স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ৩ নম্বর গেটের সামনে রাস্তার ওপর ব্যবসায়ী লাল চাঁদকে নৃশংসভাবে হত্যার ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। ছবি: ভিডিও থেকে
চলা-ফেরা পেশাগত দায়িত্ব পালনে সর্বক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন সাধারণ মানুষ। একদিকে ছিনতাই, চুরি-ডাকাতি অন্যদিকে জীবনের শঙ্কা । আবার কখনো প্রকাশ্যে চাপাতি ও অন্য দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সাধারণ মানুষের চলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় একশ্রেণীর দুর্বৃত্ত। নিরাপত্তাহীনতার কারণে রাজধানীর মোহাম্মদপুর কয়েক দিন পর পর খবরের শিরোনামে উঠে আসে ভয়ঙ্কর চিত্র। এক মোহাম্মদপুর যেন গোটা দেশের প্রতিচ্ছবি হয়ে সামনে হাজির হয়।
দেশের নানা প্রান্তে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে আতঙ্ক ছড়ায় বাধাহীন ‘মব’। খুন, অপহরণ, ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা, নারী নিপীড়ন, মাজারে হামলা-আগুন, কথায় কথায় ব্যস্ত সড়ক বন্ধ করে দাবি আদায় করার মতো ঘটনাবহুল বছর ২০২৫। বছরের শেষ সময়ে হামলা ও আগুন দেওয়া হয়েছে দৈনিক প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, ছায়ানট ও উদীচীর কার্যালয়ে।
দেশজুড়ে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তায় ছায়া। প্রত্যাশা মাফিক পুলিশ ঘুরে দাঁড়াতে না পারার মাশুল দিতে হয় ভুক্তভোগীদের। সামাজিক মাধ্যমে কোনো কোনো অপরাধের ভিডিও এবং ছবি ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তে তা আলোচনায় জন্ম দেয়। ভাইরাল না হওয়ায় অনেক ঘটনা মিলিয়ে গেছে অঙ্কুরেই। আবার চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীর শিকারে পরিণত হয়েছে অনেক মানুষ। আদালত প্রাঙ্গণে খুনের ঘটনা ঘটেছে। বরাবরের মতো সড়কে, লঞ্চে, ট্রেনে দুর্ঘটনায় একেকটি পরিবার নিঃশেষ হয়েছে। অনেক প্রাণ গেছে ডেঙ্গুজ্বরে। সব মিলিয়ে ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি রয়েছে কিনা’ এমন প্রশ্ন অনেকের মনে অজান্তে কড়া নাড়ে। বিষাক্ত বায়ু থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার পথ খুঁজে বেড়ায় দিশেহারা মানুষ।
দেশের নানা প্রান্তে খুনোখুনির ঘটনা আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ১২ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে সন্ত্রাসীরা। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর মারা যান তিনি। হাদি হত্যার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভারতে পালিয়ে যায় শুটার ফয়সাল ও তার সহযোগী। হাদি হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে নিরাপত্তাহীনতা বিষয়টি আবার সামনে আসে।
১৮ ডিসেম্বর রাতে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ভালুকার হবিরবাড়ী ইউনিয়নের ডুবালিয়াপাড়া এলাকার পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেড কারখানার কর্মী দিপু চন্দ্র দাসকে কারখানা থেকে ধরে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভাজকের একটি গাছে বিবস্ত্র করে ঝুলিয়ে মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
৯ জুলাই স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ৩ নম্বর গেটের সামনে পাকা রাস্তার ওপর একদল দুর্বৃত্ত লালচাঁদ সোহাগকে এলোপাতাড়িভাবে মাথায় ইট-পাথর দিয়ে আঘাত করে ও কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে।
ঢাকা ও খুলনায় আদালত প্রাঙ্গণে তিনজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১০ নভেম্বর প্রায় ২৯ বছর আগের একটি হত্যা মামলায় ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২ এ হাজিরা দিতে যান তারিক সাইফ মামুন। ফেরার পথে আদালতপাড়ায় ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে খুন হন তিনি।
