চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে আদাবর থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক নয়ন হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাঁর গ্রেপ্তারের পর আদাবর এলাকার বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক ভবন ঘিরে চাঁদাবাজি, উন্নয়নকাজের ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ এবং বাড়ি দখলচেষ্টার একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) ডিবি নয়ন হোসেনকে গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আদাবরের মনসুরাবাদ হাউজিং এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আলোচনা, ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দেয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, ছাত্রদলের নাম ব্যবহার করে নয়ন ও তাঁর সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন।
ড্রেনেজের কাজ নিয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, আদাবরের মনসুরাবাদ হাউজিংয়ের ৬ নম্বর সড়কে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ব্যবস্থাপনায় রাস্তা ও ড্রেনেজ সংস্কারের কাজ চলছে। এই কাজকে কেন্দ্র করে সড়কটির প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি ভবনের পানি ও পয়োনিষ্কাশন লাইনের কাজ নিজেদের লোকজন দিয়ে করাতে ভবনমালিকদের ওপর চাপ প্রয়োগ করেন নয়ন ও তাঁর অনুসারীরা।
অভিযোগ রয়েছে, কাজ শেষ হওয়ার পর প্রতিটি ভবন থেকে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ দাবি করে আদায় করা হয়। তবে এসব অর্থ আদায়ের অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট কাজের প্রকৃত ব্যয় সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি।
৬ নম্বর সড়কের ৬৯ ও ৭০ নম্বর ভবনের নালার কাজের জন্য একতরফাভাবে ৫৫ হাজার টাকা দাবি করার অভিযোগ উঠেছে। ভবনমালিকেরা স্থানীয় ও অভিজ্ঞ মিস্ত্রি দিয়ে নিজেদের খরচে কাজ করাতে চাইলে চার-পাঁচজন ব্যক্তি বাধা দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁরা নিজেদের ছাত্রদল নেতা নয়নের লোক বলে পরিচয় দিয়েছিলেন বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।
দাবি করা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সংশ্লিষ্ট বাড়ির মালিককে প্রকাশ্যে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। পরে ভুক্তভোগী বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানান।
একই সড়কের আরেকটি ভবনের নিরাপত্তাকর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণ মিস্ত্রি দিয়ে প্রায় ১০ হাজার টাকায় সম্পন্ন করা সম্ভব এমন একটি কাজের জন্য তিন ধাপে জোরপূর্বক ২৩ হাজার ৫০০ টাকা আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কারখানা, ফুটপাত ও নির্মাণাধীন ভবনেও চাঁদার অভিযোগ
স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, নয়ন হোসেন এবং আদাবর থানা ছাত্রদলের সদস্যসচিব মনিরুজ্জামান মজুমদার জসিমের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নেতৃত্বে এলাকার বিভিন্ন এমব্রয়ডারি কারখানা, ফুটপাতের ক্ষুদ্র দোকান ও নির্মাণাধীন বহুতল ভবন থেকে নিয়মিত চাঁদা এবং মাসোহারা আদায় করা হতো।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় আদাবর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুম বাবুলের একটি আবাসিক বাড়ি দখলের চেষ্টার অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নয়নের অনুসারীরা বাড়িটি দখলে ব্যর্থ হয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালান। ওই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে ছাত্রদলের কয়েকজন স্থানীয় নেতাকে সক্রিয়ভাবে উপস্থিত থাকতে দেখা গিয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তবে ফুটেজের বিষয়বস্তু ও অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগ অস্বীকার জসিমের, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের দাবি
চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ছাত্রদলের সদস্যসচিব মনিরুজ্জামান মজুমদার জসিম। তাঁর দাবি, তিনি একটি বিরোধ মীমাংসার উদ্দেশ্যে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা পরিকল্পিতভাবে তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এদিকে গত মাসে মিরপুরের একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলার ঘটনার পর ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের অধীন আদাবর থানা কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। বিলুপ্ত কমিটির সাধারণ সম্পাদক আকরাম আহমেদ দাবি করেন, নয়নকে আদাবর এলাকা থেকে আটক করার কথা বলা হলেও পরে তাঁকে কারওয়ান বাজারের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, এটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অংশ।
প্রমাণের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার, অন্য অভিযোগও যাচাই হচ্ছে: ডিবি
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মো. জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ গণমাধ্যমকে জানান, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নয়, বরং সুনির্দিষ্ট প্রমাণ, তথ্য-উপাত্ত ও অভিযোগের ভিত্তিতেই নয়ন হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনি জানান, আদাবর এলাকায় আগে ঘটে যাওয়া চাঁদাবাজি ও দখলসংক্রান্ত অভিযোগগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তদন্তে অন্য কারও নাম বা অপরাধে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
আইন অনুযায়ী, ভয়ভীতি দেখিয়ে বা জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩৮৩ ধারায় চাঁদাবাজির সংজ্ঞা এবং ৩৮৪ ধারায় এর শাস্তির বিধান রয়েছে।
রাজনৈতিক পরিচয় বা সাংগঠনিক পদ ব্যবহার করে কেউ অপরাধে জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দারা বলে অভিযোগে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জোরালো হচ্ছে।
তবে অভিযোগ, রাজনৈতিক বক্তব্য ও প্রমাণিত অপরাধের মধ্যে পার্থক্য বজায় রেখে তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতেই দায় নির্ধারণ করা জরুরি। নয়ন হোসেনের বিরুদ্ধে কারওয়ান বাজারের চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি আদাবরের অন্যান্য অভিযোগের তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।
