বাংলাদেশের সংবিধান নারী-পুরুষের সমান অধিকার স্বীকৃতি দিলেও বাস্তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীর সমান অংশগ্রহণ এখনও নিশ্চিত হয়নি। এর ফলে নারীদের প্রতিনিধিত্ব পরোক্ষভাবে সংরক্ষিত আসনের ওপর নির্ভরশীল, যা সরাসরি জনসমর্থনের ভিত্তিতে রাজনৈতিক বৈধতা, নেতৃত্বের স্বাতন্ত্র্য এবং নীতিনির্ধারণে কার্যকর প্রভাবকে সীমিত করে। জাতীয় সংসদের সাধারণ আসনে নারীর অংশগ্রহণ দীর্ঘদিন ধরেই আশঙ্কাজনকভাবে কম। বাংলাদেশের ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও)’ অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় কমিটিসহ দলীয় কমিটির অন্তত ৩৩ শতাংশ পদ নারীদের জন্য সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে প্রায় সব রাজনৈতিক দলই এই বাধ্যবাধকতা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। ২০২১ সালে নির্বাচন কমিশন, এই ক্ষেত্রে সময়সীমা বাড়িয়ে ২০৩০ সাল পর্যন্ত নির্ধারণ করে। ফলে দলগুলোর ভেতরে নেতৃত্ব তৈরি না হওয়ার যে যুক্তি বারবার তোলা হয়, তা কার্যত স্ব-সৃষ্ট সংকট।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রণীত ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর ধারা ২২(খ)-(ঘ) অনুযায়ী, প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে সংসদীয় নির্বাচনে ন্যূনতম ৫% নারী প্রার্থী মনোনয়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে তা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ৩৩%-এ উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। অথচ খোদ নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান বলছে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টিরই কোনো নারী প্রার্থী নেই- এই পরিসংখ্যান এক বিশাল ভারসাম্যহীনতা তুলে ধরছে। উল্লেখ্য, নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরাম (FWPR) স্পষ্টভাবে বলছে-‘ন্যূনতম ৫%’ নারী প্রার্থী মনোনয়ন কোনো গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড নয়; নারীর ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সাধারণ আসনে অবিলম্বে অন্তত ৩৩% নারী প্রার্থী মনোনয়ন বাধ্যতামূলক করার দাবি আমরা ধারাবাহিকভাবে জানিয়ে আসছি। দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী হলেও প্রার্থী তালিকায় তাদের উপস্থিতি নগণ্য। এখানে আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরাম জাতীয় ঐকমত্য ও সংস্কার প্রক্রিয়াকে সমর্থন করে। তবে যে দলগুলো জুলাই সনদের ন্যূনতম ৫% নারী মনোনয়ন সংক্রান্ত অঙ্গীকার করেও তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি, তাদের এই ব্যর্থতার জনসমক্ষে ব্যাখ্যা ও জবাবদিহি প্রয়োজন। কারণ সংস্কার উদ্যোগের বিশ্বাসযোগ্যতা টিকে থাকে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে; ন্যূনতম শর্তও যখন মানা হয় না, তখন জনআস্থা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ২ হাজার ৫৬৮ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ১০৯ জন অর্থাৎ মাত্র ৪.২৪ শতাংশ নারী। তাদের মধ্যে ৭২ জনকে বিভিন্ন দল মনোনীত করেছে, বাকি ৩৭ জন স্বতন্ত্র, এর মানে প্রায় ৩৪% নারী দলীয় রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রয়াস নিয়েছেন, যা দলগুলোর “যোগ্য নারী নেতৃত্ব নেই” যুক্তিকে দুর্বল করে এবং দলীয় মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় কাঠামোগত বৈষম্যের ইঙ্গিত দেয়।
কোনো রাজনৈতিক দলই ১০ জনের বেশি নারীকে মনোনয়ন দেয়নি, যা অন্তর্ভুক্তির তথাকথিত উদ্যোগ কতটা সীমিত ও প্রতীকী-তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বড় দলগুলোর মধ্যে বিএনপি মোট ৩২৮টি মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে; এর মধ্যে নারী প্রার্থী ১০ জন, অর্থাৎ মোটের প্রায় ৩.০২% যা ন্যূনতম মানদণ্ডের তুলনায় অপ্রতুল। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে একজনও নারী প্রার্থী ছাড়া ২৭৬টি মনোনয়ন জমা পড়েছে। দলটির নেতারা তাঁদের দলের নানান কমিটিতে ৪০ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণের কথা বারবার উল্লেখ করেন, কিন্তু দলীয় নেতৃত্বে বা নির্বাচনের অঙ্গনে নারীদের স্থান দেয়ার পক্ষে তাঁদের কোন উদ্যোগ বা সদিচ্ছা দৃশ্যমান নয়। এরপরই আছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। তাদের ২৬৮টি মনোনয়নে কোনো নারী প্রার্থী নেই।
যে ২১টি দল নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে, সেখানেও সংখ্যা খুব বেশি নয়। জাতীয় পার্টি (জি এম কাদের) ও সদ্য নিবন্ধিত বাসদ (মার্ক্সবাদী)-দুটি দলই ৯ জন করে নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে। জাসদ, গণসংহতি আন্দোলন, বাসদ ও এবি পার্টিসহ আরও কয়েকটি দল প্রত্যেকে তিন থেকে ছয়জন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে। উল্লেখিত দলগুলো থেকে মোট প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ জন নারীরা মনোনয়ন পেয়েছে যা মোট মনোনয়নপ্রাপ্ত নারীদের প্রায় ৩২%। আমরা তাঁদের সাধুবাদ জানাই এই উদ্যোগের জন্য, এবং এ-ও আশা করি যে এই দলগুলি থেকে মনোনীত নারী প্রার্থীরা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অর্থপূর্ণভাবে প্রতিদ্বন্দিতা করবেন।
