ইরানে রাজধানী তেহরানে রাতেও বিক্ষোভ দেখা যায়। ছবি: বিবিসি
ইরানে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) বাইরের বিশ্ব থেকে প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে ইরান। কারণ বিক্ষোভ দমন করতে ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে দেশটির সরকার। ফোন কলগুলো দেশটিতে পৌঁছাচ্ছে না, ফ্লাইট বাতিল হয়েছে এবং অনলাইন ইরানি নিউজ সাইটগুলো মাঝে মাঝে আপডেট হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বিক্ষোভকারীদের মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে কাজ করার অভিযোগ তুলে বলেছেন, দাঙ্গাকারীরা সরকারি সম্পত্তিতে হামলা করছে। তেহরান বিদেশিদের ‘ভাড়াটে’ হিসেবে কাজ করা লোকদের সহ্য করবে না।
অর্থনৈতিক মন্দার কারণে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভগুলো তিন বছর আগের অস্থিরতার মাত্রার কাছাকাছি পৌঁছায়নি, কিন্তু সারা ইরানে ছড়িয়ে পড়েছে। কয়েক ডজন মানুষ মারা গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে এবং কর্তৃপক্ষ আরও দুর্বল মনে হচ্ছে কারণ অর্থনীতি ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে এবং গত বছর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের পরিণতি এখনও বিরাজ করছে।
ইরানি অধিকার গ্রুপ হেঙ্গাও জানিয়েছে, জাহেদানে (যেখানে বেলুচ সংখ্যালঘুরা প্রধান) জুমার নামাজের পর বিক্ষোভ মিছিলে গুলি চালানো হয়েছে এবং কয়েকজন আহত হয়েছে।
ইরানের বিভক্ত বহিরাগত বিরোধী দলগুলো শুক্রবার আরও বিক্ষোভের আহ্বান জানিয়েছে। নির্বাসিত শাহের ছেলে রেজা পাহলভি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে বলেছে, ‘বিশ্বের চোখ তোমাদের ওপর। রাস্তায় নেমে পড়ো।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত জুনে ইরানে বোমা হামলা করেছিলেন এবং গত সপ্তাহে তেহরানকে বিক্ষোভকারীদের সাহায্য করার সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। তিনি শুক্রবার বলেছিলেন, তিনি পাহলভির সঙ্গে দেখা করবেন না এবং তাকে সমর্থন করা ‘উপযুক্ত হবে কি না তা নিশ্চিত নন। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে রাতে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, বাস, গাড়ি এবং মোটরবাইক জ্বলছে, মেট্রোস্টেশন এবং ব্যাংকে আগুন লাগানো হয়েছে। রাষ্ট্রীয় টিভি দাবি করেছে, ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর বিভক্ত হয়ে যাওয়া বিরোধী গোষ্ঠী পিপলস মুজাহিদিন অর্গানাইজেশন (এমকেও নামেও পরিচিত) এই অস্থিরতা সংগঠিত করছে।
রাষ্ট্রীয় টিভির এক সাংবাদিক ক্যাস্পিয়ান সাগরের বন্দর রাশতের শারিয়াতি স্ট্রিটে আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছেন, ‘এটা যুদ্ধক্ষেত্রের মতো লাগছে – সব দোকান ধ্বংস হয়ে গেছে।
রয়টার্সের যাচাই করা তেহরানের ভিডিওতে দেখা গেছে, শত শত মানুষ মিছিল করছে। একটি ভিডিওতে এক নারীকে চিৎকার করে বলতে শোনা যায়, ‘খামেনি মরে যাক!
ইরান আগে অনেক বড় অস্থিরতা দমন করেছে, কিন্তু এখন অর্থনৈতিক অবস্থা আরও খারাপ এবং বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে গত সেপ্টেম্বর থেকে পুনরায় আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপ বেড়েছে।
সরকার দ্বৈত পদ্ধতি নিয়েছে, অর্থনীতি নিয়ে বিক্ষোভকে বৈধ বলে বর্ণনা করছে; কিন্তু যাকে তারা ‘হিংসাত্মক দাঙ্গাকারী’ বলছে তাদের আবার নিন্দা করছে এবং নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে দমন করছে।
দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ আইনপ্রণেতাদের বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের কণ্ঠস্বর শোনা উচিত, কিন্তু ‘বিদেশি গুপ্তচর নেটওয়ার্কের’ সঙ্গে যুক্ত কোনো ক্ষেত্রে ভিন্নভাবে সামলাতে হবে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনি বলেন, ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র লাখ লাখ সম্মানিত মানুষের রক্তের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে। এটা ধ্বংসকারীদের কাছে পিছু হটবে না।’ পাশাপাশি অস্থিরতায় জড়িতদের ট্রাম্পকে খুশি করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
প্রাথমিকভাবে বিক্ষোভ অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে ছিল, গত বছর রিয়াল মুদ্রার মূল্য ডলারের বিপরীতে অর্ধেক হয়ে গেছে এবং ডিসেম্বরে মুদ্রাস্ফীতি ৪০% ছাড়িয়েছে। কিন্তু এখন স্লোগান সরাসরি সরকারের বিরুদ্ধে চলে গেছে।
বিক্ষোভকারীরা ‘স্বৈরশাসক মরে যাক’ বলে স্লোগান দিচ্ছে এবং ১৯৭৯ সালে উৎখাত হওয়া রাজতন্ত্রের প্রশংসা করছে। ইরানের ভেতরে রাজতন্ত্র বা এমকেও-র সমর্থন কতটা তা বিতর্কিত।
রয়টার্সের দেখা বেশিরভাগ ভিডিওতে (যার অনেকগুলো যাচাই করা যায়নি) তরুণদের দেখা গেছে। ইরান রাতারাতি ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে। সাংবাদিকরা বিদেশ থেকে ইরানে ফোন করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। দুবাই এয়ারপোর্টের ওয়েবসাইটে দেখা গেছে, দুবাই থেকে ইরানি শহরগুলোতে নির্ধারিত অন্তত ছয়টি ফ্লাইট শুক্রবার বাতিল করা হয়েছে।
