রবিবার, ৮ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৩শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

অ্যান্টিবায়োটিকে অ্যামোক্সিসিলিন নেই:আন্ডার রেটে নিম্নমানের ঔষধ বিক্রি’র মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
মার্চ ৭, ২০২৬ ১০:৪৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

* চাঁদাবাজির মামলায় চেয়ারম্যান-এমডি অভিযুক্ত #
বিতর্কের কেন্দ্রে এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ # প্রশ্নের মুখে ঔষধ প্রশাসন #

জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রামভিত্তিক ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড-এর বিরুদ্ধে। বাজারে মানবহির্ভূত অ্যান্টিবায়োটিক সরবরাহ, নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন, লেবেল মূল্যের সঙ্গে বিপুল দামের অসঙ্গতি, শত শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি এবং চাঁদাবাজির মামলাসহ একের পর এক অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটি এখন নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এসব অভিযোগের মধ্যেই ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA)-এর নজরদারি ও কার্যকারিতা নিয়েও উঠেছে বড় প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, বহুবার গুরুতর অনিয়মের তথ্য সামনে এলেও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে দীর্ঘ সময় নেওয়া হয়েছে, যার ফলে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

অ্যান্টিবায়োটিকে অ্যামোক্সিসিলিনই নেই ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত এক বিস্ফোরক প্রতিবেদনে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (IPH)-এর ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরির বিশ্লেষণ উদ্ধৃত করে বলা হয়—এলবিয়নের উৎপাদিত মিমক্স ৫০০ এমজি (অ্যামোক্সিসিলিন) ক্যাপসুলে অ্যামোক্সিসিলিনের অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। ল্যাব পরীক্ষার তথ্য অনুযায়ী: ব্যাচ নম্বর: ০১১২১২ ক্যাপসুলে পাওয়া গেছে: অজানা সাদা দানাদার পাউডার গড় ওজন: ৩৯০.২ মিলিগ্রাম সরকারি পরীক্ষার অভিমতে স্পষ্টভাবে বলা হয়— ইহা মানবহির্ভূত। অ্যামোক্সিসিলিন শনাক্ত হয়নি।

একইভাবে এলবিয়নের উৎপাদিত ইনডোমেথাসিন ক্যাপসুলেও বড় ধরনের ঘাটতি পাওয়া যায়।
দাবিকৃত শক্তি: ২৫ মিলিগ্রাম
পরীক্ষায় পাওয়া গেছে: ২৪.১১ মিলিগ্রাম, ২২.৫৯ মিলিগ্রাম যা ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

চাঁদাবাজির মামলায় কোম্পানির শীর্ষ তিন কর্মকর্তা : এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজের বিরুদ্ধে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ এসেছে চাঁদাবাজি ও প্রাণনাশের হুমকি সংক্রান্ত মামলায়।

ইনোভেটিভ ফার্মার স্বত্বাধিকারী কাজী মোহাম্মদ শহিদুল হাসান কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা মামলা নম্বর ১৫১/২৩-এ অভিযোগ করেন— এলবিয়নের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রাইসুল উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মুনতাহার উদ্দিন এবং চিফ এডভাইজার মো. নিজাম উদ্দিন তার কাছে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন।

মামলার বর্ণনা অনুযায়ী— ২০১৪ সালে এলবিয়ন ইনোভেটিভ ফার্মাকে ১০ বছরের পরিবেশক চুক্তি দেয়। চুক্তির শর্ত ছিল: কোম্পানির লাভ: ৪০ শতাংশ পরিবেশকের লাভ: ৬০ শতাংশ অন্য কোনো পরিবেশক নিয়োগ করা যাবে না।

কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, পরবর্তীতে এলবিয়ন ওই চুক্তি ভঙ্গ করে অন্য পরিবেশক নিয়োগ করে।
২০১৬ সালে ঔষধ প্রশাসনের একটি ফ্যাক্টরি পরিদর্শনের সময় কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ৫ থেকে ৬ কোটি টাকার ওষুধ বাদীর গুদামে সরিয়ে নেয় বলে অভিযোগ করা হয়। ওই ওষুধের বিপরীতে বাদীর কাছ থেকে তারিখবিহীন ৯টি চেক জামানত হিসেবে নেওয়া হয়।
পরে চেক ফেরত চাইলে অভিযুক্তরা বলেন— চেক ফেরত চাইলে দুই কোটি টাকা দিতে হবে, না হলে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হবে।
বর্তমানে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (PBI) তদন্ত করছে।

বাজারে দামে ভয়ংকর অসঙ্গতি : তদন্তে দেখা গেছে, এলবিয়নের বেশ কিছু ওষুধ অস্বাভাবিক কম দামে পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে, যা উৎপাদন মান নিয়ে সন্দেহ তৈরি করেছে।
উদাহরণ হিসেবে— একই শক্তিমানের ওষুধে:
বেক্সিমকো বা স্কয়ার
পাইকারি মূল্য: ৩২০০ টাকা, এলবিয়ন, পাইকারি মূল্য- ১০৮৩ টাকা, এতে খুচরা বাজারে লাভের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৯০০ টাকার বেশি। একই ধরনের অসঙ্গতি পাওয়া গেছে: সেফরাডিন ডিএস, সিপ্রোফ্লক্সাসিন, ফ্লুকোনাজল,
উদাহরণস্বরূপ— ফ্লুকোনাজল ৫০ মি.গ্রা পাইকারি মূল্য: ১৬০ টাকা
বাজারে বিক্রি: ৮০০ টাকা

