পহেলা ফাল্গুন আর বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে ফুল উপহার দিতে রাজধানীর ফুলের দোকানগুলোতে ভিড় করেছে মানুষ। গতকাল রাজধানীর শাহবাগ থেকে তোলা ছবি:সংগৃহীত
১৪ ফেব্রুয়ারি—পঞ্জিকার পাতায় একটি সাধারণ তারিখ, অথচ বাঙালির হৃদয়ে আজ দুটি ঋতুর, দুটি অনুভবের, দুটি ইতিহাসের মেলবন্ধন। একদিকে পহেলা ফাল্গুনের হিরণ্ময় সকাল, অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে উদযাপিত Valentine’s Day—ভালোবাসার দিন। বাসন্তী রঙের আবির আর হৃদয়ের লাল রং আজ মিলেমিশে একাকার।
শিমুল-পলাশের অগ্নিরাঙা ডালে বসন্তের আগমন যেন প্রকৃতির দীর্ঘশ্বাস শেষে প্রথম হাসি। শীতের জীর্ণতা ঝরিয়ে ঋতুরাজ আজ মুকুট পরেছে বাংলার আকাশে। বাতাসে আম্রকুঞ্জের মুকুলগন্ধ, কোকিলের ডাক আর রৌদ্রের নরম ছোঁয়ায় চারদিক হয়ে উঠেছে প্রেমময়। এই দিনটি শুধু ঋতু পরিবর্তনের নয়—এ দিন মানুষের অন্তরেও নতুন কুঁড়ির জন্ম দেয়।
২০২০ সাল থেকে সংশোধিত বর্ষপঞ্জির ফলে পহেলা ফাল্গুন আর ভালোবাসা দিবস একই তারিখে এসে দাঁড়িয়েছে। বাংলা একাডেমির পঞ্জিকা সংস্কারের সিদ্ধান্ত যেন কাকতালীয়ভাবে বসন্ত ও প্রেমকে একই বৃন্তে বসিয়েছে। ফলে ১৪ ফেব্রুয়ারি এখন শুধু একটি আন্তর্জাতিক দিবস নয়, এটি বাঙালির নিজস্ব রঙে রাঙানো এক দ্বৈত উৎসব।
বসন্তের ইতিহাসও কম সমৃদ্ধ নয়। মোগল সম্রাট Akbar-এর আমলে রাজদরবারে বসন্ত উৎসবের সূচনা, পরে তা ছড়িয়ে পড়ে জনজীবনে। আর আধুনিক কালে ১৪০১ বঙ্গাব্দে (১৯৯৪) জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে University of Dhaka-এর চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় যে প্রদীপ জ্বলে উঠেছিল, তা আজ সর্বজনীন উৎসবের দীপশিখা হয়ে প্রজ্বলিত।
ফাল্গুন মানেই কেবল রঙিন পোশাক নয়; এটি আত্মপরিচয়েরও মাস। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের রক্তরাঙা স্মৃতি এই মাসের বুকেই লেখা। তাই ফাল্গুন আমাদের কাছে প্রেমেরও, প্রতিবাদেরও প্রতীক। প্রেম এখানে নিছক দু’জনের নয়—এ প্রেম ভাষার, মাটির, মানুষের।অন্যদিকে ভালোবাসা দিবসের কাহিনি ইতিহাসের বহু পুরোনো পৃষ্ঠা থেকে উঠে আসে। রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াসের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে প্রেমিক যুগলদের গোপনে বিবাহ দিতেন সেন্ট ভ্যালেন্টাইন। ১৪ ফেব্রুয়ারি তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়—আর সেই আত্মত্যাগের স্মৃতিই আজকের ভালোবাসা দিবস। বাংলাদেশে এ দিবসকে জনপ্রিয় করে তোলার পেছনে সাংবাদিক Shafik Rehman-এর ভূমিকা অনস্বীকার্য; নব্বইয়ের দশকে তাঁর লেখনীই দিনটিকে নতুন অর্থে পরিচিত করে তোলে।
গ্রামবাংলায় বসন্ত আসে ক্যালেন্ডার দেখে নয়—আমগাছে মুকুলের ঘ্রাণে, ভোরের শিশিরভেজা ঘাসে, কোকিলের প্রথম ডাকে। উঠোনে গাঁদা ফুলের মালা, পিঠার মিষ্টি ঘ্রাণ, নাগরদোলার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে বসন্ত যেন জীবনের সহজ আনন্দ হয়ে ওঠে। সেখানে ভালোবাসা দিবস আলাদা কোনো মোড়কে নয়—মায়া, স্নেহ আর আপন টানেই প্রতিটি ঘরে বিরাজ করে।
আর নগরজীবনে? সকাল হতেই শাহবাগ থেকে রাজু ভাস্কর্য, রমনা থেকে হাতিরঝিল—সবখানে মানুষের ঢল। বাসন্তী শাড়ি, হলুদ পাঞ্জাবি আর লাল গোলাপের দখলে শহর যেন রঙের সমুদ্রে ভাসে। ক্যাফে-রেস্তোরাঁয় আড্ডা, গান, কবিতা, আবৃত্তি—সব মিলিয়ে এক প্রাণের উল্লাস।
তবে ২০২৬ সালের বসন্তবরণে আছে এক ভিন্ন আবহ। সদ্যসমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রেশ এখনও বাতাসে ভাসছে। চিরচেনা অমর একুশে বইমেলার ধূলিমাখা সঙ্গ না থাকলেও হৃদয়ের ভেতর বইছে অন্য এক মেলা—অনুভবের মেলা।
বসন্ত আমাদের শেখায় নবজাগরণের কথা। ভালোবাসা দিবস মনে করায়—অভিমান পেরিয়ে হাত বাড়ানোর কথা। প্রকৃতির নিয়মে যেমন শীতের অবসান ঘটে, তেমনি মানুষের জীবনেও দুঃখের দিন শেষে আসে রঙিন সকাল।
আজ ফাগুনের মোহনায় দাঁড়িয়ে আমরা যেন আবারও শিখি— ভালোবাসা মানে কেবল উপহার নয়,ভালোবাসা মানে হৃদয়ের দরজা খুলে দেওয়া।
ভালোবাসা মানে রঙে রাঙানো পৃথিবীর দিকে নতুন চোখে তাকানো।ঋতুরাজ বসন্ত আর ভালোবাসা—আজ তারা একই সুরে, একই ছন্দে, একই আবেগে উচ্চারণ করছে একটাই শব্দ—
প্রেম। 🌼❤️
