শর্ত শিথিল, দরপত্রে বিতর্ক, সাব-কনট্রাক্টর নিয়ে প্রশ্ন—যানজট নিরসনের আধুনিক সিগন্যাল প্রকল্প ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ। ফাইল ছবি
রাজধানীর যানজট নিরসনে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রযুক্তিনির্ভর এ ব্যবস্থার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক মোড়গুলোতে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও নগরবাসীর ভোগান্তি কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বাস্তবায়নের পর্যায়ে এসে সেই উদ্যোগ ঘিরেই উঠেছে নানা প্রশ্ন। দরপত্রের শর্ত পরিবর্তন, অভিজ্ঞতার মানদণ্ড শিথিল, সরকারি প্রতিষ্ঠানের দরপত্র বাতিল এবং বিতর্কিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার অভিযোগে আলোচনায় এসেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ট্রাফিক সিগন্যাল আধুনিকায়ন প্রকল্প।
অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পের ৩৮টি ট্রাফিক সিগন্যালের মধ্যে ২৮টি পয়েন্টের প্রায় ৪২ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। অন্যদিকে, বাকি ১০টি সিগন্যালের কাজ কাগজে-কলমে নৌবাহিনীর মালিকানাধীন ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেডের নামে থাকলেও বাস্তবে সাব-কনট্রাক্টর হিসেবে বিআইটি টেকনোলজি ও কমব্যাক্ট ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে এসেছে।
প্রশ্ন উঠেছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও কীভাবে পুরোনো ঠিকাদারি বলয়ের প্রভাব অটুট থাকল? সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের, তাদের ভূমিকা নিয়েও তৈরি হয়েছে বিতর্ক। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ যাচাই ছাড়া সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
গুমের অভিযোগে অভিযুক্ত সাবেক কর্মকর্তার প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা নিয়ে বিতর্ক
২০১৩ সালে তৎকালীন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমন এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন ছাত্রদল নেতাসহ মোট সাতজন গুম হন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গঠিত গুম কমিশনের কাছে ওই ঘটনায় জড়িত থাকার বিষয়ে স্বীকারোক্তি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা কিসমৎ হায়াতের বিরুদ্ধে। প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি বর্তমানে ‘কমব্যাক্ট ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর মালিক।
এমন বিতর্কিত পটভূমির একজন সাবেক কর্মকর্তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সিটি করপোরেশনের উন্নয়ন প্রকল্পে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রকৃতি, কমিশনের নথি এবং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির প্রকৃত ধরন যাচাই করা জরুরি। শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো প্রতিষ্ঠানের অপরাধমূলক দায় প্রতিষ্ঠিত হয় না।
দরপত্রের শর্ত বদল: যোগ্য ঠিকাদার, নাকি পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ?
ডিএনসিসি সূত্র ও সরকারি ই-জিপি (e-GP) তথ্য অনুযায়ী, উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১০টি ইন্টারসেকশনের ট্রাফিক সিগন্যাল আধুনিকায়নে প্রথম দরপত্র আহ্বান করা হয় গত বছরের ৪ ডিসেম্বর। প্রথম দফায় চারটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিলেও উপযুক্ত ঠিকাদার না পাওয়ার কারণ দেখিয়ে দরপত্র বাতিল করা হয়।
এরপর দ্বিতীয় দফায় দরপত্র জমার শেষ সময় নির্ধারিত ছিল গত ৩ মে দুপুর ১টা। অভিযোগ অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়সীমার শেষ মুহূর্তে ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ ঠিকাদারের কাজের ন্যূনতম অভিজ্ঞতার আর্থিক মানদণ্ড বা এসএলটি (SLT) ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা করে। একই সঙ্গে দরপত্র জমার সময়সীমা আরও এক সপ্তাহ বাড়ানো হয়।
প্রশ্ন হলো, প্রথম দফায় উপযুক্ত ঠিকাদার না পাওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় অভিজ্ঞতার মানদণ্ড এতটা কমানোর যৌক্তিকতা কী ছিল? প্রকৃত প্রতিযোগিতা বাড়ানোর স্বার্থে এই পরিবর্তন করা হয়েছিল, নাকি নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানকে যোগ্যতার আওতায় আনতেই শর্ত শিথিল করা হয়—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দরপত্রে অংশগ্রহণ ও যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ দিতেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছিল। তবে এ অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে দরপত্রের মূল নথি, সংশোধিত শর্ত, অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত এবং মূল্যায়ন কমিটির কার্যবিবরণী পর্যালোচনা জরুরি।
রোড কাটার মেশিনের শর্তে বাদ সরকারি প্রতিষ্ঠান!
