ছবি: সিসিটিভি ফুটেজ
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী আহমেদ জাকীর কার্যালয়ে জোরপূর্বক প্রবেশ করে তাঁকে মারধর ও লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠেছে বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। বুধবার বেলা সোয়া ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে রাজধানীর মহাখালীতে আইইডিসিআরের কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
ঘটনার পর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। অন্যদিকে, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ডা. জাহিদ হাসানের প্রাথমিক সদস্যপদ স্থগিত করে তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে ড্যাব। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সংগঠনের সভাপতি ও মহাসচিবের কাছে তাঁকে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে।
পরিচালকের কক্ষে ঢুকে ধাক্কাধাক্কির অভিযোগ
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ডা. জাহিদ হাসান ও ডা. বাসেদের নেতৃত্বে ১০ থেকে ১৫ জন ব্যক্তি আইইডিসিআর পরিচালকের কক্ষে প্রবেশ করেন। একপর্যায়ে তাঁরা পরিচালকের জামার কলার ধরে টানাহেঁচড়া করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পরিচালকের কক্ষে জোরপূর্বক প্রবেশের পর তাঁকে মারধর করা হয়। এ সময় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এগিয়ে এলে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল থেকে চলে যান।
ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজেও কয়েকজন ব্যক্তিকে পরিচালকের কক্ষে প্রবেশ করে তাঁকে চেয়ার থেকে টেনে তোলা এবং ধাক্কাধাক্কি করতে দেখা যায় বলে জানা গেছে। পরে কক্ষে উপস্থিত অন্য ব্যক্তিরা তাঁদের বাধা দিলে পরিচালক আবার নিজের চেয়ারে বসেন।
চাকরির অবসান ঘিরে বিরোধের সূত্রপাত?
ঘটনার পেছনে চাকরিসংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। ডা. জাহিদ হাসান যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত ‘বাংলাদেশ পাবলিক হেলথ প্রোটেকশন’ প্রকল্পে কাজ করতেন। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় তাঁর চাকরিরও অবসান ঘটে।
আইইডিসিআরের পরিচালক হওয়ার আগে অধ্যাপক ডা. কাজী আহমেদ জাকী একটি জনস্বাস্থ্য প্রকল্পের দায়িত্বে ছিলেন। পরে তিনি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলে ওই প্রকল্পের দায়িত্ব থেকে সরে যান। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটির দায়িত্বে ডা. জাহিদ হাসানকে নিয়োগ দেওয়া হয়। সম্প্রতি তাঁকেও ওই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
তবে চাকরির অবসান বা প্রকল্পের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার সঙ্গে বুধবারের ঘটনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পরিচালকের বৈঠক নিয়ে ড্যাব সভাপতির প্রশ্ন
এদিকে, ঘটনার পেছনে অন্য কোনো বিরোধ রয়েছে কি না, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে। ড্যাব সভাপতি অধ্যাপক হারুন আল রশিদ প্রশ্ন তুলেছেন, বর্তমান সরকারের সময়ে আইইডিসিআরের পরিচালক কীভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরার সঙ্গে নিজের কার্যালয়ে বৈঠক করেন।
তবে ওই বৈঠকের সঙ্গে বুধবারের ঘটনার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়। ড্যাব সভাপতি নিজেও জানিয়েছেন, চাকরি চলে যাওয়া কিংবা অন্য কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় থেকে এ ঘটনা ঘটেছে কি না, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন।
‘কিছু দুর্বৃত্ত’ হামলা চালিয়েছে: পরিচালক
ঘটনার বিষয়ে আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী আহমেদ জাকী গণমাধ্যমকে বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে ‘কিছু দুর্বৃত্ত’ হামলা চালিয়েছে। এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তিনি মন্ত্রণালয়ে যাচ্ছেন বলেও জানান।
ড্যাবের তদন্ত, সদস্যপদ স্থগিত ও কারণ দর্শানোর নোটিশ
ড্যাবের মহাসচিব ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, এ ঘটনায় অভিযুক্ত ও ভুক্তভোগী—দুজনই তাঁদের সংগঠনের সদস্য। সংগঠনটি ঘটনাটি তদন্ত করছে এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ড সমর্থন করে না।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তি ড্যাবের সদস্য বলে তাঁরা তথ্য পেয়েছেন। অন্যদের পরিচয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কেউ সংগঠনের নাম ব্যবহার করে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ড্যাবের মহাসচিবের স্বাক্ষরিত কারণ দর্শানোর নোটিশে বলা হয়েছে, আইইডিসিআর পরিচালকের কক্ষে অপ্রীতিকর ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ডা. জাহিদ হাসানের প্রাথমিক সদস্যপদ স্থগিত করা হয়েছে। কেন তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, সে বিষয়ে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সংগঠনের সভাপতি ও মহাসচিবের কাছে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে তদন্ত কমিটি
আইইডিসিআর পরিচালকের কক্ষে সংঘটিত ঘটনার তদন্তে বুধবার তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বাজেট) আরিফ আহমদকে আহ্বায়ক করে গঠিত কমিটির অন্য সদস্য হলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উপসচিব ইমতিয়াজ হোসেন কমিটির সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, কমিটিকে ঘটনার বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন সাত দিনের মধ্যে জমা দিতে হবে।
হামের টিকার কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণায় আলোচনায় ছিলেন পরিচালক
রোগের প্রাদুর্ভাব পর্যবেক্ষণ, গবেষণা এবং জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সতর্কতা জারির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আইইডিসিআর। সম্প্রতি হামের টিকার কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণার কারণে আলোচনায় ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী আহমেদ জাকী।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকের কার্যালয়ে এ ধরনের ঘটনার অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এখন তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে ঘটনার প্রকৃত কারণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং অভিযোগের সত্যতা কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়, সেদিকেই নজর থাকবে।
