বুধবার, ৪ঠা নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

(২য় পর্ব)কুমিল্লা থেকে ঢাকায় প্রত্যাবর্তন, পেছনে কি প্রভাবের খেলা? দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের নজরে শামসুল আরেফিন

নিজস্ব প্রতিবেদক
নভেম্বর ৩, ২০২৬ ১০:০০ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বদলি বাণিজ্য ও দুর্নীতির অভিযোগে তোলপাড় গণপূর্ত।দেড় বছরের ব্যবধানে আবার ঢাকায় শামসুল আরেফিন, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান। ফাইল ছবি

সরকারি চাকরিতে বদলি-পদায়ন কি শুধুই প্রশাসনিক নিয়মের বিষয়, নাকি প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সখ্য ও অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায় নিজের কর্মস্থল? গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল শাখার প্রকৌশলী মো. শামসুল আরেফিনকে ঘিরে ওঠা একাধিক অভিযোগ নতুন করে এমন প্রশ্ন সামনে এনেছে। স্বনামে-বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসা, প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ, ঘুষ-কমিশন বাণিজ্য এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে এবার দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রাথমিক অনুসন্ধনের মুখে পড়েছেন তিনি।

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ঢাকায় বারবার ফিরে আসা, সরকারি প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন আদায়ের কথিত কর্মকাণ্ড। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে তাকে কুমিল্লায় বদলি করা হলেও দেড় বছরের মাথায় আবারও ঢাকার একই প্রভাবশালী পদে ফিরে আসেন তিনি। প্রশাসনিক বদলি-পদায়নের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার বাইরে কোনো প্রভাব কাজ করেছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

দুদকের সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, শামসুল আরেফিনের বিরুদ্ধে স্বনামে-বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা, প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে কমিশন প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করেছে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো অনুসন্ধানাধীন।

ঢাকা ডিভিশন-৬ ঘিরে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ

অনুসন্ধানে জানা যায়, গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা ডিভিশন-৬-এ কর্মরত থাকাকালে প্রকৌশলী শামসুল আরেফিনের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি সামনে আসে। তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী পবিত্র কুমারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে ওই ডিভিশনের একাধিক সরকারি প্রকল্পে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

প্রকল্পের প্রাক্কলন বা এস্টিমেট তৈরি থেকে শুরু করে কাজের তদারকি এবং চূড়ান্ত বিল অনুমোদন—প্রতিটি পর্যায়ে তার একক আধিপত্য ছিল বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার। তাদের দাবি, প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপে নির্দিষ্ট হারে কমিশন দিতে হতো। কথিত কমিশন না পেলে নথিপত্রে নানা জটিলতা সৃষ্টি করে বিল আটকে রাখার অভিযোগও রয়েছে।

এক ঠিকাদারের ভাষ্য, ‘কাজ পাওয়ার কথা বলে তিনি বারবার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম উল্লেখ করতেন। টাকা না দিলে বিল আটকে থাকত, তাই অনেকে বাধ্য হয়েই টাকা দিয়েছেন।

অন্য এক ঠিকাদারের অভিযোগ, ‘তিনি বলতেন—উপরের লোকজন ঠিক আছে, শুধু টাকা দাও। পরবর্তীতে দেখা গেছে, কাজও হয়নি, আর সেই টাকাও ফেরত পাওয়া যায়নি।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও বক্তব্যের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।

‘পরে কথা বলব’—এরপর আর সাড়া মেলেনি

উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রকৌশলী মো. শামসুল আরেফিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ‘পরে কথা বলব’ বলে মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। পরবর্তীতে তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘কেউ যদি ঊর্ধ্বতন কারও নাম ভাঙিয়ে ঠিকাদারের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে থাকেন, তবে তার দায় তাকেই নিতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কেউ কাউকে এ ধরনের অনৈতিক কাজের সুযোগ দেয় না। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বদলি হলো কুমিল্লায়, ফিরলেন ঢাকার একই পদে