দ্বিতীয় দফার বর্ধিত সময়ে যৌথভাবে দরপত্র জমা দেয় কমব্যাক্ট ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিং, বিআইটি টেকনোলজি ও এম এস মাহাবুব অ্যান্ড ব্রাদার্স। অন্যদিকে, এককভাবে অংশ নেয় ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড।
অভিযোগ অনুযায়ী, অভিজ্ঞতার বিচারে এগিয়ে থাকা ডকইয়ার্ডের দরপত্রে মালামালের তালিকায় একটি সাধারণ ‘রোড কাটার মেশিন’ উল্লেখ না থাকায় কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি তাদের প্রস্তাব বাতিল করে।
এখানেই তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (PPR) অনুযায়ী, দরপত্রের কোনো বিচ্যুতি অপ্রধান হলে এবং তা মূল কারিগরি বৈশিষ্ট্য বা বাণিজ্যিক শর্তে মৌলিক পরিবর্তন না আনলে, প্রযোজ্য বিধান ও দরপত্রের শর্ত সাপেক্ষে সেটি বিবেচনার সুযোগ থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে একটি রোড কাটার মেশিনের উল্লেখ না থাকাকে কেন গুরুতর বিচ্যুতি হিসেবে বিবেচনা করা হলো, তা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে দেখতে হবে, ওই শর্ত অন্য দরদাতাদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়েছিল কি না। সরকারি প্রতিষ্ঠানের দরপত্র বাতিলের সিদ্ধান্ত যথাযথ কারিগরি যুক্তি ও বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিরপেক্ষ পর্যালোচনার দাবি রাখে।
তৃতীয় দফার দরপত্রে ডকইয়ার্ড, নেপথ্যে কারা?
পরবর্তী সময়ে তৃতীয় দফায় আবিদ মনসুর কনস্ট্রাকশন, কমব্যাক্ট ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিং ও এম এস মাহাবুব অ্যান্ড ব্রাদার্স যৌথভাবে দরপত্র জমা দেয়। অন্যদিকে, ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড আলাদাভাবে অংশ নেয়। এ পর্যায়ে বিআইটি টেকনোলজি সরাসরি অংশ না নিলেও পুরো প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানটির নেপথ্য সম্পৃক্ততা ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
ডিএনসিসির অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, করপোরেশনের তৎকালীন প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টনের সঙ্গে কমব্যাক্ট ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিং ও বিআইটি টেকনোলজির সুবিধাভোগীদের ঘনিষ্ঠতা ছিল। তবে এ সম্পর্কের প্রকৃতি এবং কার্যাদেশ প্রদানে তার কোনো প্রভাব ছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগ রয়েছে, আইনি ও কারিগরি বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত চুক্তি হয় ডকইয়ার্ডের নামে। কিন্তু নেপথ্য সমঝোতার মাধ্যমে মূল ঠিকাদারের আড়ালে বিআইটি টেকনোলজিকে সাব-কনট্রাক্টর হিসেবে যুক্ত করা হয়। গত ৫ জুলাই দরপত্র উন্মুক্তের পর ১৯ আগস্ট কাজের অনুমতি দেওয়া হয় এবং ৮ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
এ ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন, সাব-কনট্রাক্টর নিয়োগের বিষয়টি চুক্তির শর্ত অনুযায়ী অনুমোদিত ছিল কি না, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তা জানানো হয়েছিল কি না এবং প্রকৃত কাজ বাস্তবায়নের দায়িত্ব কার হাতে রয়েছে। চুক্তির নথি, সাব-কনট্রাক্ট অনুমোদন এবং অর্থ পরিশোধের তথ্য প্রকাশ করা হলে বিতর্কের অবসান ঘটতে পারে।
বিআইটি টেকনোলজিকে ঘিরে পুরোনো অভিযোগও আলোচনায়
বিআইটি টেকনোলজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুল হাসান (সুমন) নথিপত্রে প্রতিষ্ঠানটির স্বতন্ত্র প্রতিনিধি হিসেবে থাকলেও বাস্তবে তিনি কমব্যাক্ট ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া মেয়র আতিকুল ইসলামের মেয়াদকালে দরপত্র ছাড়াই বিআইটি টেকনোলজি থেকে প্রায় ৫০ লাখ টাকায় এআইভিত্তিক ট্রাফিক কন্ট্রোল ব্যবস্থা কেনা এবং মশক কর্মীদের জন্য অতিরিক্ত দামে ফোরজি বডি ক্যামেরা কেনার প্রক্রিয়া নিয়েও আগে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে ক্রয়সংক্রান্ত নথি, মূল্য যাচাই, অনুমোদন প্রক্রিয়া ও নিরীক্ষা প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ। আগের অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়েছে কি না এবং বর্তমান প্রকল্পে একই ধরনের ঝুঁকি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
২৮টি সিগন্যালের কাজ পাঁচ প্যাকেজে: পুরোনো ঠিকাদারি বলয়ের প্রত্যাবর্তন?
