নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আঞ্চলিক পরামর্শ সভায় বক্তব্য রাখেন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। ছবি- সংগৃহীত
বাংলাদেশ একটা দোলাচলে আছে, একদিকে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা, অন্যদিকে আস্থার সংকট। এই ফাঁকা অবস্থানটাকে মেলাতে জনগণকে ভূমিকা নিতে হবে। রাজনীতিবিদের আয়-ব্যয়ের হিসাবে স্বচ্ছতা এবং তাদের পরিবার ও আত্মীয় স্বজনের সম্পত্তির বিষয়টিও সামনে চলে এসেছে। অতীতের মতো আসন্ন নির্বাচনেও ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ না পাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনমনে শতভাগ আস্থা না আসাই এর কারণ।
বুধবার চট্টগ্রাম মহানগরের জিইসি মোড়ে হোটেল পেনিনসুলা মিলনায়তনে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আঞ্চলিক পরামর্শ সভায় বক্তারা এই অভিমত তুলে ধরেন। সভায় বক্তারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের মতো সংবেদনশীল খাতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বৈদেশিক বিনিয়োগ করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন ও বাস্তবায়ন দরকার। সেই সঙ্গে অধিকার বাস্তবায়নে নাগরিকদের এগিয়ে আসতে হবে। এ সভায় বলা হয়, আগের তুলনায় চাঁদাবাজী ও দখলবাজী বেড়েছে। আর রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে সংষ্কার না হওয়ায় বেড়েছে হতাশা।
‘নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী’- এমন প্রশ্নে সমবেত নাগরিকরা ই-ভোটিংয়ের মাধ্যমে সংষ্কার ও আগামী নির্বাচন নিয়ে তাদের প্রত্যাশার কথা জানান। তাদের প্রধান প্রত্যাশা- স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, নিরাপত্তা, সুশাসন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শিক্ষা সংষ্কার, দুর্নীতি প্রতিরোধ, নৃ-গোষ্ঠীসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, সুশাসন সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব, নাগরিক অধিকার বাস্তবায়ন, মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতা।
সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী’ এমন প্রশ্নে মতামত তুলে ধরেন সমবেত নাগরিকরা। এ ক্ষেত্রে সব দলকে সমান সুবিধা দেওয়া, সব দলের অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা, কঠোর নিরাপত্তা, কেন্দ্রে সিসিটিভি স্থাপন ও হলুদ সাংবাদিকতা প্রতিরোধের মতো বিষয় তুলে ধরেন তারা। জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার এই পরামর্শ সভা সঞ্চালনের শুরুতে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টাসহ উপদেষ্টারা সম্পদের প্রতিশ্রুত হিসাব না দেওয়ায় জনগণের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে।’
সভায় উপস্থিত ব্যক্তিরা বাণিজ্য নগরী চট্টগ্রামের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে তা নিরসনের দাবি জানান। বন্দর বিশেষজ্ঞ আলী আকবর বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরকে বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। অথচ এর কোনো প্রয়োজন ছিলো না। চট্টগ্রাম উইমেন চেম্বারের পরিচালক রুহি মোস্তফা বলেন, নারীরা এখনও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
সভার সূচনা বক্তব্যে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘টাকার মূল্যমানে স্থিতিশীলতা এলেও কর্মসংস্থান দুর্বল, বিনিয়োগ নেই।’ তিনি রাজনীতিবিদদের দায়বদ্ধতার মধ্যে আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জানতে চান, রাজনৈতিক দলগুলো যে ক’জন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে তা যথেষ্ট কিনা? এর জবাবে নাগরিকরা বলেন, একেবারেই হতাশাজনক। তিনি আরও জানতে চান, ১২ বছরের নিচের শিশুদের জন্য সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধ করা উচিত কিনা? এর জবাবে সবাই হ্যাঁ সূচক জবাব দেন।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটেছে। এখন জবাবদিহিতার কথা বলতে হবে।
বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন পরস্পরের পরিপূরক। এই তিন জায়গায় সঠিকভাবে এগুতে হবে। আর জনগণের কাছে আসতে হবে রাজনীতিবিদদের।
ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক নাজিম উদ্দিন ‘রাতের ভোটের’ মতো আগামী নির্বাচনেও ভোটাধিকার প্রয়োগ নিয়ে শঙ্কা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন। এমন আশঙ্কার বিষয়ে জানতে চাইলে সমবেত সবাই বলেন, নির্বাচন কমিশনের প্রতি শতভাগ আস্থা এখনও আসেনি।
বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন অপকা’র নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, নির্বাচন নিয়ে সংশয় কাটছে না। প্রধান উপদেষ্টাকে নিয়ে জাতি অনেক স্বপ্ন দেখেছিল; কিন্তু তিনিসহ উপদেষ্টারা সম্পদের হিসাব দেননি। এমপিদের সম্পদের হিসাব নিয়ে কথা হচ্ছে। কিন্তু এমপিরা তো নিজেদের নামে সম্পদ করেন না। তারা আত্মীয়-স্বজনের নামে সম্পদ করেন।
সচেতন নাগরিক কমিটির জেলা সভাপতি দেলোয়ার মজুমদার বলেন, রাজনৈতিক দলেও সংস্কার কার্যক্রম থাকা উচিত। গণতন্ত্রের চর্চা থাকা উচিত। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) জেলা সভাপতি অধ্যাপক সিকান্দার খান অধিকার বাস্তবায়নে দায়িত্ব নেওয়ার জন্য নাগরিকদের প্রতি অনুরোধ জানান।
নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপের সদস্য ও সিপিডির আরেক সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জাতি সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তাই সংস্কার কার্যক্রমকে মনিটরিংয়ের মধ্যে রাখতে হবে। আর আগামী দিনের জনপ্রতিনিধিরা তাদের দায়িত্ব পালনের বেলায় অবশ্যই সজাগ থাকবেন। সেটা না হলে নাগরিকরা অতীতের মতো আবারও আন্দোলন গড়ে তুলবে।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করছে। নাগরিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে নাগরিকদের ইশতেহার। এই ইশতেহার প্রকাশ পাবে আগামী ২০ ডিসেম্বর।
জামায়াতে ইসলামীর চট্টগ্রাম জোনাল হেড মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, জামায়াত সরকার গঠন করলে তিন মাস, ছয় মাস ও এক বছর পর জনগণের মুখোমুখি হবেন রাজনীতিকরা। সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ স্বচ্ছ ও জবাবদিহি সরকার গঠনে নাগরিকদের সক্রিয় ভূমিকা চান।
নাগরিক দাবি, অভিযোগ ও প্রত্যাশা-
প্রায় শতাধিক নাগরিকের অংশগ্রহণে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠা এই আলোচনায় নির্বাচন, নিরাপত্তা, সুশাসন ও দুর্নীতির বিষয় প্রাধান্য পায়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হুমাইয়া মুসফিকা পার্বত্য শান্তি চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন দাবি জানান। সচেতন নাগরিক কমিটির জেলার সদস্য সাইফুদ্দিন খালেদ চৌধুরী বছরে একবার হলেও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জনগণের মুখোমুখি করার প্রস্তাব দেন। তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধি নাতাশা রহমান তাদের জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করেন। বিবি আমেনা বলেন, আগের তুলনায় চাঁদাবাজী ও দখলবাজী বেড়েছে। বাজার ব্যবস্থাপনায় কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
স্থানীয় নাগরিকরা চট্টগ্রামে বিরাজমান নানা সমস্যা উপস্থাপন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে দুর্নীতিমুক্ত পরিস্থিতির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। রেজিয়া বেগম প্রশাসনিক দুর্গতি কমিয়ে আনা এবং তাহমিনা প্রিয়াস আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি করেন।
নাগরিক প্ল্যাটফর্মের প্রাক-নির্বাচনী উদ্যোগ আঞ্চলিক পরামর্শ সভায় নাগরিকদের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নাগরিকদের মন থেকে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করার সক্ষমতার শঙ্কা দূর হচ্ছে না। আর আমার কাছে এমন কোন সার্ভে নাই, যেটাতে আমি বলতে পারব মানুষ মনে করে যে, নির্বাচন হবে, কিনা? এর আগেও বলেছি নির্বাচন একটি অবধারিত বিষয়ে পরিণত হচ্ছে ক্রমান্বয়ে। নির্বাচনের পক্ষের শক্তি অনেক বেশি। কারণ নাগরিকরা, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো, ব্যবসায়ীগোষ্ঠী, নাগরিক সম্প্রদায়, সেনাবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ অন্তর্বর্তী সরকারও নির্বাচন চায়। কিন্তু সুষ্ঠু একটি নির্বাচন করার জন্য সক্ষমতার ব্যাপারে যে শঙ্কা, সেই শঙ্কা কিন্তু দূর হচ্ছে না। সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে এই শঙ্কা দূর করে মানুষের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে একটি ভালো ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অবশ্যই আয়োজন করতে হবে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ নির্বাচন উনি করে দেখাবেন, আমরা তার অপেক্ষায় আছি।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘বাংলাদেশ একটা দোলাচলের মধ্যে আছে। একদিকে অসম্ভব একটা পরিবর্তন সম্ভাবনার চিন্তা, অন্যদিকে একটা আস্থার সংকট। এই দুটোর মধ্যেই আমরা বসবাস করছি। জনগণের ভূমিকা নিয়ে এই ফাঁকটাকে আমাদের মিলাতে হবে। রাজনীতিবিদের আয় ব্যয়ের হিসাব আরও স্বচ্ছতার সঙ্গে কিভাবে সামনে আনা যায়, পাশাপাশি উনাদের পরিবারের, আত্মীয় স্বজনদেরও সহায় সম্পত্তির বিষয়টি সামনে এসেছে।
তিনি বলেন, ‘বিগত সরকারের মতো বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও ঘোষণা দিয়েছিল তারা মন্ত্রিপরিষদের বা সরকার প্রধানের সম্পত্তির হিসাব দিবেন। কিন্তু সে ক্ষেত্রে মানুষের অনেক বড় হতাশা হলো, আগের মতো এবারও সরকার সেটা পালন করলো না। এর ফলে আগামী সরকার একই কাজ না করার ক্ষেত্রে একটা উৎসাহ দিয়ে গেল কিনা তা নিয়ে অনেকেই আশঙ্কা করছেন। আজকে একটা বড় আলোচনার জায়গা ছিল, সেটা হলো- এত সংস্কারের আলোচনা আমরা করলাম গত দেড়বছর যাবৎ; কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কারের ব্যাপারে সেরকম আলোচনা হলো না। রাজনীতিবিদরাও দাবি করলেন না, সরকার বা নির্বাচন কমিশনও দাবি করলো না, দুর্নীতি দমন কমিশন আগালো না।
নাগরিকরা যেন ভীত না হয় উল্লেখ করে ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘আজ আরেকটা দাবি বড়ভাবে এসেছে, সেটা হল সবকিছুর জন্য সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকলে হবে না, রাজনীতিবিদদের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকলে হবে না। নাগরিকদের বলিষ্ঠ ভূমিকায়, সাহসী ভূমিকায় যেতে হবে, যাতে জবাবদিহিতার চাবিকাঠি নাগরিকদের হাতে নিহিত হয়।