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে— অস্বাভাবিক কম উৎপাদন ব্যয় এবং বিশাল লাভের ব্যবধান নিম্নমানের উৎপাদনের ইঙ্গিত দেয়। এমনকি অভিযোগ রয়েছে—এলবিয়নের ‘এসপ্রিন’ নামের মাথাব্যথার ওষুধ পানিতে দ্রবীভূতই হয় না।

লেবেলে এক দাম, বাজারে আরেক দাম : তদন্তে আরও দেখা গেছে—এলবিয়নের বহু ওষুধে লেবেলে মুদ্রিত মূল্য এবং পাইকারি বাজারের দামের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। যেমন: ডমপ (ডমপেরিডোন) লেবেল মূল্য: ২০০ টাকা পাইকারি মূল্য: ৬৫ টাকা
প্যানটোপ্রাজল ২০ লেবেল মূল্য: ২১০ টাকা পাইকারি মূল্য: ৭০ টাকা
ডাইক্লোফেনাক এসআর লেবেল মূল্য: ৩০০ টাকা পাইকারি মূল্য: ৯০ টাকা সেটিরিজিন লেবেল মূল্য: ২৫০ টাকা পাইকারি মূল্য: ৭০ টাকা
ডেসলোরাটাডিন লেবেল মূল্য: ৪০০ টাকা পাইকারি মূল্য: ৯৫ টাকা এবং নাইট্রাজিপাম লেবেল মূল্য: ১০০ টাকা পাইকারি মূল্য: ৩০ টাকা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লেবেল মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট সরকারকে পরিশোধ করতে হয়।
এক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে—প্রকৃত বিক্রয়মূল্যের ভিত্তিতে এলবিয়ন সরকারকে কত ভ্যাট দিচ্ছে।

শত শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ : ২০২৩ সালের ৫ জানুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশনে জমা দেওয়া এক অভিযোগে বলা হয়— মাত্র পাঁচ বছরে কোম্পানিটি: আমদানির তথ্য গোপন করেছে ১১৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা।বিক্রয়ের তথ্য গোপন করেছে ৪৯২ কোটি ২০ লাখ টাকা , করবর্ষ অনুযায়ী হিসাব যথাক্রমে তুলে ধরা হলো – ২০১৭–১৮ অর্থ বছরে,
আমদানি গোপন: ১৩.৯৫ কোটি টাকা বিক্রি গোপন: ৮৩.১৯ কোটি টাকা ২০১৮–১৯ অর্থ বছরে
আমদানি গোপন: ১৪.৯৭ কোটি টাকা, বিক্রি গোপন: ৮৯.২১ কোটি টাকা ২০১৯–২০ অর্থ বছরে,
আমদানি গোপন: ২৫.৭৮ কোটি টাকা, বিক্রি গোপন: ৯৯.০৬ কোটি টাকা ২০২০–২১ অর্থ বছরে,
আমদানি গোপন: ৪৯.২৬ কোটি টাকা, বিক্রি গোপন: ১২৯.৭৫ কোটি টাকা, ২০২১–২২ অর্থ বছরে আমদানি গোপন: ১৪.২৮ কোটি টাকা ও বিক্রি গোপন: ৯১.৯৭ কোটি টাকা, অভিযোগে আরও বলা হয়— বেনামে ৭টি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ ১১টি বিলাসবহুল গাড়ি এবং ৯ টির বেশি ব্যাংক হিসাব গোপন।

আগেও সিলগালা হয়েছিল কারখানা : মানহীন ও নকল ওষুধ উৎপাদনের অভিযোগে আগে চট্টগ্রামের চাঁদগাঁওয়ে এলবিয়নের কারখানা ভ্রাম্যমাণ আদালত সিলগালা করে।
পরে ঔষধ প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে সীতাকুণ্ডে নতুন কারখানা স্থাপন করা হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কারখানার ঠিকানা- রহমতনগর, সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম উৎপাদন লাইসেন্স নাম্বার জৈব: ১০৯ অজৈব: ১৯১।

DGDA বলছে আবার পরীক্ষা চলছে : এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঔষধ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নাঈম গোলদার বলেন— মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বাজার থেকে এলবিয়নের ভেটেরিনারি ও মানবদেহের ওষুধের নমুনা সংগ্রহ করে ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরিতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষায় নিম্নমান প্রমাণিত হলে কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে পরিচালক (প্রশাসন) আশরাফ হোসেন বলেন—নমুনা সংগ্রহ করে নতুন করে পরীক্ষা করা হচ্ছে। পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়ার পর যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অভিযোগ অস্বীকার কোম্পানির : এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে এলবিয়নের চেয়ারম্যান রাইসুল উদ্দিন বলেন— “এসব কম্পোজ করা বানোয়াট তথ্য। আমাদের সুনাম নষ্ট করার জন্য এসব রটানো হচ্ছে।

বড় প্রশ্ন এখন জনস্বাস্থ্য ; এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ এখন শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম নয়—এটি দেশের ওষুধ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলেছে। কারণ অভিযোগ অনুযায়ী: মানবহির্ভূত অ্যান্টিবায়োটিক, GMP গাইডলাইন লঙ্ঘন পশু ও মানুষের ওষুধ একই ভবনে উৎপাদন।

আগেও কারখানা সিলগালা : বাজারে সন্দেহজনক দামে বিক্রি- এসব ঘটনার পরও কীভাবে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন ও বিপণন চালিয়ে যাচ্ছে—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে— ঔষধ প্রশাসন আগেই কঠোর ব্যবস্থা নিলে বাজারে নিম্নমানের ওষুধের এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না। এখন দেখার বিষয়—ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, দুদক এবং সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজের বিরুদ্ধে কতটা কঠোর তদন্তে নামে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।