পুলিশ সদরদপ্তরের হিসাবে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে হত্যা মামলা হয়েছিল তিন হাজার ৫০৯টি। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে খুনের মামলা হয়েছিল তিন হাজার ২২৮টি। এ বছরের ১১ মাসে ২৮১টির বেশি হত্যা মামলা হয়েছে।
যদিও পুলিশ সদরদপ্তর বলছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত যারা মামলা করতে পারেনি, তাদের কিছু মামলা এখন হয়েছে। বিভিন্ন অপরাধে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে এক লাখ ৫৮ হাজার ৩৮৩টি মামলা হয়েছে। একই সময়ে ২০২৫ সালে ১০ হাজার ১২২টি মামলা বেশি হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, গত ১১ মাসে দেশে রাজনৈতিক কারণে খুন হন ৯৮ জন।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের প্রথম ১১ মাসে ৫৬৮টি অপহরণের মামলা হয়। চলতি বছরের ১১ মাসে গত বছরের তুলনায় অপহরণের মামলা মামলা বেশি হয়েছে ৪৪৬টি। ২০২৪ সালে জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনে ১৬ হাজার ৩৬৬টি মামলা হয়। ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে ২০ হাজার ৬৯১টি নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে। চলতি বছরের ১১ মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মামলা বেশি হয়েছে চার হাজার ৩২৫টি।
মার্চের শুরুতে মাগুরায় বোনের বাড়ি বেড়াতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হয় আট বছর বয়সী এক শিশু। পরে ১৩ মার্চ তার মৃত্যু হয়। মাগুরার শিশু নিপীড়নের ঘটনা সারাদেশে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছিল। প্রতিবাদে রাস্তায় নামে বিভিন্ন সংগঠন ও শ্রেণিপেশার মানুষ।
বছরজুড়ে বড় আতঙ্ক ছিল মব-সন্ত্রাস। দলবদ্ধ হয়ে মব সৃষ্টি করে প্রতিপক্ষের ওপর চড়াও হয় অনেকে। আক্রমণের নিশানা হয় মাজার ও খানকা শরিফ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সাংবাদিক, শিক্ষক, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বাউলশিল্পী, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। অধিকাংশ ঘটনায় তৌহিদী জনতা ও বিক্ষুব্ধ জনতার ব্যানার ব্যবহার করতে দেখা গেছে। আসকের হিসাবে চলতি বছরের ১১ মাসে গণপিটুনিতে ১৮৪ জন মারা যান। দেশের নানা প্রান্তে মাজারে আগুন ও ভাঙচুর করা হয়।
ঢাকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও গোষ্ঠী দাবি-দাওয়া নিয়ে অন্তত এক হাজার ৪৯৮টি আন্দোলন করেছে। এই হিসাবে প্রতিদিন গড়ে চারটি করে আন্দোলন হয়েছে।
অনেকে বলছেন, বাধাহীন মব, কথায় কথায় সড়ক অবরোধের অধিকাংশ ঘটনায় শক্ত আইনি পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। এছাড়া প্রত্যাশা মাফিক ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি পুলিশও। এটি কাজে লাগায় সুযোগসন্ধানীরা। আবার পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ নিয়ে নেই তেমন আশার আলো।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক বিবৃতিতে বলেছে, স্বাধীন পুলিশ কমিশন প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে পদদলিত করে অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ কার্যত লোক দেখানো ফাঁকা বুলি ছাড়া আর কিছুই নয়। জুলাই আন্দোলনে অবর্ণনীয় আত্মত্যাগের বিনিময়ে সামগ্রিক পুলিশ ব্যবস্থা সংস্কারের যে অভূতপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, এই অধ্যাদেশ তার সঙ্গে রীতিমতো বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
