ড্রাইভার ধরা পড়ে, গডফাদার থাকে অধরা—রাষ্ট্রের নিয়োগ ব্যবস্থা কি জিম্মি? বিসিএস—লাখো তরুণের স্বপ্ন, রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড গড়ার কারখানা। অথচ সেই পবিত্র নিয়োগ ব্যবস্থাই যদি পরিণত হয় ঘুষ, প্রশ্নপত্র ফাঁস আর নিয়োগ বাণিজ্যের আন্ডারওয়ার্ল্ডে—তাহলে সেটি শুধু দুর্নীতি নয়, সেটি রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতারণা।
এই ভয়ংকর চিত্রের কেন্দ্রে উঠে এসেছে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)-এর সাবেক বোর্ড মেম্বার কামাল উদ্দিন আহমেদ–এর নাম।
আবেদ আলী শুধু মুখোশ, আসল খেলা ভেতরে। প্রশ্নপত্র ফাঁস কাণ্ডে দেশজুড়ে ঝড় তোলে পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যানের গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী। একজন ড্রাইভার কীভাবে শত কোটি টাকার মালিক হয়—এই প্রশ্নে কেঁপে ওঠে দেশ।
কিন্তু অনুসন্ধানে উঠে আসে আরও ভয়াবহ তথ্য—আবেদ আলী ছিলেন কেবল সামনের সারির চরিত্র। পর্দার আড়ালে ছিলেন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা বোর্ড মেম্বার কামাল উদ্দিন আহমেদ।
পিএসসি সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, বিসিএসসহ বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস সিন্ডিকেটের শীর্ষ হোতাদের একজন ছিলেন কামাল উদ্দিন। ড্রাইভার ধরা পড়লেও ‘রাঘববোয়াল’ রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।সরকারি বেতনে নয়, প্রশ্নফাঁসের টাকায় রাজপ্রাসাদ।সরকারি চাকরির বেতনে এত সম্পদ সম্ভব? অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বলছে—না।
রাজধানীর অভিজাত এলাকাজুড়ে কামাল উদ্দিন ও তার দুই স্ত্রীর নামে গড়ে উঠেছে বিলাসবহুল ভবনের সারি—
মিরপুর রূপনগর:
২৭ নম্বর রোডের ৩০ নম্বর প্লটে ৫ তলা দৃষ্টিনন্দন ভবন। নাম ‘লঙ্গাইর হাউস’—নিজ গ্রামের নামে। মালিকানা প্রথম স্ত্রী তাহমিনা কামাল–এর নামে।
উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টর:
৪ নম্বর রোডে একটি আলিশান বাড়ি সরাসরি কামাল উদ্দিনের নামে।
একই সেক্টরের ১২ নম্বর রোডে ৭ তলা ভবন, দ্বিতীয় স্ত্রী আসমাউল হুসনা–এর নামে। স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা হয় ভবনটি।
এছাড়া গফরগাঁওয়ের লঙ্গাইর গ্রামে রয়েছে বাগানবাড়িসহ শত বিঘার বেশি জমি, সঙ্গে একাধিক দামি গাড়ি।
বোর্ড মেম্বার পদও কি বিক্রি হয়েছে? ১০ কোটি টাকার অভিযোগ। সবচেয়ে বিস্ফোরক অভিযোগটি এসেছে পিএসসি সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র থেকে। তাদের দাবি, তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারের সময় ১০ কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে কামাল উদ্দিন পিএসসির বোর্ড মেম্বারের পদ বাগিয়ে নেন। অভিযোগটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত না হলেও প্রশাসনের অন্দরমহলে এটি ছিল আলোচিত ‘গোপন রহস্য’।
৩০টি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস—কোটি কোটি টাকার খেলাধুলা-
সূত্র জানায়, ওই শাসনামলে বিসিএস ক্যাডারসহ অন্তত ৩০টি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। অভিযোগ রয়েছে—এই সিন্ডিকেট থেকেই গড়ে ওঠে কামাল উদ্দিনের সম্পদের পাহাড়। মেধাবীরা বাদ পড়েন, আর টাকার জোরে চাকরি চলে যায় অন্যদের হাতে। নীরব ফোন, জ্বলন্ত প্রশ্ন—–
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার কামাল উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়— ড্রাইভার যদি অপরাধী হয়, তবে প্রশ্নফাঁস সিন্ডিকেটের গডফাদাররা কার ছায়ায় আজও নিরাপদ? এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সারাক্ষণ জনমনে।
