নিজের অফিস কক্ষ সংস্কারের নামে ২১ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ, আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ উপেক্ষা করে প্লট হস্তান্তরের সুপারিশ, একাধিক বড় প্রকল্পে ঘুষ ও অনিয়ম—সব মিলিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তাকে ঘিরে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। অভিযোগের পাহাড় জমলেও আজ পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় বিষয়টি নিয়ে বাড়ছে বিতর্ক।
অভিযুক্ত কর্মকর্তা মোঃ কায়সার ইবনে সাঈখ। বিভিন্ন সময় তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো এখন দুর্নীতিবিরোধী মহলে গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিলাসী রেনোভেশন: অফিস কক্ষেই ২১ লাখ টাকা!
নিজের অফিস কক্ষ সংস্কারের নামে প্রায় ২১ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে—এমন অভিযোগ উঠে এসেছে। সূত্র জানায়, রেনোভেশনের সময় দামি টাইলস ও মার্বেল একাধিকবার পরিবর্তন করা হয়। এমনকি ১০ মাস আগেই টয়লেট ফিটিংস বসানো হলেও পুনরায় কাজ দেখিয়ে অর্থ ব্যয় দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি দপ্তরে এ ধরনের ব্যয় আর্থিক বিধিমালা ও প্রয়োজনীয়তার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আদালতের আদেশ উপেক্ষা করে প্লট হস্তান্তরের সুপারিশ
২০২৩ সালে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের ৬০ কাঠা প্লট (নং-২৬৬) নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়। জানা গেছে, ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট দলিল ও আমমোক্তারনামা বাতিল করে লেনদেন বন্ধের নির্দেশ দেন। এ বিষয়ে তিনটি মামলা এখনো বিচারাধীন।তবে এসব আইনি জটিলতা থাকা সত্ত্বেও ২০২৩ সালের ৩ আগস্ট মোঃ কায়সার ইবনে সাঈখ মন্ত্রণালয়ে ওই প্লটের মালিকানা হস্তান্তরের সুপারিশ পাঠান—যা আদালতের আদেশের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
তদন্ত হয়েছিল, কিন্তু শাস্তি নয়—প্রমোশন!
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে। এ কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন অ্যাডিশনাল সেক্রেটারি মোঃ ইয়াকুব আলী পাটোয়ারী।
১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ ছিল।একই সময়ে দুদক যশোর অফিস ৭ অক্টোবর নথি পর্যালোচনা করে তাকে জিজ্ঞাসাবাদও করে। তবে অদৃশ্য কারণে রেহাই পেয়ে গেছে।
সূত্রের দাবি, তদন্ত কমিটি শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করলেও তা কার্যকর হয়নি। বরং তাকে ঝিনাইদহ থেকে চাঁদপুরে স্থানান্তর করা হয় (মেমো নং: ২২৩০), যা অনেকের কাছে শাস্তির বদলে পুরস্কার হিসেবেই বিবেচিত হয়েছে।
হাসপাতাল ও মডেল মসজিদ প্রকল্পে ঘুষের অভিযোগ–
মোঃ কায়সার ইবনে সাঈখের বিরুদ্ধে বড় প্রকল্পে ঘুষ দাবির অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী— ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণে ৩ কোটি টাকার বিল থেকে ১০ শতাংশ কমিশন দাবি, ৩টি মডেল মসজিদ প্রকল্পে মোট ১.২ কোটি টাকা ঘুষ দাবি করা হয়েছে।
অসম্পূর্ণ ও নিম্নমানের কাজ দেখিয়ে ৯ কোটির বেশি টাকা লোপাট— হাসপাতাল নির্মাণের কিছুদিনের মধ্যেই টাইলস খসে পড়া, পাইপ লিক, লিফট বিকল, বৈদ্যুতিক ত্রুটি এবং অপারেশন থিয়েটারের এসি অকেজো হয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে—যা কাজের মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
ই-জিপি উপেক্ষা করে ম্যানুয়ালি কাজ দেওয়ার অভিযোগ-
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ই-জিপির মাধ্যমে টেন্ডার আহ্বান বাধ্যতামূলক হলেও অভিযোগ রয়েছে, ই-জিপি উপেক্ষা করে ম্যানুয়ালি NOA ইস্যু করে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সরকারি ক্রয়বিধির (পিপিআর) সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
প্রশ্নের মুখে গণপূর্ত অধিদপ্তর : একাধিক গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় এখন বড় প্রশ্ন— কার ছত্রচ্ছায়ায় বারবার রেহাই পাচ্ছেন মোঃ কায়সার ইবনে সাঈখ?
দুদক ও মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন কি আদৌ আলোর মুখ দেখবে?
দুর্নীতিবিরোধী মহলের আশঙ্কা, এসব অভিযোগের স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্ত না হলে গণপূর্ত অধিদপ্তরে দুর্নীতির সংস্কৃতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেবে, যা জনস্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
এসব অনিয়মের বিষয়ে এ প্রকৌশলীর মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোনকল গ্রহণ করেননি তবে হোয়াটসঅ্যাপে খুদেবার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব মেলেনি।