নারীদের জোরালো অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা গণআন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া দলগুলোও নারীর অন্তর্ভুক্তিতে অত্যন্ত হতাশাব্যাঞ্জক দৃষ্টান্ত দেখিয়েছে। জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের নেতাদের নিয়ে গঠিত এনসিপি তাদের ৪৪ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র তিনজন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে।
এই পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিকসহ সকল ক্ষেত্রেই দেশের অর্ধেক কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অংশ হিসেবে নারী প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রাখার পরেও আজ পর্যন্ত সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলো দলে এমন কোন গণতান্ত্রিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেনি যাতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যোগ্য নারীনেতৃত্ব ধাপে ধাপে প্রস্তুতি নিতে পারেন এবং সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে সংসদে আসন গ্রহণ করতে পারেন। রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা এবং দলের মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চা না ঘটলে আমরা ২০৩০ সালের নির্বাচনেও আশানুরূপ পরিবর্তন দেখব কিনা সে নিয়ে সংশয় থেকে যায়।
এ প্রেক্ষাপটে নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরাম এর দাবি সমূহ:
1. জুলাই সনদে নারীর মনোনয়নে ক্ষেত্রে ন্যূনতম ঐক্যমত্যে রাজনৈতিক দলগুলো এসেছিলো, তাতে কেন সকল রাজনৈতিক দলগুলো ব্যর্থ হলো সে বিষয়ে অবিলম্বে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনকে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোকে জবাবদিহি করতে হবে
2. নারীর রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিতকরণে যে কোনো নির্বাচনী নীতিমালা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে আরও শক্তিশালী ও জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে।
3. রাজনৈতিক দলসমূহকে নারী প্রার্থী মনোনয়নকে কোনো অনুগ্রহ বা প্রতীকী উদ্যোগ হিসেবে না দেখে জুলাই সনদে দেওয়া ন্যূনতম প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘনের দায় নিতে হবে।
4. দলের ভেতরে নারীর রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলোকে এটিকে গণতান্ত্রিক দায়িত্ব ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা হিসেবে বিবেচনা করে দলীয় কার্যক্রম, মনোনয়ন প্রক্রিয়া ও নেতৃত্ব বিকাশে বাস্তব ও কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে হবে।
৫% নারী প্রার্থী মনোনয়ন কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নয়; জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারীর জন্য এটি লজ্জাজনকভাবে নিম্ন মানদণ্ড। এমনকি প্রধান রাজনৈতিক দলসমূহ এই ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণেও ব্যর্থ হচ্ছে-যা নারীর রাজনৈতিক অধিকার ও মর্যাদার প্রতি একটি সুস্পষ্ট অবজ্ঞার প্রতিফলন। বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সীমিত থাকলে, নীতি-নির্ধারনে নারী অভিজ্ঞতা, নারী নিরাপত্তা, সামাজিক ন্যায়, সহিংসতা প্রতিরোধে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর কার্যকর অবস্থান প্রত্যেক ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রব্যবস্থা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এ বাস্তবতা বদলাতে একটি সত্যিকারের নারীবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক নেতৃত্ব জরুরি। নারীবান্ধব সরকার ও নেতৃত্ব গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তরিকতা, দৃঢ় অঙ্গীকার এবং বাস্তব পদক্ষেপ না থাকলে নারী ভোটারদের আস্থা ও প্রত্যাশার সঙ্গে দলগুলোর দূরত্ব আরও বাড়বে।
আমরা, নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরাম আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতিতে বাংলাদেশের নারীর অংশগ্রহণে সকল মহলের অবস্থান, সদিচ্ছা এবং পদক্ষেপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবো এবং সে প্রেক্ষিতে নির্বাচন পরবর্তী সময়ে নারীর রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিতে সকল রাজনৈতিক দলের নারী কর্মীদের সমন্বয়ে একটি রাজনৈতিক বলয় কীভাবে তৈরি করা যায় সে বিষয়ে কাজ করবো।
একইসঙ্গে দলীয় মনোনয়নে নারী রাজনৈতিক কর্মীরা যাতে সরাসরি নির্বাচন করতে পারেন সে লক্ষ্যকে সামনে রেখে সংরক্ষিত আসনে প্রত্যক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার দাবিতে FWPR ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাবে। তাই ৫% নারী প্রার্থী মনোনয়ন নিশ্চিত করা কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি তাৎক্ষণিক ন্যায্যতার ন্যূনতম দাবি; এর নিচে কোনো অবস্থান গ্রহণযোগ্য নয়।
নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরামের পক্ষে (বর্ণক্রম অনুসারে): ক্ষুব্ধ নারী সমাজ, গণসাক্ষরতা অভিযান, দুর্বার নেটওয়ার্ক ফাউন্ডেশন, নাগরিক কোয়ালিশন,নারী উদ্যোগ কেন্দ্র (নউক) নারীগ্রন্থ প্রবর্তনা, নারী সংহতি, নারীপক্ষ নারীর ডাকে রাজনীতি, ফেমিনিস্ট অ্যালায়েন্স অফ বাংলাদেশ (ফ্যাব) বাংলাদেশ নারী মুক্তি কেন্দ্র, ভয়েস ফর রিফর্ম।
