বৃহস্পতিবার, ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বিশ্লেষণ ট্রাম্পের নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা রূপ পাচ্ছে ভেনেজুয়েলায়

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
জানুয়ারি ৫, ২০২৬ ২:২৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখোশ পরে এক বিক্ষোভকারী। সোমবার দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে মার্কিন দূতাবাসের সামনে। ছবি: এএফপি

এক মার্কিন ডলারের প্রতিটি নোটের উল্টো পাশে লেখা থাকে লাতিন বাক্যাংশ ‘নভুস অর্ডো সেকলোরাম’। যেটির বাংলা অর্থ, নতুন যুগের ব্যবস্থা। এই বাক্যাংশটি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিরাপত্তা নীতি-সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র যে আর আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলার অবস্থায় নেই, সেটির দৃষ্টান্ত পাওয়া গেল গত শনিবার। ভেনেজুয়েলায় হামলা চালানোর পাশাপাশি গ্রেপ্তার করা হয়েছে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে। এর মাধ্যমে একটি নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার উদ্ভব হচ্ছে। যেখানে ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বলপ্রয়োগ, সংস্কারবাদ ও আমেরিকা মহাদেশের নিরাপত্তা।

ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের ফলাফল এবং এটি যে নতুন বিশ্বব্যবস্থার রূপরেখা তৈরি করেছে, তা বোঝা যায় পাঁচটি মূল বিষয়ের দিকে নজর দিলে।

প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সম্প্রসারণ-

কারাকাসে হামলার ঘটনাটি দেখায়, কোনো নীতি বাস্তবায়নে মার্কিন প্রেসিডেন্টের আর আইনসভার অনুমোদন, আইনি ভিত্তি যাচাই কিংবা গণমাধ্যমের মতামতের প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যদি মনে করে তাদের দেশ মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আছে কিংবা নতুন কোনো শক্তি (যেমন চীন) হুমকি তৈরি করছে, তাহলে নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য কোনো প্রক্রিয়া মেনে চলার প্রয়োজন নেই।

মার্কিন রাজনৈতিক ও আইনগত ব্যবস্থার অধঃপতন আর অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এখন প্রেসিডেন্ট নিজেই জরুরি ক্ষমতা বাড়ানো, সংকটকালীন অবস্থা বজায় রাখা, এমনকি রাজনৈতিক বিরোধী দলকে দমন ও বিচারব্যবস্থা ক্ষুণ্ন করার মতো বিষয়গুলো অনুমোদন দিচ্ছেন।

আমেরিকা আমেরিকানদের জন্য-

ভেনেজুয়েলায় হামলার মাধ্যমে ‘আমেরিকা (লাতিন) আমেরিকানদের (যুক্তরাষ্ট্র) জন্য’ ধারণা আবার শক্তভাবে ফিরে এসেছে। মার্কিন প্রশাসন যখন গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে, তখনও পানামা, মেক্সিকো ও কানাডাকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইচ্ছার কাছে নত হতে দেখা গেছে।

লাতিন আমেরিকায় ব্রাজিল ও কলম্বিয়ার বামপন্থি সরকারগুলো একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক আধিপত্যের বিরোধিতা করছে, অন্যদিকে চিলি, আর্জেন্টিনার বর্তমান শাসকরা ট্রাম্পের মিত্রে পরিণত হয়েছেন। গোটা মহাদেশেই জাতীয়তাবাদী ও ডানপন্থি দলগুলোর উত্থান দেখা যাচ্ছে। যারা পূর্ণমাত্রায় অভিবাসনবিরোধী। এখন মাদুরো পরবর্তী ভেনেজুয়েলা যদি এই মূল্যবোধের সঙ্গে নিজেদের একত্র করে, তাহলে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রূপান্তরের আর কোনো আশা থাকবে না।

সম্পদের নিয়ন্ত্রণ-

সর্বশেষ হামলার ঘটনাটিও তেলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সঙ্গে যুক্ত। তবে এর ব্যাপকতা ইরাকের মতো নয়। বিশ্বায়নের ধারণা বর্তমানে ভূ-অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। এ জন্য ভেনেজুয়েলার তেলের অবকাঠামো, বন্দর ও খনিজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র কেবল নিজেদের চাহিদা পূরণের জন্য ভেনেজুয়েলার তেলের নিয়ন্ত্রণ চাইছে, বিষয়টি এমন নয়। বৃহত্তর অর্থে, তারা তেলের আন্তর্জাতিক মূল্য নির্ধারণ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় আছে। তারা সার্বভৌমত্ব ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ধারণার সঙ্গে বাণিজ্য ও নিরাপত্তার বিষয়টিও যুক্ত করেছে।

গত বছরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোট সেমিকন্ডাক্টর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির সরবরাহ শৃঙ্খল নিশ্চিত করতে একটি চুক্তি করে। যেটি প্যাক্স সিলিকা নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে লেনদেনমূলক কূটনীতির যুগ শুরু হয়েছে, অর্থাৎ কেউ কম্পিউটার চিপ সরবরাহ করলে বিনিময়ে খনিজ পাবে। মাদুরো-পরবর্তী নতুন ভেনেজুয়েলা তাদের তেলসম্পদ কাজে লাগিয়ে এই নতুন কূটনীতিতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।

ভূরাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস-

যুক্তরাষ্ট্র নতুন এক কূটনৈতিক পন্থা বেছে নিয়েছে। যেটির সঙ্গে চীন, রাশিয়া ও ইসরায়েলের দৃষ্টিভঙ্গির মিল আছে। এই পন্থা গড়ে উঠেছে ২০ শতকের জার্মান দার্শনিক কার্ল শমিটের ‘নোমোস’ ধারণা থেকে।

নোমোস ধারণা অনুযায়ী, মুক্ত ও উদার বাজার ব্যবস্থার চেয়ে জাতিগুলোকে মিত্র বা শত্রু বিবেচনা করে আলাদা করা হয়। এর ভিত্তিতে সহযোগিতার মাত্রা নির্ধারণ, সম্পদ বণ্টন হয় এবং ব্লকগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা হয়। যেমন– বিরোধী পক্ষ না থাকলে চীন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রাধান্য বিস্তার করতে পারবে। রাশিয়া যুদ্ধের মাত্রা কমানোর বিনিময়ে ইউক্রেনের ২০ শতাংশ ভূখণ্ড পাবে। আর মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র নতুন করে নির্ধারণ করতে পারবে ইসরায়েল।

ইউরোপ, গণতন্ত্র ও হবস-

গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং মুক্ত বাণিজ্যের ধারণাগুলো খুব দ্রুত বিলীন হচ্ছে। এ অবস্থায় নিজেদের কার্যকর সক্ষমতা দেখাতে না পারলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিণতি ভালো হবে না। গাজা উপত্যকা এর একটি উদাহরণ। আগ্রাসন নিয়ে ইউরোপ প্রধান শক্তিগুলোর বিরোধিতা করেছে। কিন্তু যথেষ্ট সম্মান ও প্রভাব না থাকায় এই বিরোধিতা তেমন কাজে লাগেনি। এখন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ হবসীয় (টমাস হবস) রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। যেখানে শান্তি ও নিরাপত্তার বিনিময়ে স্বাধীনতা হস্তান্তর করা হয় সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তির হাতে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন বিশ্ব ব্যবস্থায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয় প্রেসিডেন্টের কর্তৃত্বের মাধ্যমে; সত্য, আইন বা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ দিয়ে নয়।

(দ্য কনভারসেশনের নিবন্ধ অবলম্বনে)

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।