বিদেশে চাকরির প্রলোভনে লাখ টাকা হাতিয়ে মানুষ বিক্রির অভিযোগ— সৌদির কারাগারে বন্দি ভুক্তভোগী, গ্রামজুড়ে তোলপাড়। পুলিশের অভিযানে এলাকায় স্বস্তি।
গোপালগঞ্জে অবশেষে ভেঙে পড়তে শুরু করেছে বহুদিনের আতঙ্ক—মানব পাচার চক্রের শক্ত ঘাঁটি। আলোচিত এই চক্রের মূলহোতা মন্টু মল্লিক (৬০) কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ, আর তাতেই যেন বেরিয়ে আসছে একের পর এক ভয়ংকর তথ্য।
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার নিজড়া ইউনিয়নের বটবাড়ী গ্রামের এই কুখ্যাত চক্র দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলে পাচার করে আসছিল—এমন অভিযোগ ছিল স্থানীয়দের মুখে মুখে। অবশেষে আইনের জালে ধরা পড়লেন সেই অঘোষিত ‘অদৃশ্য সম্রাট’ মন্টু মল্লিক।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ দমন অধ্যাদেশ ২০২৬-এর ৬, ৭, ৮ ও ২২ ধারায় দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে ১৮ মার্চ এক অভিযানে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসআই নাগির সাকিলের নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে চক্রের মূলহোতাকে পাকড়াও করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
প্রলোভনের ফাঁদ, জীবনের সর্বনাশ- মামলার বাদী লালচাঁন খন্দকারের অভিযোগ, ২০২৫ সালের ২০ মার্চ মন্টু মল্লিক ও তার সহযোগীরা সৌদি আরবে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ৬ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। তার ছোট ভাই রমজান আলী খন্দকারকে বিদেশে পাঠানো হলেও সেখানে গিয়ে ঘটে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি-পরিবার অভিযোগ তুলেছেন, তাকে অন্যত্র বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে! সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার পরে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। সাম্প্রতিক ভুক্তভোগী সৌদি আরবের একটি কারাগারে বন্দি আছেন!
একটি পরিবারের স্বপ্ন মুহূর্তেই দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে—আর সেই বেদনা এখন ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়।
চক্রের বিস্তৃত জাল-এই মানব পাচার সিন্ডিকেট শুধু মন্টু মল্লিকেই সীমাবদ্ধ নয়। তদন্তে উঠে এসেছে আরও কয়েকজনের নাম— ডালিম মল্লিক (৩৫), নাজমুল মল্লিক (৩২), নদী বেগম (২৬), রোমেচা বেগম (৫০)
হালিমা বেগম। তাদের সবার বাড়ি একই এলাকায়, যা পুরো বিষয়টিকে আরও রহস্যময় ও সংগঠিত অপরাধের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এলাকাবাসীর ক্ষোভ ও আতঙ্ক- স্থানীয়দের দাবি, এই চক্র বহুদিন ধরেই সক্রিয় ছিল। গ্রামবাসী বারবার সালিশ-বিচারের মাধ্যমে সতর্ক করলেও কোনো ফল হয়নি। বরং টাকার প্রভাব, ভয়ভীতি আর প্রভাবশালী সংযোগ ব্যবহার করে তারা তাদের অপকর্ম চালিয়ে আসছে। সবাই জানতো, কিন্তু কেউ মুখ খুলতে সাহস পায়নি—এমন কথাই এখন ঘুরছে মানুষের মুখে মুখে।
এদিকে মায়ের আহাজারি—ফিরিয়ে দিন আমার ছেলেকে
ভুক্তভোগী রমজান আলীর মা এখন এক বুক হাহাকার নিয়ে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। একমাত্র সন্তানের মুক্তির আশায় তার কান্না যেন পুরো এলাকাকে ভারী করে তুলেছে। তার আকুতি— আমার ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে দিন…এখন কী?
মন্টু মল্লিক গ্রেপ্তার হলেও পুরো চক্র এখনও ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এলাকাবাসীর দাবি— দ্রুত বাকি আসামিদের গ্রেপ্তার, পাচারের শিকারদের উদ্ধার, এই ভয়ংকর নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে হবে।
গোপালগঞ্জে এই ঘটনায় সৃষ্টি হয়েছে তীব্র চাঞ্চল্য। এখন দেখার বিষয়—আইনের কঠোর প্রয়োগে এই মানব পাচার চক্র কত দ্রুত সম্পূর্ণ নির্মূল করা যায়।