প্রশাসনিক নীতি অনুযায়ী, নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে কর্মকর্তাদের ঢাকার বাইরে বদলির বিধান রয়েছে। কিন্তু শামসুল আরেফিনের কর্মজীবনের সিংহভাগ সময়ই ঢাকায় কাটানোর অভিযোগ উঠেছে। জুলাই আন্দোলনের পর প্রশাসনে স্বচ্ছতা ফেরানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে তাকে কুমিল্লায় বদলি করা হলেও দেড় বছরের মাথায় আবারও ঢাকার একই অফিসে সমমানের পদে ফিরে আসেন তিনি।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ মহলে আলোচনা রয়েছে, রাজনৈতিক পালাবদল ঘটলেও একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটকে ম্যানেজ করে তিনি বারবার নিজের অবস্থান সুরক্ষিত করেছেন।

প্রশ্ন উঠেছে, বদলি-পদায়নের ক্ষেত্রে প্রচলিত প্রশাসনিক নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না। তবে তার ঢাকায় প্রত্যাবর্তনের পেছনে কোনো অনিয়ম বা অনৈতিক লেনদেন ছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক নথি পর্যালোচনা ও প্রশাসনিক তদন্তের দাবি উঠেছে।

বেতনের সঙ্গে সম্পদের বিস্তর ফারাক?

শামসুল আরেফিনের বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও সামনে এসেছে। অনুসন্ধানী সূত্রের দাবি, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অভিজাত এলাকা এবং বিকাশমান আবাসন প্রকল্পে তার ও নিকটাত্মীয়দের নামে একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট রয়েছে।

সরকারি চাকরির বেতন ও বৈধ আয়ের সঙ্গে এসব স্থাবর সম্পত্তির মালিকানার সম্ভাব্য অসামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে সম্পত্তির প্রকৃত পরিমাণ, মালিকানা এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে এখনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।

দুদকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অভিযোগটি আমলে নিয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন নথিপত্র তলব করা হচ্ছে। অনুসন্ধানের সার্বিক অগ্রগতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সিন্ডিকেট ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ বিষয়ে বলেন, ‘সরকারি প্রকৌশল বিভাগে সিন্ডিকেট ও ক্ষমতার অপব্যবহার নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে বারবার একই ব্যক্তির ঢাকায় ফিরে আসা এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। দুদকের এই অনুসন্ধানকে স্বাধীনভাবে এগোতে দিতে হবে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি অর্থহীন হয়ে পড়বে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, গণপূর্ত অধিদপ্তর কোনো ব্যক্তিগত অনিয়ম বা দুর্নীতির দায় নেবে না। প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখতে আমরা বদ্ধপরিকর। যেকোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এলে প্রশাসনিক তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। মো. শামসুল আরেফিনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ এবং বদলি-সংক্রান্ত বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দুদক স্বাধীনভাবে তদন্ত শুরু করেছে, আমরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সব ধরনের প্রয়োজনীয় তথ্য ও দাপ্তরিক সহযোগিতা প্রদান করব।

তদন্তেই নির্ধারিত হবে অভিযোগের সত্যতা

গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাধারণ ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা সরকারি সেবা খাতে প্রকৃত স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় এসব অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। তাদের মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্তসহ কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অন্যথায় একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগে অভিযুক্ত চক্র আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রকৌশলী মো. শামসুল আরেফিনের দ্রুত ঢাকায় প্রত্যাবর্তন, তাকে ঘিরে ওঠা সিন্ডিকেটের অভিযোগ, ঠিকাদারদের কমিশন বাণিজ্যের দাবি এবং দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান—সব মিলিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা ও বদলি-পদায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা শুধু একজন প্রকৌশলীর অনিয়মের ঘটনা নয়; বরং সরকারি প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও দুর্নীতি প্রতিরোধ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলবে।

এখন দুদকের অনুসন্ধান ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রশাসনিক তদন্তের ফলাফলের দিকেই তাকিয়ে সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগের সত্যতা, প্রকৃত দায় এবং সম্ভাব্য অনিয়মের ব্যাপ্তি নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্তই হতে পারে পরবর্তী পদক্ষেপের ভিত্তি।

এসব অনিয়মের অভিযোগ ও সম্পদের তথ্য নিয়ে বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে……..

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।