প্রকল্পের বাকি ২৮টি ট্রাফিক ইন্টারসেকশনের কাজ বড় দরপত্রের পরিবর্তে পাঁচটি ছোট প্যাকেজে ভাগ করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গত ২৯ জুলাই প্রকাশিত দরপত্র প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ পাওয়ার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, কাফরুল থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মোহাম্মদ পারভেজের ‘মাইশা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’ ৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকায় ছয়টি পয়েন্টের কাজ পায়। যুবলীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ আব্দুল হাইয়ের ‘আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড’ চারটি পয়েন্টের কাজ পায় ৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকায়।
এ ছাড়া মাইশা কনস্ট্রাকশন ও ইয়াসিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার যৌথভাবে ৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকায় পাঁচটি পয়েন্টের কাজ পায়। আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও এম এস ইফাদ এন্টারপ্রাইজ যৌথভাবে ৮ কোটি ৪০ লাখ টাকায় পাঁচটি পয়েন্টের কাজ পায়। অন্যদিকে, মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিজানের ছোট ভাই এইচ এম হেলালের ‘এইচ এম হেলাল অ্যান্ড কোং’ আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচারের সঙ্গে যৌথভাবে ১০ কোটি ৬৪ লাখ টাকায় আটটি ইন্টারসেকশনের কাজ পায় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লিখিত পাঁচটি প্যাকেজের মোট মূল্য ৪২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। অর্থাৎ, ২৮টি ইন্টারসেকশনের কাজের ক্ষেত্রে এই অঙ্কটি বড় ধরনের সরকারি ব্যয়ের প্রতিনিধিত্ব করছে। তবে প্যাকেজভিত্তিক বরাদ্দ, চুক্তিমূল্য ও প্রকৃত পরিশোধের অঙ্ক এক কি না, তা মূল নথি দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
বিগত সরকারের সময়ে ডিএনসিসির বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও একই বলয়ের প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে বড় অঙ্কের কাজ পেল, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে।
তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিক বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় থাকাই অনিয়মের প্রমাণ নয়। বরং দরপত্রে প্রতিযোগিতা, যোগ্যতার মূল্যায়ন, প্যাকেজ বিভাজনের যৌক্তিকতা, বাজারদর এবং কার্যাদেশ প্রদানের স্বচ্ছতা যাচাই করেই প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ, কিন্তু বাস্তবায়নে জবাবদিহি কোথায়?
রাজধানীর যানজট নিরসনে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কিন্তু প্রকল্পের লক্ষ্য যত গুরুত্বপূর্ণই হোক, বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
দরপত্রের শর্ত কেন পরিবর্তন করা হলো, সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব বাতিলের কারিগরি ভিত্তি কী ছিল, পাঁচটি প্যাকেজে কাজ ভাগ করার প্রয়োজনীয়তা কতটা যৌক্তিক ছিল এবং মূল ঠিকাদারের বাইরে অন্য প্রতিষ্ঠান কীভাবে কাজ বাস্তবায়ন করছে—এসব প্রশ্নের উত্তর নথিভিত্তিকভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে, একই প্রকল্পে রাজনৈতিকভাবে আলোচিত ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাজ পাওয়া এবং বিতর্কিত সাব-কনট্রাক্টর নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি আরও জোরালো হয়েছে। প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে প্রতিযোগিতা, কারিগরি যোগ্যতা ও সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে যানজট নিরসনের উদ্যোগ নিয়েও জনমনে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
প্রকল্পে অনিয়ম, দরপত্রের শর্ত পরিবর্তন এবং বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাজ পাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন অভিযোগ অস্বীকার করেন।
তিনি জানান, সিটি করপোরেশনের সার্বিক দরপত্র কার্যক্রম ই-জিপি (e-GP) ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। যেসব প্রতিষ্ঠানের এসএলটি ও টিডিএস মানদণ্ড অনুকূলে থাকে, নিয়ম অনুসরণ করেই তারা কাজ পায়। তাঁর দাবি, এ প্রক্রিয়ায় ম্যানিপুলেশন বা অসদুপায় অবলম্বনের সুযোগ নেই।
সাব-কনট্রাক্টর হিসেবে যুক্ত ব্যক্তিদের অতীত রাজনৈতিক পরিচয় বা অন্যান্য পটভূমি সম্পর্কে সংস্থা অবগত ছিল না বলেও তিনি দাবি করেন।
তবে দরপত্রের শর্ত পরিবর্তন, ডকইয়ার্ডের প্রস্তাব বাতিল, সাব-কনট্রাক্টর নিয়োগ এবং পাঁচটি প্যাকেজে কাজ বণ্টনের বিষয়ে উত্থাপিত নির্দিষ্ট প্রশ্নগুলোর পূর্ণাঙ্গ নথিভিত্তিক ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটতে পারে।
উল্লেখ্য, রাজধানীর যানজট নিরসনের প্রকল্প যেন ঠিকাদারি সুবিধা বণ্টনের বিতর্কে আটকে না যায়। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে; আর অভিযোগ অসত্য হলে নথি ও তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে তা স্পষ্ট করতে হবে। সরকারি অর্থের প্রকৃত সুফল নগরবাসী পাচ্ছে কি না, সেটিই হওয়া উচিত এই প্রকল্পের সাফল্য মূল্যায়নের প্রধান মাপকাঠি।
