ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবনের একটি কক্ষে করমর্দন করেন এস জয়শঙ্কর ও আয়াজ সাদিক। ছবি: প্রধান উপদেষ্টার এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া
ঘটনাটি ২০২৫ সালের শেষ দিনের। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকায় এমন এক কাজ করলেন, যা তাঁর দেশের পুরুষ, নারী ও অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দল করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। সেদিন তিনি প্রকাশ্যে করমর্দন করেন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার আয়াজ সাদিকের সঙ্গে।
জয়শঙ্কর ও সাদিক ৩১ ডিসেম্বর ঢাকা সফর করেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজা উপলক্ষে। বাংলাদেশের সংসদ ভবনের একটি কক্ষে অন্য দেশের কূটনীতিকদের সামনে জয়শঙ্কর এগিয়ে গিয়ে সাদিকের সঙ্গে করমর্দন করেন।
গত বুধবার রাতে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে সাদিক বলেন, ‘তিনি আমার কাছে এসে শুভেচ্ছা জানান। আমি উঠে দাঁড়াই, তিনি নিজের পরিচয় দেন এবং হাসিমুখে করমর্দন করেন। আমি যখন নিজের পরিচয় দিতে যাচ্ছিলাম, তখন তিনি বলেন- এক্সেলেন্সি, আপনাকে আমি জানি, পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
ওই করমর্দনের ছবি আয়াজ সাদিকের দপ্তর থেকে প্রকাশ করা হয়। পাশাপাশি, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসও নিজের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে ছবিগুলো শেয়ার করেন।
গত বছরের সেপ্টেম্বরের ঘটনার তুলনায় ৩১ ডিসেম্বরের ওই ছবি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। সবশেষ এশিয়া কাপের এক ম্যাচে ভারতের পুরুষ ক্রিকেট দলের অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব ও তাঁর সতীর্থরা পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের সঙ্গে করমর্দন করতে অস্বীকৃতি জানান। সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত সেই টুর্নামেন্টে পাকিস্তানকে রোমাঞ্চকর ফাইনালে হারিয়ে ভারত শিরোপা জিতলেও, ঘটনাটি দুই প্রতিবেশীর তিক্ততা স্পষ্ট করে।
মূলত গত মে মাসের সংঘাতের তিক্ততা খেলার মাঠেও গড়িয়েছিল। যা প্রমাণ করে, ভারত ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক উত্তেজনা জনসম্মুখের যোগাযোগেও প্রভাব ফেলে। অন্তত গত ৩১ ডিসেম্বরের আগ পর্যন্ত এমনটাই মনে করা হতো।
ভারতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ এ ঘটনাটিকে নেতিবাচকভাবে দেখলেও, পাকিস্তানের অনেকে দীর্ঘদিনের শীতল সম্পর্কে সামান্য হলেও উষ্ণতার ইঙ্গিত খুঁজে পাচ্ছেন। ইসলামাবাদভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক মুস্তাফা হায়দার সাইয়েদ বলেন, ‘নতুন বছর শুরুর আগ মুহূর্তে জয়শঙ্কর ও আয়াজ সাদিকের এই সাক্ষাৎকে আমি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবেই দেখি।
মুস্তাফা হায়দার আরও বলেন, কর্মকর্তাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান দেখানো কিংবা করমর্দন করাটা খুবই স্বাভাবিক। বেশি কিছু না হলেও করমর্দন অন্তত প্রত্যাশা করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে এই ন্যূনতম সৌজন্যতাও এতদিন অনুপস্থিত ছিল।
মে মাসের সংঘাত ও পরস্পরকে দোষারোপের প্রেক্ষাপটে কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, ঢাকায় হওয়া করমর্দনটি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত সারদার মাসুদ খান এই করমর্দনকে সৌহার্দ্যপূর্ণ কূটনীতির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতৃত্বের স্পষ্ট অনুমতি ছাড়া ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী হঠাৎ করে পাকিস্তানের স্পিকারের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন- এটা কল্পনাও করা যায় না।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যদি কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতি ঘটার প্রশ্ন আসে, তবে সেটির মঞ্চ হিসেবে বাংলাদেশকে বেছে নেওয়াটা অপ্রত্যাশিতই মনে হবে। কারণ, বাংলাদেশ একসময় পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় অংশ ছিল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে পরাজয় মেনে নিয়ে ঢাকায় আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তানের সেনারা। বাংলাদেশের বিজয় অর্জনে সহযোগিতা করে ভারত। মাসুদ খান বলেন, এখন ঢাকায় এই করমর্দনের পেছনে যে কারণই থাকুক, তা অঞ্চলের জন্য ইতিবাচক। তবে সামনে অনেক ‘যদি’ আর ‘কিন্তু’ রয়ে গেছে।
ভারতের হিন্দুস্তান টাইমস পত্রিকার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সম্পাদক রেজাউল হাসান লস্কার করমর্দনের ঘটনার খুব বেশি গুরুত্ব দেখছেন না। তিনি বলেন, দুজন একই কক্ষে উপস্থিত ছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে দুই দেশের জ্যেষ্ঠ নেতারা সাধারণত যা করেন, সেটাই হয়েছে। তাঁরা করমর্দন করেছেন এবং সৌজন্য বিনিময় করেছেন।
রেজাউল হাসান বলেন, এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করার মতো। ওই সাক্ষাতের সব ছবি প্রকাশ করা হয়েছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সরকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট থেকে। ভারতের কোনো সরকারি উৎস থেকে ছবিগুলো প্রকাশ হয়নি।
২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার কথা স্মরণ করে রেজাউল হাসান বলেন, এরপর থেকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক সংলাপ হয়নি। বিশ্বাসের ঘাটতি যেভাবে বাড়ছে, তাতে দুপক্ষের কোনোভাবে কাছাকাছি আসা কঠিন বলেই মনে হচ্ছে।
